kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী

প্রকল্পের টাকায় খাসজমিতে আওয়ামী লীগের কার্যালয়

রফিকুল ইসলাম, রাঙ্গাবালী থেকে ফিরে   

৪ অক্টোবর, ২০২২ ০২:৪৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রকল্পের টাকায় খাসজমিতে আওয়ামী লীগের কার্যালয়

খাসজমি দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে আওয়ামী লীগের কার্যালয়। গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় নির্মাণের জন্য প্রায় ৬০ শতাংশ সরকারি খাসজমি দখল করা হয়েছে। সেই জমিতে সরকারি প্রকল্পের টাকায় একতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। সেপটিক ট্যাংক নির্মাণ, গভীর নলকূপ ও টাইলস স্থাপন, বৈদ্যুতিক কাজ করা হয়েছে সরকারি টিআর-কাবিটা প্রকল্পের টাকায়। এখানেই শেষ নয়, দলীয় কার্যালয়ে যেতে এলজিইডির টাকায় রাস্তা নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

২০২১-২২ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর নগদ টাকা) কর্মসূচির আওতায় রাঙ্গাবালী আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সেপটিক ট্যাংক নির্মাণের জন্য তিন লাখ, টাইলসের জন্য তিন লাখ এবং অফিসের রং ও বৈদ্যুতিক কাজের জন্য তিন লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়। স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) মহিববুর রহমান তাঁর প্যাডে ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর জেলা প্রশাসকের দপ্তরে প্রকল্পের তালিকা পাঠান।

২০২০-২১ অর্থবছরে টিআর কর্মসূচির আওতায় রাঙ্গাবালী আওয়ামী লীগের কার্যালয় ভবন নির্মাণের জন্য ১০ লাখ টাকার প্রকল্প জেলা প্রশাসক অনুমোদন দেন।

একই অর্থবছরে টিআর প্রকল্পের আওতায় রাঙ্গাবালী আওয়ামী লীগের অফিসের অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার জন্য পাঁচ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এমপি মহিববুরের পাঠানো প্যাডে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা রণজিৎ কুমার সরকার অনুমোদন করেন।

একই অর্থবছরে কাবিটা কর্মসূচির আওতায় রাঙ্গাবালী আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের মাঠ ভরাটের জন্য পাঁচ লাখ টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।

এ ছাড়া ২০১৯-২০ অর্থবছরে টিআর কর্মসূচির আওতায় নন-সোলার খাতে ৮৪ হাজার টাকা ব্যয়ে রাঙ্গাবালী আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়।

এলজিইডির নতুন রাস্তা

২০১৯-২০ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) রাঙ্গাবালী উপজেলা কার্যালয় রাস্তা সংস্কার প্রকল্প হাতে নেয়। সেই প্রকল্পে সাড়ে ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে যাতায়াতের জন্য নতুন আরসিসি রাস্তা নির্মাণ করা হয়। রাস্তাটি রাঙ্গাবালীর বাহেরচর বাজারের মূল রাস্তা থেকে ১৬৪ ফুট দীর্ঘ এবং সাড়ে ১১ ফুট প্রশস্ত।

এলজিইডি সূত্র বলছে, উপজেলা পরিষদের সমন্বয়সভায় এমপি মহিববুর রহমান আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে যাতায়াতের জন্য নতুন রাস্তা নির্মাণের প্রস্তাব করেন। সেই প্রস্তাব এলজিইডির প্রকৌশলী বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করেন। পরে দলীয় কার্যালয়ের জন্য দখলকৃত প্রায় ৬০ শতাংশ জমির মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশে বালু ফেলে রাস্তা নির্মাণ করে দেয় এলজিইডি। এসংক্রান্ত সব অনুমোদনের কাগজ কালের কণ্ঠের কাছে সংরক্ষিত আছে।

স্থানীয় শাসন বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, টিআর-কাবিটা প্রকল্প গরিবদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কারের জন্য। গরিবদের বঞ্চিত করে সেই অর্থ দিয়ে দলীয় কার্যালয় নির্মাণ বেআইনি। তা ছাড়া একই প্রকল্পে বারবার বরাদ্দও আইনসম্মত নয়। এলজিইডির এক জায়গায় প্রকল্প দেখিয়ে অন্য স্থানে বাস্তবায়ন আইনের পরিপন্থী।

রাঙ্গাবালীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) সালেক মুহিব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাহেরচর বাজারে উপজেলা আওয়ামী লীগের একতলা ভবনবিশিষ্ট দলীয় কার্যালয় দেখেছি। সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছি, তাই  বলতে পারছি না সেখানে কতটুকু জমি খাস। সরেজমিনে গিয়ে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘টিআর-কাবিটা প্রকল্পের অর্থে খাসজমিতে রাঙ্গাবালীতে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় হয়েছে কি না আমার জানা নেই। দলীয় কার্যালয়ের ভবন তৈরিতে টিআর-কাবিটা প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া যায় কি না, তাও এই মুহূর্তে বলতে পারব না। ’

দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা যা বলছেন

উপজেলা যুবলীগের সভাপতি হুমায়ুন তালুকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের (পারিবারিক) অনেক জমি সরকার অধিগ্রহণ করেছে। আমাদের জমির সামনে প্রায় ৬০ শতাংশ খাসজমি ছিল। সেই জমি ভরাট করে অস্থায়ী স্থাপনা করেছিলাম। জমিটি বরাদ্দ পেতে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছিলাম। জমিটি দখল করে এমপির অনুসারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুজ্জামান মামুন দলীয় কার্যালয়ের ভবন নির্মাণ করেছেন। ’

উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন, এমপি মহিববুর রহমানের প্রচেষ্টায় সরকারি প্রকল্পে খাসজমিতে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। দলীয় জনপ্রতিনিধিরাও অর্থ দিয়েছেন। জমি বরাদ্দ পেতে প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছিল। দলীয় কার্যালয়ের অনুকূলে সরকারি জমি বন্দোবস্তের বিধান নেই। তাই দ্রুত দলীয় নেতাকর্মীদের নামে জমি বরাদ্দ পাওয়ার ব্যাপারে আশ্বাস মিলেছে।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও রাঙ্গাবালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদুজ্জামান মামুন বলেন, সরকারি প্রকল্পের পাশাপাশি দলীয় কর্মীদের টাকায় ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। জনসাধারণ মানে নেতাকর্মীরা ভবন ব্যবহার করবেন।

এ বিষয়ে কথা বলতে এমপি মহিববুর রহমানের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী তরিকুল মৃধা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জরুরি কাজে আমি ঢাকার পথে। মহিববুর রহমান রাঙ্গাবালীতে একটু ব্যস্ত আছেন। ’ তরিকুল রাঙ্গাবালী উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি কামরুজ্জামান শিপলুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। শিপলুর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘এমপি দলীয় কার্যালয়ে জরুরি সভা করছেন। ’



সাতদিনের সেরা