kalerkantho

সোমবার । ২৮ নভেম্বর ২০২২ । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

হাটহাজারী উপজেলা এসিল্যান্ড অফিস

অপমান সইতে না পেরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বৃদ্ধের মৃত্যু

হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি   

৬ অক্টোবর, ২০২২ ০০:১৪ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অপমান সইতে না পেরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বৃদ্ধের মৃত্যু

চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসের দুই কর্মচারীর গালাগাল ও অপমান সইতে না পেরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এক বৃদ্ধের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। পেশায় দিনমজুর ওই বৃদ্ধের নাম আবদুল মোনাফ (৬২)। মোনাফের বাড়ি হাটহাজারী উপজেলার উত্তর ফতেয়াবাদ পশ্চিম খাগড়িয়া ছড়ারকুল এলাকায়। গত ২৩ সেপ্টেম্বর মোনাফ হার্ট অ্যাটাকে মারা যান।

বিজ্ঞাপন

গত আগস্টের প্রথম সপ্তাহে এসিল্যান্ড অফিসে তার সঙ্গে দুর্ব্যবহারের ঘটনাটি ঘটে।  

এদিকে ওই দুই কর্মকর্তার শাস্তি চেয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন প্রয়াত আবদুল মোনাফের মেয়ে মিনু আক্তার। এদিকে বৃদ্ধ মোনাফকে হাটহাজারী এসিল্যান্ড অফিসে দুই কর্মচারী কর্তৃক অকথ্য ভাষায় গালাগালি ও দুর্ব্যবহারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এলাকায় এ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, ক্ষুব্ধ নাগরিকরা এ দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।

নিহত বয়োবৃদ্ধ মোনাফের মেয়ে মিনু আক্তারের অভিযোগে প্রকাশ, হাটহাজারী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসের বিজয় নন্দন বড়ুয়া এবং নিউটন বড়ুয়া নামে দুই কর্মচারীর গালাগাল ও অপমান সইতে না পেরে তার বাবা মারা গেছেন। মিনু জানান, তার প্রয়াত মা নুর বেগমের পৈতৃক সূত্রে পাওয়া কিছু জমি হাটহাজারী উপজেলা এসিল্যান্ড অফিসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে জসিম উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি পৃথক নামজারি খতিয়ান (২৬৫৭ ও ২৮৯১) করে নেন। জমাভাগ মামলা নম্বর যথাক্রমে গ-২৩৯/১১ এবংগ-২১৪৯/১২৷ জমির পরিমাণ ০০৩০০ শতাংশ। উক্ত জমি ২০১৭ সালে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করে সরকার।

খতিয়ান দুটি বাতিলের জন্য ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে এসিল্যান্ড বরাবর আবেদন করেন তার বাবা আব্দুল মোনাফ ও তার মেয়ে মিনু আক্তার। তিন বছরের বেশি সময় ধরে এসিল্যান্ড অফিসে ঘুরলেও সেই খতিয়ান বাতিল না করে উল্টো তাদের আবেদনটি খারিজ করে দেন বর্তমান এসিল্যান্ড আবু রায়হান। সাড়ে তিন বছরেও মামলা নিষ্পত্তি তো হয়নি, অনৈতিক দাবি পূরণ না করায় এবং জসিমের সঙ্গে আঁতাত করে আবদুল মোনাফকে চরম হয়রানি করেন ভূমি অফিসের অফিস সহকারী বিজয় নন্দন বড়ুয়া।

মিনুর অভিযোগ, গত আগস্টের প্রথম সপ্তাহে একদিন অফিসে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণ জানতে গিয়ে বিজয় নন্দন বড়ুয়া এবং তার আরেক সহকর্মী নিউটন বড়ুয়ার হাতে লাঞ্ছিত এবং অপমানিত হন তার বাবা আবদুল মোনাফ। এসিল্যান্ড অফিসের কর্মচারী বিজয় বড়ুয়া এবং নিউটন বড়ুয়া গালাগাল এবং অপমান করার পরে বাবা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে তাকে হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করাতে হয়।

ডাক্তাররা জানান, তিনি হঠাৎ হৃদরোগ আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। ১৪টি ইনজেকশন দেওয়ার পরে একপ্রকার সুস্থ হয়ে তিনি ঘরেও ফিরে আসেন। কিন্তু এসিল্যান্ড অফিসের কর্মকর্তাদের দুর্ব্যবহার তিনি ভুলতে পারছিলেন না। গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে তার শারীরিক অবস্থার হঠাৎ অবনতি হয়। তখন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে তার বাবাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। ‘এসিল্যান্ড অফিসের কর্মচারী বিজয় নন্দন বড়ুয়া ওনিউটন বড়ুয়ার দুর্ব্যবহারের ধকল সইতে না পেরে আমার বাবা মারা গেছেন। আমি বিজয়নন্দন বড়ুয়া ও নিউটন বড়ুয়ার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই’ বলেন মিনু আক্তার।

এদিকে আবদুল মোনাফকে দুর্ব্যবহার করার একটি ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এতে দেখা যায়, বৃদ্ধ মোনাফের সঙ্গে তুমুল বাকবিতন্ডায় লিপ্ত বিজয় নন্দন বড়ুয়া ও নিউটন বড়ুয়া। তবে দুই কর্মচারী বৃদ্ধ আব্দুল মোনাফকে অশালীন অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন। বৃদ্ধের সঙ্গে দুই সরকারি কর্মচারীর ব্যবহার ছিল রাস্তার চাঁদাবাজ গুন্ডাদের মতো। ভিডিওতে দেখা যায় বৃদ্ধ মোনাফকে লক্ষ্য করে এসিল্যান্ড অফিসের কর্মচারী বিজয় নন্দন বড়ুয়া চরম উত্তেজিত স্বরে বলেন ‘বেয়াদবের বাচ্চা থাপড়াইয়্যা গাল ফাটায় দেব। ওকে লাথি দিয়ে বের কর। এসময় ’আব্দুল মোনাফ: বলেন ‘আমারকাজ শেষ না করে বছরের পর বছর ঘুরাস কেন?’

প্রতি উত্তরে বিজয় নন্দন বড়ুয়া বলেন, ‘তোকে কোনো... (চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় গালি দিয়ে) ঘুরায়? শুয়োরের বাচ্চা একদম ফুটবলের মতো মারব। পা দিয়ে পিষে দেব। তখন ’আব্দুল মোনাফ বলেন, ‘মানুষকে এত কষ্ট দাও কেন?’ এতে আরো ক্ষিপ্ত বিজয় নন্দন বড়ুয়া বলেন, ‘শালারপুতকে বাঁধ’ । একই সময়ে আকস্মিক আব্দুল মোনাফের দিকে তেড়ে এসে আঙুল উঁচিয়ে অপর কর্মচারী নিউটনবড়ুয়া বলেন, ‘গালিগালাজ করবা, না। গালিগালাজ করলে পিঠের চামড়া তুলে ফেলব। সূত্রে প্রকাশ, প্রকাশ্যে দিন দুপুরে সরকারি ভূমি অফিসে সেবাগ্রহীতার সঙ্গে দুজন সরকারি কর্মকর্তার এমন দুর্ব্যবহার দেখে সেদিন বিস্মিত হন উপস্থিত লোকজন।

মিনু আক্তার জানান, গত ২০১৭ সালের আগে হাটহাজারীর মীরেরহাট মধ্য পাহাড়তলী মৌজায় তার মা নুর বেগমের বাবার (মৃতবাচা মিয়া) সূত্রে পাওয়া জমি আনোয়ারা বেগম নামে এক নারীর কাছে নিজের অংশসহ বিক্রি করেন নুর বেগমের ভাই রফিক মিয়া। পরে সেই জসিম উদ্দিন নামে আরেক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেন আনোয়ারা বেগম। জসিম উদ্দিন নুর বেগমের প্রাপ্ত অংশসহ নামজারি খতিয়ান সৃজন করেন।

এর আগে নামজারি খতিয়ান সৃজন করেন আনোয়ারা বেগম। ২০১৭ সালে ওই জমি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করে সরকার। নুর বেগমের প্রাপ্ত অংশের ক্ষতিপূরণ পেতে তৎপরতা শুরু করেন জসিম উদ্দিন। বিষয়টি জানতে পেরে খতিয়ান দুটি বাতিলের জন্য ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে হাটহাজারী উপজেলার তৎকালীন এসিল্যান্ড সম্রাটখীসার কাছে আবেদন করেন (নামজারি পুনর্বিবেচনা মামলা নং-১৫৭/২০১৯) আবদুল মোনাফ এবং তার মেয়ে মিনু আক্তার। তিন বছরের বেশি সময় ধরে আব্দুল মোনাফ এসিল্যান্ড অফিসের দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও মামলাটি নিষ্পত্তি হয়নি। বিভিন্ন কর্মকর্তার হাত ঘুরে দেড় বছর ধরে তার মামলার ফাইলটি দেখাশোনা করছিলেন বিজয় নন্দন বড়ুয়া। কিন্তু দাবিকৃত ঘুষ না দেওয়াতে তিনি নানা অজুহাতে নিষ্পত্তির জন্য সহায়তা না করে ফাইলটি আটকে রাখেন বলে অভিযোগ মিনু আক্তারের।

মিনু আকতার বলেন, ‘বাবার সঙ্গে দুর্ব্যবহারের পরের দিনই এসিল্যান্ড স্যারকে ভুলভাল বুঝিয়ে খতিয়ান বাতিলের আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়। এরপর থেকে আমার বাবা মানসিক যন্ত্রনায় ভুগতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত ন্যায্য হক ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে হেরে যান আমার বাবা। দুর্ব্যবহার ঘটনার পর হার্টঅ্যাটাকের ফলে দেড় মাস কষ্ট পেয়ে মারা যান বাবা। ’ যোগ করেন মিনু আক্তার। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিজয় বড়ুয়া গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি ওনার সঙ্গে খারাপ আচরণ করিনি। ওনি উল্টো আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছেন। আমাকে গালি দিলে আমিও রাগের মাথায় তাকে বেয়াদপ বলেছি। আর তাকে অফিস থেকে বের করে দিতে বলছি। বাঁধার কথা, মারার কথা বলিনি। ’

এদিকে এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে এলাকায় ব্যপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এলাকাবাসী সরকারি ভূমি অফিসে প্রকাশ্যে দিনদুপুরে দুজন সরকারি কর্মচারী কর্তৃক বৃদ্ধ সেবা গ্রহীতা আব্দুল মোনাফের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা দুই কর্মচারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হাটহাজারীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবু রায়হান বলেন, ‘আমি এ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নই। কেউ আমার কাছে লিখিত অভিযোগ দেননি। যে দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হচ্ছে তারা আমার দপ্তরের স্টাফ। ইতিমধ্যে তাদের অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। লিখিত অভিযোগ হাতে পেলে তদন্ত করে দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি গণমাধ্যমকে জানান।



সাতদিনের সেরা