তরুণদের মধ্যে তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা এবং দেশে অসংক্রামক রোগের (এনসিডি) ক্রমবর্ধমান বোঝা কমাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তামাকপণ্যের দাম ও কর বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
মঙ্গলবার (৯ জুন) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে অনুষ্ঠিত ‘তরুণদের তামাক ব্যবহার ও অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি প্রতিরোধে করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এ দাবি জানান। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের কারিগরি সহায়তায় এবং প্ল্যাটফর্ম অব মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল সোসাইটির উদ্যোগে সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই ঘটে অসংক্রামক রোগে। হৃদরোগ, ক্যান্সার, স্ট্রোক ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ তামাক ব্যবহার। সহজলভ্যতা ও তুলনামূলক কম দামের কারণে বিপুলসংখ্যক তরুণ ধূমপানে আসক্ত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বর্তমানে দেশে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন। প্রতিবছর তামাকজনিত রোগে প্রায় ২ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ১০ দশমিক ৩ শতাংশ।
প্রবন্ধে আরো উল্লেখ করা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তামাক ব্যবহার ও উৎপাদনের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে তামাক খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা।
তাই আগামী বাজেটে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট একীভূত করে ১০ শলাকার প্যাকেটের খুচরা মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ, প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপ এবং উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেটের দাম যথাক্রমে ১৫০ ও ২০০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, অসংক্রামক রোগ বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। তরুণ বয়সে তামাকের আসক্তি শুরু হলে পরবর্তী জীবনে বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই তরুণদের তামাক থেকে দূরে রাখতে কার্যকর মূল্য ও কর বৃদ্ধি জরুরি।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, তামাকপণ্যের দাম বাড়ালে তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে তামাক ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পায়। তিনি বলেন, বিদ্যমান বহুস্তরবিশিষ্ট কর কাঠামো সংস্কার করা হলে সরকার ৮৫ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করতে পারবে।
জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের মহাপরিচালক (যুগ্মসচিব) মো. আখতারউজ-জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জনে তামাকপণ্যের কার্যকর কর ও মূল্য বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের প্রবণতা কমাতে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে হবিগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান জীবন বলেন, নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট একীভূত করে ১০ শলাকার প্যাকেটের মূল্য কমপক্ষে ১০০ টাকা নির্ধারণ করা উচিত। এতে তরুণদের ধূমপান শুরু করার প্রবণতা কমবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে।
সভাপতির বক্তব্যে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী বলেন, কার্যকর তামাক করনীতি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও জাতীয় উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রস্তাবিত কর সংস্কার বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত হবে এবং ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত থাকবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার মানুষের অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
সেমিনারে চিকিৎসক, মেডিক্যাল শিক্ষার্থী, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সমন্বয়ক ডা. অরুনা সরকার।






