kalerkantho

বেঁচে থাকাই বিস্ময়ের

রেজোয়ান বিশ্বাস ও শরীফুল আলম সুমন    

৩০ মার্চ, ২০১৯ ১২:২০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বেঁচে থাকাই বিস্ময়ের

বনানীর এফআর টাওয়ারে আগুনে আহত একজনকে গতকাল কুর্মিটোলা হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে নেওয়া হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীর বনানীতে এফআর টাওয়ারে আগুন লাগার পর ওই ভবনে আটকা পড়া লোকজনের মধ্যে যাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে তারা ওই দুঃসহ পরিস্থিতির কথা মনে করে এখনো আঁতকে উঠছে। তারা বলছে, এটা তাদের নতুন জীবন।
 
এ ছাড়া আগুন লাগার পর ভবনে আটকা পড়া লোকজনের বাঁচার আকুতি যারা খুব কাছ থেকে দেখেছে তারা বলছে, সব কিছুই চোখের সামনে ঘটল; কিন্তু তারা কিছুই করতে পারেনি।
 
ভবন থেকে উদ্ধার হওয়া এবং পাশের ভবন থেকে আটকা পড়া লোকজনের অবস্থা দেখা বা ভবনের বাইরে থেকে সহকর্মীদের উদ্ধারের আকুতি শোনা বেশ কয়েকজনের সঙ্গে গতকাল শুক্রবার ঘটনাস্থলে কথা হয় কালের কণ্ঠ’র এ দুই প্রতিবেদকের।
 
ভবনের পাঁচটি ফ্লোরে ডার্ড গ্রুপ নামের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়। অগ্নিকাণ্ডের সময় অন্তত দুই শতাধিক কর্মী ছিল প্রতিষ্ঠানটির ওই কার্যালয়গুলোতে। তারা সবাই নিরাপদে বের হতে পেরেছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (অর্থ) সেঁজুতি দৌলা বলেন, ‘তখন ১৩ তলায় অফিসে ছিলাম। আগুনের পর অফিসের সবাই যার যার প্রাণ বাঁচানোর জন্য ভবন থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছিল। আমি মেয়ে মানুষ। কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। একবার মনে হচ্ছিল ভবন থেকে লাফ দিই। বের হওয়ার চেষ্টা করে বারবার ব্যর্থ হচ্ছিলাম। বিদ্যুৎ নেই। অন্ধকার। ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসছিল। মুখে ওড়না দিয়েও রক্ষা পাচ্ছিলাম না। তখন মনে হচ্ছিল মারা যাচ্ছি। একপর্যায়ে কাচ ভেঙে বাইরে বের হই। এরপর সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠি। তখনো মনে হচ্ছিল নিরাপদ নই। একপর্যায়ে অন্যদের সহযোগিতায় পাশের ভবনের ছাদে গিয়ে রক্ষা পাই।’ তিনি বলেন, ‘এই স্মৃতি মনে পড়লেই বুক কেঁপে উঠছে। নিজেকে ঠিক রাখতে পারছি না। শুধু মনে হচ্ছে জীবনের চেয়ে বেশি মূল্যবান আর কিছু নেই।’
 
১৫ তলার মাইকা গ্রুপের কার্যালয়ে ছিল ৩০ জন কর্মী। এর মধ্যে আনজির সিদ্দিক আবির নামের এক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। বাকিরা বেঁচে ফিরেছে। তবে তাদের অনেকেই আহত হয়ে এখন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রাসেল খান নামের প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মী সিঁড়ি বেয়ে ছাদে পৌঁছতে পেরেছিলেন। পরে তাঁকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার করেন। তিনি বলেন, ‘আগুন লাগার পরই নিজের প্রাণটা রক্ষা করাই দায় হয়ে পড়েছিল। এর মধ্যে সহকর্মীদের অসহায় অবস্থা আমাকে আরো দুর্বল করে দেয়। মুহূর্তে মনে হয় সময় অল্প, বাঁচতে হবে।’
 
২৮ জন কর্মী ছিল ১১ তলার হেরিটেজ এয়ার এক্সপ্রেস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে। তাদের মধ্যে মারা গেছে ৯ জন। যারা প্রাণ নিয়ে বের হতে পেরেছে তাদের সবাই কমবেশি আহত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জেসমিন সুলতানা বলেন, ‘আগুন লাগার পরই আতঙ্কে সবাই ছোটাছুটি করতে থাকে। দ্রুত বিদ্যুৎ চলে যায়। এরপর অন্ধকার। আগুনের তাপ বাড়তে থাকে। ধোঁয়া অফিসে ঢুকতে থাকে। যারা মারা গেছে তারা ধোঁয়ার কারণে আতঙ্কে বের হতে পারেনি।’
 
ভাই, আমাদের বাঁচান, আপনারাও বাঁচেন : এফআর টাওয়ার লাগোয়া আহমেদ টাওয়ার। এই ভবনের ১১ তলায় বায়িং হাউস ‘বান্ধ গ্লোবাল’-এর কার্যালয়। প্রতিষ্ঠানের রিসিপশনিস্ট মো. আসাদ গত বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে এফআর টাওয়ার লাগোয়া ওয়াশরুমে অজু করতে যান। সে সময় পাশের ভবনে চিৎকার-চেঁচামিচি শুনতে পান। প্রথমে বিষয়টিকে পাত্তা না দিলেও পরে তিনি জানালা খোলেন। আসাদ বলেন, “জানালা খুলতেই দেখলাম অনেক পুরুষ-মহিলা মুখে কাপড় দিয়ে কান্নাকাটি করছে। আমাকে বলল, ‘ভাই, আগুন লেগেছে। আমাদের বাঁচান, আপনারাও বাঁচেন।’ দুটি ভবন এতই পাশাপাশি যে দুই পাশ থেকে দুজন হাত দিলে ছোঁয়া যায়। কিন্তু দুই ভবনের জানালায় গ্রিল থাকায় কিছুই করতে পারলাম না।”
 
আসাদ আরো বলেন, ‘জুমার নামাজ পড়ে সরাসরি এখানে চলে এসেছি। বাসায় আর বসে থাকতে পারলাম না। দেখি অফিসের কী অবস্থা। অন্য সবার কী অবস্থা।’
 
এফআর টাওয়ারের আটতলার সিঅ্যান্ডএফ এজেন্সি আসিফ ইন্টারন্যাশনালের গাড়িচালক আবদুর রাজ্জাক বলেন, “আমি ১২টার দিকেই অফিস থেকে নিচে নেমেছি। চা খাচ্ছিলাম। এমন সময় জানলাম আগুন লেগেছে। সঙ্গে সঙ্গে পিয়ন জসীমকে ফোন দিই। সে কান্নাকাটি করে বলে, ‘ভাই, আমাদের বাঁচান।’ আমি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে বলি। ও তখন বলে, ‘ধোঁয়ায় অন্ধকার, নিচে নামা যায় না।’ এরপর ফোন কেটে যায়।”
 
উদ্ধার হওয়া জসীমের সঙ্গে রাতে হাসপাতালে দেখা হয় রাজ্জাকের। তাঁর কাছ রাজ্জাক শুনেছেন তাঁদের প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম ছাদে পৌঁছতে ১৯ তলা পর্যন্ত উঠেছিলেন; কিন্তু কী ভেবে আবার নিচে নেমে যান। তিনিসহ ওই প্রতিষ্ঠানটির তিনজন মারা গেছেন বলে জানান রাজ্জাক।
 
এফআর টাওয়ারের ঠিক উল্টো পাশের ভবনের কর্মী আবুল কাশেম বলেন, ‘আগুন লাগার পর নিচতলার সিঁড়ি দিয়েও কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছিল। চোখের সামনে মানুষ লাফিয়ে পড়ে মরল। কিছুই করতে পারলাম না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা