kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৯ নভেম্বর ২০২২ । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

চিকিৎসার নামে নির্যাতন, কিশোরের মৃত্যুতে ভণ্ড কবিরাজসহ গ্রেপ্তার ৩

নীলফামারী প্রতিনিধি   

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ২১:৪৬ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চিকিৎসার নামে নির্যাতন, কিশোরের মৃত্যুতে ভণ্ড কবিরাজসহ গ্রেপ্তার ৩

নিহত সোহেল রানার সাথে সম্প্রতি ছবিটি তুলেছিলেন তার দুলাভাই। ছবি- কালের কণ্ঠ।

পক্ষাঘাতগ্রস্ত কিশোর সোহেল রানার (১৫) বাঁকা পা সোজা করতে তেল মালিশসহ নানা অপচেষ্টা চালান কবিরাজ মোকাব্বর হোসেন। একপর্যায়ে ওই পায়ে ইট বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা এবং বলপ্রয়োগে টেনে হিঁচড়ে সোজা করার অপচেষ্টায় ভেঙে যায় সে পা। এ সময় কিশোর সোহেলের আত্মচিৎকার হৃদয় ছুঁতে পারেনি ভণ্ড কবিরাজ মোকাব্বর হোসেনের (৫৫)।

তিন দিন ধরে আটকে রেখে সোহেলের ওই ভাঙা পায়ে চলে গরম বালির সেক।

বিজ্ঞাপন

অবশেষে গত বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সোহেল।

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার চাঁদখানা ইউনিয়নের সরঞ্জাবাড়ি গ্রামে ওই ঘটনাটি ঘটে। নিহত সোহেল রানা সেই গ্রামের কেরামত আলীর ছেলে। এ ঘটনায় ভণ্ড ওই কবিরাজ মোকাব্বর হোসেনসহ তার সহযোগী আনোয়ার হোসেন (৪৫) ও শফিকুল ইসলামকে (৫০) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

আজ শুক্রবার দুপুরে গ্রেপ্তারকৃত তিনজনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বাড়ি একই উপজেলার মাগুড়া ইউনিয়নের শাহপাড়া গ্রামে।  

পুলিশ, এলাকাবাসী ও পারিবারের সদ্যরা জানান, সোহেল রানা প্রায় দুই বছর আগে পক্ষাঘাত রোগে আক্রান্ত হয়। ডাক্তারি চিকিৎসার পর সে অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠলেও তার একটি পা বাঁকা থেকে যায়। ওই বাঁকা পায়ে ভর করে সে কোনোরকম চলাফেরা করতে পারত।

এ অবস্থায় সোহেল রানার মা খালেদা বেগম (৪৫) জানতে পারেন একই উপজেলার মাগুড়া সাহপাড়া গ্রামের মৃত জালাল উদ্দিনের ছেলে মোকাব্বর হোসেন কবিরাজি চিকিৎসায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত অনেক রোগীকে সুস্থ করে তুলেছেন। এ অবস্থায় খালেদা বেগম তার ছেলের পা ভালো করতে কবিরাজ মোকাব্বর হোসেনকে ডেকে পাঠান।

সে অনুযায়ী গত মঙ্গলবার সকালে মোকাব্বর হোসেন তার দুই সহযোগী একই গ্রামের আফতাব উদ্দিনের ছেলে আনোয়ার হোসেন ও মহির উদ্দিনের ছেলে শফিকুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে তার  সোহেল রানাদের বাড়িতে আসেন। বাড়িতে এসে শুরু করেন চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা।

নিহত সোহেল রানার বাবা কেরামত আলী (৫০) বলেন, ‘তারা নির্যাতন করে আমার ছেলেকে হত্যা করেছে। বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে তাদের সামনে আমার ছেলের মৃত্যু হলে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় ওই তিন ভণ্ড কবিরাজকে আটক করে পুলিশে খবর দেই। পরে পুলিশ এসে তিন জনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। এ ঘটনায় ওই তিনজনের নামে আজ সকালে আমি কিশোরগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছি। ’

সোহেল রানার মা খালেদা বেগম বলেন, ‘কবিরাজ মোকাব্বর হোসেন গত মঙ্গলবার আরো দুইজনকে সঙ্গে নিয়ে ছেলের চিকিৎসার জন্য আমাদের বাড়িতে আসেন। প্রথমে বিভিন্ন গাছের লতাপাতা গুড়া করে গরম পানিতে সিদ্ধ করেন। সেই পাতার রস গরম তেলে মিশিয়ে শরীরে মালিশ করতে থাকেন। '

তিনি আরো বলেন, 'তেল মালিশ শেষে ছেলের দুই পায়ে ইট বেঁধে সেই ইটের ওপর পা দিয়ে চাপ দিলে আমার ছেলের পা ভেঙে যায়। পা ভেঙে গেলেও সেই ভাঙা পায়ে গরম বালুর সেক দেওয়া শুরু করেন। এভাবে তিনদিন ধরে আমার ছেলের পায়ের চিকিৎসার নামে ছেলের ওপর চলে অমানুষিক নির্যাতন। '

তিনি বলেন, 'আমার ছেলে পানি খেতে চাইলেও দেয়নি তারা। এ অবস্থায় ছেলে কাতর হয়ে কান্নাকাটি করতে থাকলে চিকিৎসায় বাঁধা দিলেও তারা আমাদেরকে নানা ভয়ভীতি দেখায়। ’

এসময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘চিকিৎসার নামে টানা তিন দিনের অমানুষিক নির্যাতনে আমার কলিজার টুকরার মৃত্যু হয়েছে। ’

কিশোরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাজীব কুমার রায় ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘নিহত সোহেল রানার লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা কেরামত আলী বাদী হয়ে তিনজনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। গ্রেপ্তারকৃতদের শুক্রবার দুপুরে নীলফামারী আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। '



সাতদিনের সেরা