kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

আশ্রয়ণ প্রকল্প বন্ধ, পুকুর কাটছেন আওয়ামী লীগ নেতা

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম    

২ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আশ্রয়ণ প্রকল্প বন্ধ, পুকুর কাটছেন আওয়ামী লীগ নেতা

দখল: কক্সবাজারের চকরিয়ার ফাসিয়াখালীতে আশ্রয়ণ প্রকল্পের জায়গা দখল করে সেখানে পুকুর খনন করেন এক আওয়ামী লীগ নেতা। সম্প্রতি তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে কক্সবাজারের চকরিয়ায় শতাধিক ভূমিহীন পরিবারের পুনর্বাসনে আশ্রয়ণ প্রকল্প হাতে নিয়েছিল স্থানীয় প্রশাসন। তবে আওয়ামী লীগের স্থানীয় এক নেতার জবরদখলের কারণে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। এখন প্রকল্পের সরকারি জায়গায় পুকুর কাটছেন ওই আওয়ামী লীগ নেতা। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে এই অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞাপন

 
উপজেলা প্রশাসন জানায়, জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী আশ্রয়ণ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের উচিতার বিল মৌজার ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত প্রায় আট একর জায়গা বাছাই করা হয়। ২০২১ সালের জুলাই মাসে সহকারী কমিশনারের (ভূমি) নেতৃত্বে সার্ভেয়ার জায়গাটির চারপাশে খুঁটিতে লাল নিশান টাঙিয়ে দেন। কিন্তু প্রশাসনের কর্মকর্তারা সেখান থেকে যাওয়ার পরপরই খুঁটি উপড়ে ফেলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী। এরপর তিনি জায়গাটি নিয়ন্ত্রণে নেন। জায়গার তিন দিকে কংক্রিটের পিলার ও লোহার বেষ্টনী দেওয়া হয়। খননযন্ত্র (এক্সকাভেটর) দিয়ে জমির মাটি খোঁড়া শুরু হয়। সে সময় সহকারী কমিশনারের (ভূমি) নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়। খননযন্ত্র জব্দ করা হয়। তবে ওই নেতার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেনি প্রশাসন।  
 
ফাঁসিয়াখালীর জমিজমার বিষয়াদি দেখভাল করেন পাশের চিরিঙ্গা ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা সলিম উল্লাহ। তিনি বলেন, সরকারের ১ নম্বর খাস খতিয়ানের উচিতার বিল মৌজার টিলা ও সমতল শ্রেণির প্রায় আট একর জায়গা দখল করেছেন গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী। তাঁর মালিকানাধীন জিএলবি নামের অবৈধ ইটভাটা লাগোয়া সেই জায়গা ছিল ভূমিহীন ও গৃহহীন শতাধিক পরিবারকে পুনর্বাসনে আশ্রয়ণ প্রকল্প নির্মাণের নির্ধারিত স্থান। তিনিসহ ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার, একদল কর্মচারী ও শ্রমিকরা গিয়ে সংরক্ষিত বনের ভেতর অবৈধ ইটখোলা লাগোয়া সেই খাস জায়গা চিহ্নিত করে খুঁটি দেওয়াসহ সাইনবোর্ড স্থাপন করেন। কিন্তু তাঁরা সরে যাওয়ার পর খুঁটি ও সাইনবোর্ড গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর সেই জায়গা ইটখোলার নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। ইট বানানো, লাকড়ি মজুদ করাসহ বিভিন্ন কাজে জায়গাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, দখলে নেওয়া সেই খাস জায়গার টিলা ও নাল শ্রেণির খাস জায়গায় এক্সকাভেটর দিয়ে পুকুর খনন করা হচ্ছে।  
 
চকরিয়ার তত্কালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তানভীর হোসেন বর্তমানে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত খাস জায়গাটি আওয়ামী লীগ নেতা গিয়াসের অবৈধ ইটখোলা লাগোয়া। তাই ওই নেতার প্রভাব-প্রতিপত্তি ও দাপটের কারণে সেখানে আর বাস্তবায়ন করা যায়নি মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে আশ্রয়ণ প্রকল্প নির্মাণের কাজ। এর পরও সেখানে আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে আওয়ামী লীগ নেতা গিয়াসের বাধার কারণে প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়।
 
গত ২৩ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেই খাস জায়গায় এক্সকাভেটর দিয়ে একাধিক বিশাল পুকুর কাটা হচ্ছে। বাকি জায়গায় ধানের চারা রোপণ ও সবজির আবাদ চলছে।
 
ফাঁসিয়াখালী ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন হেলালী কালের কণ্ঠকে বলেন, কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফাঁসিয়াখালী বন বিটের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের উচিতার বিলটি ছিল মূলত বন্য হাতির অভয়ারণ্য। এক-এগারোর পর সংরক্ষিত বনাঞ্চল উজাড়, গাছপালা নিধনসহ বন্য হাতির অভয়ারণ্য ধ্বংস করে সেখানে অবৈধভাবে ইটখোলা গড়ে তোলেন আওয়ামী লীগ নেতা গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী। এ কারণে বন বিভাগের গৃহীত সামাজিক বনায়নের বেশ কয়েকটি প্রকল্পও ভেস্তে গেছে। সেই বনায়নের গাছপালাও ইটখোলায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘শতাধিক ভূমিহীন ও গৃহহীনের পুনর্বাসনের জমি অবৈধভাবে দখল করে প্রভাবশালী গিয়াস উদ্দিন মত্স্য চাষের জন্য একাধিক পুকুর তৈরি করেছেন। জমির শ্রেণি পরিবর্তনসহ ভয়াবহ এই পরিবেশ বিপর্যয়ের ঘটনায় তাঁর (গিয়াস) বিরুদ্ধে  দৃশ্যমান কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ’
 
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সদ্যোবিদায়ি সাবেক সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী গতকাল শনিবার রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি দুই বছর আগে জায়গাগুলো কিনেছি। আমার কেনা জায়গার মধ্যে পুকুর খনন করা হয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের জায়গা কিংবা খাস জায়গা দখল করলে প্রশাসন ব্যবস্থা নিত না? আমার কেনা জায়গার উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ পাশে খাস জায়গা আছে। আমি খাস জায়গা দখল করিনি। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, তা শতভাগ মিথ্যা। ’
 
বর্তমান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রাহাত উজ-জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফাঁসিয়াখালীর উচিতার বিল মৌজার বেদখল হওয়া আট একরের খাস জায়গাটি পরিদর্শন করা হয়েছে। সেখানে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে একাধিক পুকুর খননের বিষয়টি ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ’
 
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জে পি দেওয়ান বলেন, ‘সরকারের এক ইঞ্চি খাসজমিও কোনো অবৈধ দখলদারের নিয়ন্ত্রণে থাকতে দেওয়া হবে না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে শতাধিক ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসনে আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্ধারিত সেই জায়গা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হবে। এরপর পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। ’


সাতদিনের সেরা