kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

শহরটা আর প্রাণের নেই যানের দখলে

স্বনামধন্য রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। তাঁর জন্ম রংপুরে হলেও শৈশব থেকে বেড়ে ওঠা ঢাকায়। যাপিত জীবনের স্মৃতি-বিস্মৃতির নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। লিখেছেন মীর রাকিব হাসান

১৪ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শহরটা আর প্রাণের নেই যানের দখলে

‘১৯৬২ সালে রংপুর থেকে আমরা ঢাকায় আসি। তখন খুবই ছোট ছিলাম। ধানমণ্ডির ৩ নম্বর রোডের একটি ফ্ল্যাটে উঠি। সেখান থেকে শিফট হয়ে ১৮ ও ১৯ নম্বর রোডেও দীর্ঘদিন থেকেছি। সেগুনবাগিচায়ও বেশ কিছুদিন থাকা হয়েছে। তবে জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে ধানমণ্ডিতেই। তারপর লালমাটিয়া নিজেদের বাসা। শৈশবের সব স্মৃতি মূলত ধানমণ্ডিকে ঘিরেই। তখন ছবির মতো ছিল ঢাকা—পরিচ্ছন্ন, খোলামেলা এক শহর।’ শৈশবের দিনগুলো সম্পর্কে এভাবেই বলছিলেন রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। তিনি আরো বলেন, ‘‘ছোটবেলায় ঢাকায় পাকিস্তানি সংস্কৃতিটাই বেশি দেখেছি! গান-বাজনা থেকে শুরু করে রেডিও কিংবা সিনেমা—সব কিছুতেই পাকিস্তানিদের প্রাধান্য। স্বাধীনতার পরে যেটা কমতে থাকে।

শৈশবে আমরা অনেক ঘোরাঘুরি করতাম। চিড়িয়াখানায় যেতাম। তখন চিড়িয়াখানাটা ছিল এখন যে মৎস্য ভবন, ঠিক তার উল্টো দিকে। সড়ক ভবনের এদিকটায় কুমির রাখা ছিল। রমনা পার্কটা ছিল অসম্ভব সুন্দর। শহরজুড়ে ছোট-বড় সবারই একটা অবসর কাটানোর জায়গা ছিল। মনে পড়ে তখন বাসায় বিক্রি করতে আসত সুতি কাবাব, বাখরখানি। ছোটবেলার আরেকটি বিশেষ খাবারের কথা মনে পড়ছে, সেটার নাম ছিল ‘কটকটি’। কাচভাঙা দিয়ে কটকটি কিনে খেতাম। সে সময় ফুচকা, চটপটি অতটা ছিল না, এখনকার মতো এতটা চালু হয়নি। তখন বেশির ভাগ মানুষই হেঁটে চলাফেরা করত। রমনা পার্ক, সেগুনবাগিচা থেকে আমরা হেঁটে আসতাম। হাতেগোনা কয়েকটি রাস্তা ছিল ঢাকায়। সায়েন্স ল্যাবরেটরির রাস্তাটা তখনো হয়নি, আমরা নীলক্ষেত দিয়ে যাতায়াত করতাম। তখন ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশন ছিল, যেটা এখন উঠে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওখানে লেভেলক্রসিং ছিল। নীলক্ষেতের ওখানে আমাদের দাঁড়াতে হতো রেল আসা-যাওয়ার জন্য। মনে পড়ে গুলিস্তানে ড্যানিশ, করিম, জিএমজি এসব পাকিস্তানিদের বড় বড় ডিপার্মেন্টাল স্টোর ছিল। আরেকটি যে ব্যাপার ছিল—স্বাধীনতার আগে এখানে বেশির ভাগ দোকান পাকিস্তানিদের ছিল! স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় আমরা ধানমণ্ডির ১৮ নম্বর রোডে থাকতাম। আমার পাশের বাড়িতেই ‘রুমি’রা এসে আটজন আর্মি অফিসারকে মারল। বাসাটি ‘কর্নেল সাহেবের বাসা’ বলে পরিচিত ছিল। আমরা তো সবাই ভয়ের চোটে অস্থির। না জানি পাকিস্তানিরা এসে আমাদেরও মেরে ফেলে। সেই যুদ্ধের বর্ণনা করা তো সহজ নয়। সব কিছু ধ্বংস করে দিয়েছিল। তবে আমরা পাকিস্তানিদের এরিয়ায় থাকতাম বলে খুব একটা সমস্যায় পড়তে হয়নি। তবে বাইরের অবস্থা ছিল ভয়াবহ; যা হোক ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর রোডে ছিল আমার মামার বাসা। ওইখানে হাতেগোনা কয়েকটা বাসা ছিল। বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ছিল। এখন যেখানে সন্তুর রেস্টুরেন্ট, ওখানে খুব সুন্দর একটি বাড়ি ছিল। নামকরা একজন কন্ট্রাক্টর থাকতেন। তখন ধানমণ্ডিতে বসতবাড়ির সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। বেশির ভাগ জায়গাই ছিল খালি।’’

ঢাকার এখনকার বিরাজমান অবস্থাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখনকার ঢাকা মানেই যানজটের ঢাকা। শহরটা আর প্রাণের নেই, যানের দখলে। তখন কয়টাইবা গাড়ি ছিল। বিআরটিসির বাস ছিল সবুজ আর সাদা রঙের। সে বাসে আমরা চলাচল করতাম। তারপর এলো অ্যাশ আর লাল রঙের। আমি আজিমপুর স্কুলে যেতাম ওই বাসেই। ধানমণ্ডি থেকে উঠতাম। নিউ মার্কেটের ওখানে পাল্টাতাম। ওখান থেকে আরেকটি বাসে উঠে স্কুলে যেতাম। এখন যান আর জনজটের শহর ঢাকা। আর এত মানুষ হওয়ার ফলে সব কিছুই এলোমেলো। কেউ নিয়ম মানে না। কেউ লাইন দিয়ে বাসে উঠবে না। আগে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতাম, অনেকক্ষণ পর একটা বাস আসত। সেই বাসে স্টপেজ থেকে আমরা উঠতাম বড়জোর দু-চারজন। এখন হুড়াহুড়ি পড়ে যায়। যেমন গাড়ির আধিক্য, তেমনি জনসংখ্যার। আগে নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য বাইরে বের হতাম। এখন নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য বাড়িতে ছুটে আসি। কারণ বাইরের পরিবেশ এতটাই করুণ, যেন নিঃশ্বাসও বন্ধ হয়ে আসে। পাগলা একটা শহর হয়ে গেছে ঢাকা। কেউ যেন লাগাম টানছে না।’ 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা