kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অক্টোবর ২০১৯। ৩০ আশ্বিন ১৪২৬। ১৫ সফর ১৪৪১       

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অবলম্বনে

ধর্মান্ধ পাকিস্তানে যেভাবে যাত্রা শুরু হয়েছিল মঞ্চনাটকের

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১৮:৩০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ধর্মান্ধ পাকিস্তানে যেভাবে যাত্রা শুরু হয়েছিল মঞ্চনাটকের

'আজোকা'র আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে পাকিস্তানে আজ মুক্ত নাট্যচর্চার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ছবি : বিবিসি

পাকিস্তানে ১৯৮৪ সালে গড়ে উঠেছিল নতুন একটি নাটকের দল। নাম 'আজোকা থিয়েটার'। পাকিস্তানে সামাজিক নানা পরিবর্তন নিয়ে নাটক সৃষ্টির শুরু এই দলের হাত ধরেই। সেই সময় পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল মুহাম্মদ জিয়াউল হক যে জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন তার শর্ত ভঙ্গ করে জন্ম হয়েছিল এই নাট্যদলের।

দলটি প্রতিষ্ঠার পর তাদের প্রথম মূল নাটকে অভিনয় করেছিলেন ফৌজিয়া আফজাল খান। বর্তমানে বাস করেন নিউ ইয়র্কে। সেখানে মন্টি ক্লেয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ইংরেজি পড়ান। তার মুখেই শোনা গেল আজোকা থিয়েটার গড়ে তোলার গল্প।

তিনি বলেন, আজোকা যেভাবে পাকিস্তানে তাদের ভূমিকা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিল, এর আগে কোনো নাটকদল সেভাবে তাদের ভূমিকার কথা ভাবেনি। তার ভাষায়, 'আমাদের মনে হয়েছিল পাকিস্তানে একটা মুক্ত অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ গড়ে তোলার লড়াইয়ে আমাদেরও একটা ভূমিকা রাখা উচিত। আমরা সেই লড়াইয়ে সামিল হতে চেয়েছিলাম। '

১৯৭৭ সালে এক অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে জেনারেল জিয়াউল হক যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন ফৌজিয়া আফজাল খান লাহোরে ছাত্রী। জেনারেল জিয়াউল হক যখন ক্ষমতা হাতে নেন, তখন খুব দ্রুত তিনি শরিয়া আইন প্রবর্তন করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি চালু করেন 'হুদুদ অধ্যাদেশ'। এটি ছিল বিতর্কিত কিছু আইন যার মাধ্যমে পাকিস্তানকে শরিয়া আইনের আওতায় আনার প্রয়াস নেয়া হয়। এসব আইনের মধ্যে ছিল ব্যভিচারীদের শাস্তি হিসাবে পাথর ছুঁড়ে মারা বা তাদের বেত্রাঘাত করা।

কী আছে হুদুদ অধ্যাদেশে? ফৌজিয়া বলেন, 'আমরা তখন সবে প্রাপ্তবয়স্ক তরুণী হয়ে উঠছি। পাকিস্তান যে এই ধরনের আইন চালু করে পেছনের দিকে হাঁটছে তাতে আমরা হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। এই হুদুদ অধ্যাদেশ আইনের লক্ষ্য ছিল মূলত নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। এ আইনে বলা হল একজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমতুল্য হবে দুজন নারীর সাক্ষ্য।'

অর্থাৎ সাক্ষ্যদানের ক্ষেত্রে একজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমান হতে গেলে নারীদের দুজনকে সাক্ষ্য দিতে হবে। সোজা কথায় নারী পুরুষের সমান হতে পারবে না। জেনারেল জিয়ার শাসনামলে ঘরের বাইরে স্কুলে, কলেজে এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে মেয়েদের মাথায় কাপড় দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয় । খেলাধুলা এবং শিল্পকলার বিভিন্ন অঙ্গনে নারীদের অংশগ্রহণ দারুণভাবে সীমিত করে দেওয়া হয়। এই সময়েই ফৌজিয়ার সঙ্গে আলাপ হয় চারুকলার একজন শিক্ষার্থী মাদিহা গওহরের এবং ফৌজিয়া ক্রমশ নাটকে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

ফৌজিয়া বলেন, 'এই আইন চালু হওয়ার পরের বছর ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতোকত্তর একটা শিক্ষা কার্যক্রমে যোগ দেবার জন্য আমি নাম লিখিয়েছিলাম। সেখানেই মাদিহার সঙ্গে আমার আলাপ হয় আর আমরা খুব ভাল বন্ধু হয়ে উঠি। কিন্তু আমরা বুঝতে পারছিলাম মেয়ে হয়ে কোনো কিছু করা খুব কঠিন। আমরা দুজনেই নাটকে আগ্রহী ছিলাম। কিন্তু স্বাধীনভাবে কিছু করা সম্ভব ছিলা না। আমাদের বলা হতো ঠিক আছে, নাটকের মহড়া কর, আমরা আগে দেখি কি করতে চাইছ।'

'তারপর বলা হতো, ওহ না!  এটা তো করা যাবে না। আদেশ নেই। আমার মনে আছে একটা গানের অনুষ্ঠানের জন্য মহড়া দিয়েছি। অনুষ্ঠানের দুদিন আগে বলা হলো, গান গাইতে পারবে না। অনুমতি নেই। ইসলামে গান গাওয়া নিষিদ্ধ। আমাদের কলেজ ছিল কো-এডুকেশন; সেখানেও সমস্যা! একসঙ্গে ছেলে মেয়ে অনুষ্ঠান করতে পারব না। নাটক করাও নিষিদ্ধ ছিল।'

জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় আসার পর ওই বছর থেকেই সব কিছু বদলে যেতে শুরু করে। কিছুদিনের মধ্যেই ফৌজিয়া পাকিস্তান ছেড়ে চলে যান আমেরিকায় লেখাপড়ার জন্য। কিন্তু তার বান্ধবী মাদিহার সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। মাদিহা থেকে গিয়েছিলেন লাহোরে সরকারের চরম কঠোর আইনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে তিনি ছিলেন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

১৯৭৯ সালে জেনারেল জিয়া যে হুদুদ অধ্যাদেশ প্রবর্তন করেছিলেন তার মৃত্যুর পরেও তা প্রত্যাহারের দাবিতে সোচ্চার সমাবেশ অব্যাহত রয়েছে। ১৯৮৪ সালে মাদিহা গওহর আজোকা থিয়েটার সংস্থা গড়ে তোলেন তার উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানে তখন যা ঘটছিল তাকে নাটকের মধ্যে দিয়ে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা।

ফোজিয়া জানান, 'রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় সক্রিয় ছিল এই নাটকের দল। এ ধরনের নাটক তখন ছিল না। কেউ কোনোদিন করে নি। এটা ছিল পুরো নতুন ধরনের। ফলে লোকে উৎসুক ছিল এক্সাইটেড ছিল। রাজনৈতিক নাটকের জন্য মানুষের একটা ক্ষুধা ছিল। প্রচুর মানুষ এল নাটকে দেখতে। কোনো বিজ্ঞাপন ছিল না। সবাই এসেছিল লোকমুখে খবর পেয়ে।'

এরপর ১৯৮৭ সালে 'আজোকা' তাদের নিজস্ব রচনা মঞ্চস্থ করার জন্য উদ্যোগ নেয়। মাদিহা যোগাযোগ করেন বান্ধবী ফৌজিয়ার সঙ্গে। ফৌজিয়ার ভাষায় ,'মাদিহা বলল, শোন দারুণ খবর। আমরা নতুন নাটক নামাচ্ছি। নাটক লেখাই হয়েছে আজোকায় মঞ্চায়নের জন্য। নাটক লিখেছেন শাহেদ নাদিম। আমরা সবাই জানতাম শাহেদ গণতন্ত্রকামী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। জেনারেল জিয়া ক্ষমতাগ্রহণ করার আগে তাকে জেলে যেতে হয়েছিল। জেল থেকে ছাড়া পাবার পর জিয়া প্রশাসন তাকে হুমকি-ধামকি দেয়। ফলে দেশ ছেড়ে পালিয়েছিল সে।'

মাদিহা ফৌজিয়াকে বললেন ওই নাটকে অংশ নিতে। ফৌজিয়া ফিরে গেলেন লাহোরে দলের প্রথম মূল নাটকে অংশ নিতে। নাটকের নাম ছিল বারি যার অর্থ 'খালাস'। এই নাটকে হুদুদ আইনকে সরাসরি আক্রমণ করা হয়। তুলে ধরা হয় এই আইনের কারণে নারীরা কীভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে। যেমন কোনো নারী ধর্ষণের শিকার হলে তাকে এই অপরাধ প্রমাণ করার জন্য চারজন পুরুষ সাক্ষী আনতে হবে। আর সেই নারী যদি তা করতে না পারে তাহলে তাকেই ব্যভিচারের দায়ে অভিযুক্ত করা হবে।

ফৌজিয়া বলেন, 'বারি' নাটকটি ছিল ঊর্দু ও পাঞ্জাবি ভাষায়। ফৌজিয়া বলেছেন, তিনি যে ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন সেই নারীর মুখের ভাষা ছিল 'সারাইকি' । এই ভাষায় কথা বলা হয় দক্ষিণ পাঞ্জাবে। আমি অভিনয় করেছিলাম ওই এলাকার এক নারীর ভূমিকায়, যে ওই অঞ্চলের ভাষায় গান করে, বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে। দুঃখের বিষয়, এই মুহূর্তে পাঞ্জাবের ওই অঞ্চলে ধর্মীয় উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়েছে।'

'ওই অঞ্চলের সুফি কবিরাও কিন্তু লিখতেন এই সারাইকি ভাষায়। আমি ওই নাটকে যে নারীর চরিত্রে অভিনয় করছিলাম সেই চরিত্রে আমি খুবই প্রশাসন বিরোধী গান গেয়েছিলাম। সারাইকি ভাষায় গাওয়া ওই গানে ছিল ধর্মীয় উগ্রবাদী চিন্তাধারার কড়া সমালোচনা আর মোল্লাদের ব্যঙ্গ করে ঠাট্টাতামাশা।'

ওই নাটকে সেসময় পাকিস্তানের নারীদের দুরাবস্থার কথা তুলে ধরা হয়েছিল। যে নারীদের লক্ষ্য করে তৈরি হয়েছিল বৈষম্যমূলক নানা আইন, তুলে ধরা হয়েছিল তাদের দুঃখের কথা। জেনারেল জিয়ার শাসনামলে ঘরের বাইরে স্কুলে, কলেজে এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে মেয়েদের মাথায় কাপড় দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয় ।

'নাটকটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নারীদের সমস্যা সম্পর্কে অন্যদের সচেতন করাই ছিল নাটকের মূল লক্ষ্য। আমরা তুলে ধরতে চেয়েছিলাম কত কঠিন সংগ্রামের মুখোমুখি আমরা।'

'প্রশাসন অবশ্যই অখুশি হয়েছিল আমাদের ওপর। আজোকা থিয়েটার তার জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে তাদের যাত্রাপথে সরকারের দিক থেকে নানাধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ধর্মীয় নেতাদের রোষানলে পড়েছে বহুবার। মাদিহাকে জেলে যেতে হয়েছে। ধর্মীয় দলগুলো যেহেতু অভিযোগ আনত এসব অনৈসলামিক, ফলে তার নাটক অনুষ্ঠানগুলোর ওপর প্রায়ই নজরদারি চালানো হতো। ওর বেশ কিছু নাটক নিষিদ্ধও করা হয়েছে।'

আজোকার জন্য নাটক মঞ্চায়ন ছিল রীতিমত একটা সংগ্রামের ব্যাপার, বলছিলেন ফৌজিয়া আফজাল খান, 'মাদিহা ছিলেন রীতিমত দু:সাহসী। তিনি লোকজন জড়ো করতেন। আমরাও তুমুল উৎসাহে আমাদের বক্তব্য তুলে ধরতাম। বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে আজোকার যাত্রাপথের ইতিহাসের একটা বড় অংশ ছিল প্রতিনিয়ত হয়রানির মধ্যে নাটক মঞ্চায়নের দুরূহ চেষ্টা।'

জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় ছিলেন ১১ বছর। কিন্তু যে আইন তিনি চালু করেছিলেন তা এখনও কার্যকর রয়েছে। ২০০৬ সালে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশারফ নারীদের সুরক্ষা দিতে এই আইনগুলোর কিছুটা আধুনিকায়নের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তার সংস্কারগুলো খুবই সীমিত মাত্রায় বাস্তবায়িত হয়েছিল।

মাদিহা গওহর মারা যান চলতি বছর ২০১৮ সালে। কিন্তু তার হাতে গড়া আজোকা নাট্যদল এখনও রাজনৈতিক নাটক মঞ্চস্থ করছে। কিন্তু তাদের এই নাটক সমাজে কতটা পরিবর্তন এনেছিল? এই প্রশ্নে ফৌজিয়া আফজল খান বলেন, এই নাট্যদল পাকিস্তানে খুবই প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছে। তিনি মনে করেন, নাটকের মাধ্যমে সমাজে পরিবর্তন আনার জন্য যে আন্দোলন আজোকা শুরু করেছিল, তার ফলশ্রুতিতে পাকিস্তানে আজ মুক্ত নাট্যচর্চার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

ফৌজিয়ার ভাষায়, 'আজোকার মূল উদ্দেশ্য ছিল নাটকের মাধ্যমে সমাজে পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে কাজ করা। এছাড়াও অন্যান্য থিয়েটার দলের জন্য কাজ করার পথ প্রশস্ত করতে সাহায্য করেছিল আজোকা। তারা একসঙ্গে যে নাট্য আন্দোলন গড়ে তুলেছিল তার ফলশ্রুতিতে পাকিস্তানে আজ একটা মুক্ত নাট্যচর্চার পরিবেশ গড়ে উঠেছে। আজোকা না থাকলে সেটা কোনোদিনই সম্ভব হতো না।'

জিয়াউল হক পরবর্তী পাকিস্তান ছিল নাট্যচর্চার ক্ষেত্রে অন্ধকার কয়েকটি দশক। সেই সময় মাদিহা সবরকম প্রতিকূলতার মুখেও পাকিস্তানে সামাজিক নাটকের মঞ্চায়ন, সেইসঙ্গে নাটকে গান ও নাচের ব্যবহারকে বাঁচিয়ে রাখার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন। ফৌজিয়া মনে করেন উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার শিল্পকলার চর্চা।

তার যুক্তি, 'কারণ শিল্পসংস্কৃতি না থাকলে মানুষের আশার মুত্যু ঘটে। উগ্রপন্থায় যে হত্যার আদর্শকে অনুপ্রাণিত করা হয়, তার বিরুদ্ধে কথা বলার একমাত্র মাধ্যম শিল্পকলার চর্চা। এর মধ্যে দিয়েই মানুষ তার বিকল্প পথ খুঁজে নিতে পারে। শিল্পসংস্কৃতি না থাকলে সমাজে মত বিনিময় বা সংলাপের পথ অবরুদ্ধ হয়ে যায়। শিল্পসংস্কৃতি ছাড়া কোনো সমাজ টিঁকতে পারে না।'

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা