সুনামগঞ্জের ছাতকের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে রয়েছে ইংলিশ টিলা। সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাব এবং দখলদারত্বের কারণে ১৭৬ বছর আগে নির্মিত স্থাপনাটি এখন ধ্বংসের মুখে। এটি সংস্কারে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি স্থানীয়দের।
সম্প্রতি ছাতক পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাগবাড়ী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রায় দুই একর ৬০ শতক খাস জমিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঐতিহাসিক ইংলিশ টিলা। স্মৃতিস্তম্ভটির বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল। কয়েকটি অংশ ক্ষয়ে পুরো কাঠামোটি একদিকে হেলে রয়েছে। প্রায় ২০০ ফুট উঁচু এই টিলার চূড়ায় রয়েছে ৪০ থেকে ৫০ ফুট উচ্চতার একটি পাকা স্মৃতিস্তম্ভ, যা স্থানীয়ভাবে সাহেব মিনার নামে পরিচিত।
স্থানীয়রা জানায়, এক ইংরেজ নারী তার মৃত ব্যবসায়ী স্বামীর স্মরণে স্মারকটি নির্মাণ করেন। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্মৃতিস্তম্ভটির এই ভগ্ন দশা। একটি চক্র টিলা থেকে মাটি কেটে নিলেও দেখার কেউ নেই।
স্থানীয়রা আরো জানায়, টিলার তিন দিকে বসবাস করছে প্রায় অর্ধশত পরিবার। টিলা কেটেই তারা বসবাসের স্থাপনা নির্মাণ করে। টিলায় ধস দেখা দেওয়ায় তারাও রয়েছেন ঝুঁকিতে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, প্রবল বৃষ্টি, ঝড় কিংবা ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে স্মৃতিস্তম্ভটি ধসে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে গত এক বছরে একাধিকবার ছাতক উপজেলাকে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল হিসেবে চিহ্নিত করায় তাদের মধ্যে উদ্বেগ আরো বেড়েছে।
ইতিহাস চর্চা করে এমন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, ১৭৯৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির আমন্ত্রণে ইংল্যান্ড থেকে জর্জ ইংলিশ নামের এক ব্রিটিশ ব্যবসায়ী সপরিবারে ছাতকে আসেন। তার হাত ধরেই এ অঞ্চলে চুন ও চুনাপাথর ব্যবসা শুরু হয়। পরে এই শিল্পকে কেন্দ্র করেই ছাতক ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকায় পরিণত হয়।
দীর্ঘ কর্মময় জীবন শেষে ১৮৫০ সালে ৭৬ বছর বয়সে ছাতকেই মারা যান জর্জ ইংলিশ। তার স্ত্রী হেসরি স্বামীর স্মৃতি স্মরণীয় করে রাখতে ইংলিশ টিলার ওপর তাকে (জর্জ ইংলিশ) সমাহিত করেন। একই বছর সমাধির পাশে একটি দৃষ্টিনন্দন চারকোণা আকৃতির স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন তিনি। হেসরি পরে ইংল্যান্ডে ফিরে গেলেও স্থানটি খাস জমির অন্তর্ভুক্ত হয়। স্থানীয়ভাবে স্মৃতিস্তম্ভটিকে সাহেব মিনারও বলা হয়।
বাগবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা মনির উদ্দিন বলেন, দেড়শ বছরেরও বেশি পুরনো এই স্থাপনাটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। মাঝখানে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে এবং এটি একদিকে হেলে পড়েছে। যেকোনো সময় ধসে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। আমরা দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানাচ্ছি।
একই এলাকার আরেক বাসিন্দা খায়ের উদ্দীন বলেন, বর্ষা মৌসুমে টিলার আশপাশে বিভিন্ন সময় ঘরবাড়ি বানিয়ে নিয়েছে। টিলা কাটার কারণে তারাও এখন ঝুঁকির মুখে।
ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দীন বলেন, ছাতকে ১৭৬ বছরের পুরনো ইংলিশ টিলাটি ঐতিহ্যের স্মারক। টিলাটিকে কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, সে ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




