kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

‘ভেবেছিলাম সব সহিংসতা ফেলে এসেছি’

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘ভেবেছিলাম সব সহিংসতা ফেলে এসেছি’

শ্রীলঙ্কার নেগোম্বোর সেন্ট সেবাস্টিয়ান গির্জায় গতকাল বোমা হামলায় নিহতদের স্মরণ করতে আসে বহু মানুষ। এ সময় তারা ছিল শোকে বাকরুদ্ধ। ছবি : এএফপি

ইস্টার সানডের দিন সকাল সাড়ে ৭টায় স্ত্রী-পরিবার নিয়ে সেন্ট সেবাস্টিয়ান গির্জায় পৌঁছান দিলিপ ফার্নান্দো। বরাবরই সপরিবারে এই গির্জায় প্রার্থনা করেন তাঁরা। কিন্তু ওই সকালে গির্জায় চিঁড়েচ্যাপ্টা ভিড়। ভেতরে ঢোকাই দায়। এই ভিড়ই ওই দিন পুরো পরিবারকে বাঁচিয়ে দেয় বোমা হামলা থেকে। শ্রীলঙ্কায় গত রবিবার লাগাতার বোমা হামলার অন্যতম ক্ষেত্র এই সেবাস্টিয়ান গির্জা। শুধু এই গির্জাতেই ৭৪ জন নিহত হয়।

ফার্নান্দো পরিবারের সাতজন রবিবার সেবাস্টিয়ান গির্জায় উপস্থিত ছিল। তাদের দাবি, বোমা হামলাকারীকেও দেখেছে তারা। দিলিপ তাঁর পরিবারের কাছ থেকে শোনা বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, ‘প্রার্থনার শেষ দিকে ভারী ব্যাগ কাঁধে এক তরুণ গির্জায় প্রবেশ করে। ভিড়ের মধ্যে ঠেলে-ধাক্কে এগোতে থাকে সে। আমার নাতনির মাথায়ও হাত বুলিয়ে যায়। বয়স খুব বেশি হলে ত্রিশের আশপাশে। তরুণ, চেহারা খুব নিরীহ। উত্তেজিত নয়। ভীতির কোনো ছায়াও তার মধ্যে নেই। শান্ত। আমার পরিবারের সদস্যরা তাকে দেখে বেশ অবাক হয়। কারণ প্রার্থনা তখন শেষ প্রায়। এখন আর ভেতরে ঢুকে কী করবে? তবে অল্পক্ষণের মধ্যেই তার ভেতরে ঢোকার রহস্য পরিষ্কার হয়ে যায়। বিকট শব্দে বিস্ফোরণের আওয়াজ আসে। ভয়ে-আতঙ্কে ছুটতে শুরু করে আমার পরিবারের সবাই। ওই সময় আমার নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। আমার পরিবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বস্তির সঙ্গে আরেকটি অনুভূতি আমাদের গ্রাস করে—তীব্র শোক। শোক পুরো গ্রামের জন্য। শিগগিরই গ্রামে বড় পরিসরে শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে—৭৪টি লাশের।’

কলম্বোর ভানুকা হরিশচন্দ্রকে অবশ্য আরো ভাগ্যবান বলা যায়। রবিবার সকালে তাঁর একটি জরুরি বৈঠক ছিল বিলাসবহুল শাংরি-লা হোটেলে। পৌঁছতে দেরি হয়ে যায় তাঁর। পেছনের ফটক দিয়ে ঢোকার মুখে তিনি বুঝতে পারেন, কিছু একটা গড়বড় হয়েছে। গাড়ি নিয়ে সামনের ফটকে চলে যান। সেখানে নিরপত্তাকর্মীরা তাঁকে বোমা হামলার কথা জানালে তিনি গন্তব্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। ততক্ষণে মনের ভেতর আতঙ্ক বাসা বেঁধেছে। ২৪ বছরের তরুণ ভানুকা গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যান কলম্বোর আরেক বিলাসবহুল হোটেল সিনামন গ্র্যান্ডে। তাঁর ধারণা ছিল, ওই হোটেলটি হয়তো নিরাপদ হবে। পৌঁছে গাড়ি ছেড়ে দেন তিনি। হোটেলে ঢোকার মুখে প্রচণ্ড শব্দে আরেকটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। জান হাতে করে ছুটে পালান ভানুকা। বিস্ফোরণের ছাইয়ে তাঁর সাদা শার্টের রং পাল্টে যায়।

শ্রীলঙ্কায় শৈশব-কৈশোর কাটানো চিকিৎসক জুলিয়ান ইমানুয়েল স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এখন বাস করেন ব্রিটেনে। বোমা হামলায় তাঁর অভিজ্ঞতার গল্পটি একটু ভিন্ন। স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে এ সপ্তাহেই সপরিবারে কলম্বোয় পৌঁছান তিনি। ওঠেন সিনামন গ্র্যান্ড হোটেলে। ইমানুয়েল বলেন, ‘বিকট বিস্ফোরণের সময় আমরা হোটেল রুমেই ছিলাম। বিস্ফোরণের ধাক্কায় আমাদের রুম কেঁপে উঠেছিল। খুব সম্ভবত তখন সাড়ে ৮টা বাজে। আমাদের হোটেলের লাউঞ্জে আনা হয় এবং পেছন দিক দিয়ে পালিয়ে যেতে বলা হয়। সেখানে আমরা কয়েকজন হতাহতকে দেখতে পাই, তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।’

নিজের স্ত্রী-সন্তানের দুরবস্থা নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন ৪৮ বছর বয়সী এই চিকিৎসক আরো বলেন, ‘আমি জীবনের প্রথম ১৮ বছর শ্রীলঙ্কায় কাটিয়েছি। ওই সময়ে আমি গৃহযুদ্ধ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা দেখেছি। কিন্তু আমার ১১ ও ৭ বছর বয়সী সন্তানরা কখনো যুদ্ধ দেখেনি। আমার স্ত্রীরও এ অভিজ্ঞতা নেই। তাদের জন্য এ এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। আমি ভেবেছিলাম, সব সহিংসতাকে আমরা পেছনে ফেলে এসেছি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সহিংসতা আমাদের ছেড়ে যায়নি।’ সূত্র : বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান।

মন্তব্য