kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

‘এক পা দুই পা করে এগিয়েছি লক্ষ্যের দিকে’

১৪ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘এক পা দুই পা করে এগিয়েছি লক্ষ্যের দিকে’

‘তানুরা যুব উন্নয়ন মহিলা সংস্থা’ ও ‘তানুরা বিউটি পার্লার’-এর স্বত্বাধিকারী শারমীন সুলতানা নূপুর। ছোটবেলায়ই হারিয়েছেন মাকে। ঘটনাচক্রে বাল্যকালেই বসতে হয় বিয়ে পিঁড়িতে। এরপর সংসার, সন্তান, আর্থিক সংকট তাঁকে এনে দাঁড় করায় জীবনের নতুন বাঁকে। তবু দমে যাওয়ার পাত্রী নন তিনি। নানা চড়াই-উতরাই মোকাবেলা করে তাঁর সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প শুনেছেন ফরহাদ হোসেন

আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা কুষ্টিয়ায়। ছোটবেলায়ই মাকে হারাই। মা না থাকায় বাবার সংসারে থাকাটা ক্রমেই যন্ত্রণাময় হয়ে উঠছিল। পড়াশোনাও খুব বেশি দূর এগোয়নি। অনেকটা নিরুপায় হয়ে চলে আসি ঢাকার ডেমরায় মামার বাসায়। তখন আমার বয়স মাত্র ১৩ বছর। মামার বাসায় থাকার সময়ই আমাকে বিয়ে বসতে হলো। বরের বাড়ি মাগুরায়; কিন্তু ঢাকায়ই থাকেন। সংসারে গিয়ে কী থেকে কী করব, বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এভাবে বছর পার না হতেই মা হলাম। একে তো বয়স ছিল কম, তার ওপর আবার মা হওয়া—সব মিলিয়ে চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হলো আমাকে। আর্থিক অবস্থাটা তেমন ভালো ছিল না। নিত্য টানাপড়েন লেগেই থাকত। নিজের কোনো আয়েরও পথ ছিল না। স্বামী যা দিত তা দিয়েই সংসার সামলাতে হতো। এ অবস্থায় নিজেকে খুব অসহায় মনে হতো। তখন ভাবছিলাম সংসার সামলানোর পাশাপাশি বিকল্প কিছু একটা করতেই হবে। ছোটবেলায় মাকে দেখতাম বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করতেন। ভাবলাম, সেলাইয়ের কাজটা আমার জানা আছে। তাই দিয়ে ঘরোয়াভাবে শুরু করলাম। নিজের কাজের পাশাপাশি অনেক পরিচিতজনের কাজ করতাম। সেই সূত্রে অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়তে লাগল। ভাবনা এলো, একটা পার্লার খুললে কেমন হয়। যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। আমার এক বান্ধবী ছিল পার্লারের কাজে দক্ষ। তার সঙ্গে ২০১২ সালে ‘বড় মায়ের’ জমি বেচা দুই লাখ টাকা দিয়ে বংশালে পার্লার দিলাম; কিন্তু ২০১৪ সালে এসে নিজেই করব বলে চলে এলাম পার্টনারে পার্লারের ব্যবসা ছেড়ে। সে বছরই নতুন করে আবার শূন্য থেকে শুরু করলাম। নিজের জমানো এবং স্বামীর কিছু টাকা বিনিয়োগ করে পার্লার দিলাম।

আজ থেকে ছয় বছর আগে যখন আমি পার্লার শুরু করি, তখন থেকেই পার্লারের কাজগুলো শিখতে থাকি। পরে যখন নিজেই পার্লার দিলাম, তখন যুব উন্নয়ন থেকে প্রশিক্ষণ নিই। একা শুরু করতে গিয়ে নানা বাধার মুখে পড়লাম। স্বামীর সমর্থন থাকলেও সমাজের অনেকেই এটাকে বাঁকা চোখে দেখত। আমাদের পরিবার ছিল অনেকটা রক্ষণশীল ‘যা করার বাড়িতে করো, বাইরে নয়’। এটা বেশ বড় সমস্যা ছিল। তবু আমি দমে যাইনি। আমার বিশ্বাস ছিল সততা, পরিশ্রম আর সৃজনশীলতা দিয়ে এগিয়ে যেতে পারলে সফলতা আসবেই। আমি এক পা, দুই পা করে এগিয়েছি আমার লক্ষ্যের দিকে।

আমি তো মনে করি বাস্তবতাই মানুষকে কর্মমুখী করে তোলে। কারণ বেঁচে থাকার তাগিদটা যখন খুব জরুরি হয়ে যায়, তখন পথটাও তৈরি হয়ে যায় বা করে নিতে হয়। যত কষ্টই হোক, কোনো কাজে লেগে থাকলে সাফল্য আসবেই। আমি এমন সময়ে কাজটা শুরু করি, তখন আমার সার্বিক কাজের পরিবেশটা ইতিবাচক ছিল না। অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। দিন-রাত খেটেছি। অবশ্য সে খাটনির মূল্যও পেয়েছি। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি। স্বাবলম্বী হয়েছি, এমনকি আমি পুরস্কৃতও হয়েছি। বাংলাদেশ ইয়ুথ এন্টারপ্রাইজ অ্যাডভাইস অ্যান্ড হেলপ সেন্টার থেকে আমাকে নারী উদ্যোক্তা ২০১৮ সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের স্বীকৃতি আমাকে অনেক দূর নিয়ে যাবে বলে আমি আশাবাদী।

ঢাকার হাতিরপুলের তানুরা বিউটি পার্লারের পরিধি বাড়িয়ে এক পাশে ওঠানো হয়েছে বুটিক, ছোটদের পোশাক ও নকশিকাঁথা। সঙ্গে হ্যান্ডিক্রাফটের কাজও করি। বিভিন্ন সময় আয়োজিত নানা ধরনের মেলায় অংশগ্রহণ করি। অংশ নিই নানা সময়ে আয়োজিত পিঠা উৎসবে। তাতে করে আমার পণ্যের প্রচার ও প্রসার দুই-ই হয়। কাজের পরিধি বাড়ানোর ফলে আয়ের পথটাও বেড়েছে। ঢাকার বাইরে বুটিকের কাজ করে ২৫-৩০ জন। নকশিকাঁথার কাজ করে আটজন। আমি চাই, আমার মাধ্যমে আরো অনেকের কাজের সুযোগ করতে।

অন্যদিকে ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠা করি ‘তানুরা যুব উন্নয়ন মহিলা সংস্থা’। এ সংস্থাটি গড়ে তোলার মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজের পিছিয়ে পড়া মহিলাদের হাতের কাজসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজের সুযোগ তৈরি করা। আমার এ সংস্থায় পার্লার হ্যান্ডিক্রাফট, বুটিক, নকশিকাঁথা, পিঠা তৈরিসহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিই। এখন পর্যন্ত প্রায় দুই শ নারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। যাদের মধ্যে অনেকে এখন স্বাবলম্বী। আমি এর মাধ্যমে আরো অনেককে কাজের সুযোগ করে দিতে চাই। আমার ভবিষ্যতে ইচ্ছা আছে পার্লারের পাশাপাশি বুটিক, হ্যান্ডিক্রাফট ও নকশিকাঁথা নিয়ে একটি বিশাল শপ গড়ে তোলার, যাতে এক ছাদের নিচে অনেক সুবিধা দিতে পারি। এতে যেমন অনেকের কাজের সুযোগ হবে, তেমনি নিজের আয়টাও বাড়বে। সে আয় দিয়ে ভবিষ্যতে একটা বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তুলতে চাই। শুধু নিজে দাঁড়ালেই চলবে না, আমি মনে করি সমাজকেও এগিয়ে নিতে হবে যার যার সাধ্যানুযায়ী। আর নতুনদের উদ্দেশে বলব, যে কাজই শুরু করেন মনোবল রাখতে হবে। প্রয়োজনে প্রথমে আপনার পছন্দ ও দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ছোট পরিসরে শুরু করতে পারেন। এরপর জেনে-বুঝে ক্রমান্বয়ে এগোতে পারেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা