kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৯ নভেম্বর ২০২২ । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

আতঙ্ক ছাপিয়ে তুমব্রু সীমান্তে দুর্গোৎসবের রং

জাকারিয়া আলফাজ, তমব্রু থেকে ফিরে   

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ২০:০৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আতঙ্ক ছাপিয়ে তুমব্রু সীমান্তে দুর্গোৎসবের রং

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু সীমান্তে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জান্তাবিরোধী সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘর্ষ এখনো চলছে। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে তুমব্রুর বাইশফাঁড়ি সীমান্ত এলাকায় মর্টারের বিকট শব্দ শোনা গেছে। সীমান্ত এলাকার মানুষের আতঙ্ক পুরোপুরি কাটেনি এখনো। তবু গোলাগুলি ও মর্টারের বিকট শব্দের ভয়, আতঙ্ক ছাপিয়ে তুমব্রু দুর্গামন্দিরের পূজামণ্ডপে আগামীকাল থেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

পূজাকে ঘিরে তুমব্রু সীমান্তে বসবাসরত হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝে উৎসবের আমেজ শুরু হয়েছে।

তুমব্রু শ্রী শ্রী দুর্গামন্দির কমিটির সভাপতি রূপলা ধর কালের কণ্ঠকে বলেন, সপ্তাহখানেক আগে রাতে ও দিনে যখন মিয়ানমারের মর্টারের বিকট শব্দে পুরো তুমব্রু সীমান্ত আতঙ্কে ছিল, সে অবস্থায় উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা পালন নিয়ে আমরাও দ্বিধায় ছিলাম। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে এখন আগের মতো তুমব্রু সীমান্তে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে তেমন উত্তেজনা নেই। মাঝেমধ্যে দুয়েকটি গুলির আওয়াজ শোনা গেলেও তাতে আমরা তেমন আতঙ্কিত নই। তাই এবার তুমব্রু সীমান্তবর্তী দুর্গাপূজায় আমরা ব্যাপক উৎসাহে পালন করতে পারব বলে আশা করছি।

রূপলা ধর আরো বলেন, তুমব্রুতে পূজা পালনে সামাজিক সম্প্রীতি দেশের যেকোনো স্থানের চেয়ে মজবুত। দীর্ঘদিন ধরে আমরা পূজা পালন করে আসছি, তাতে অন্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে কোনো সময়ে সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট হয়নি। এমনকি আমাদের মন্দিরের পাশেই ৫০ গজের মধ্যে মসজিদ ও মাদরাসা রয়েছে। প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম পালন করে আসছি, একে অপরের প্রতি সম্মান শ্রদ্ধা রেখেই।

তুমব্রু ঘুরে জানা যায়, তুমব্রু বাজার সংলগ্ন মন্দির ঘিরে সেখানে ১৭টি হিন্দু পরিবারে দেড় শতাধিক হিন্দু ধর্মাবলম্বীর বসবাস। এখানে ১৯৫২ সালে স্বর্গীয় শ্রীযুক্ত বাবু নিরঞ্জন কুমার ধর প্রথম মন্দির প্রতিষ্ঠা করে পূজা পালন করেন, সেই থেকে এই মন্দিরে পূজা পালন করে আসছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। তুমব্রুর অধিকাংশ হিন্দু জানান, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা মুসলিম হলেও হিন্দুরা এখানে কোনো সময়ে পূজা পালন বা নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনে বাধাগ্রস্ত হননি।

তুমব্রুর হিন্দু নারী রাণী ধর বলেন, তুমব্রুতে জন্ম, এখানেই বেড়ে ওঠা। বয়স চল্লিশ পার হয়েছে। হিন্দু-মুসলিম একসাথে খেলে, পড়ালেখা করে বড় হয়েছি। আমরা এখানে একে অপরের ধর্মকে সম্মান করি। ধর্ম এবং উৎসব পালন নিয়ে কোনো মুসলিমের সঙ্গে কোনো সময় বাড়াবাড়ি হয়নি। এটিই তুমব্রুর সামাজিক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বড় দৃষ্টান্ত। এ ছাড়া গত কয়েক দিন ধরে সীমান্তে গোলাগুলি ও মর্টারের শব্দ একটু কমেছে, মাঝেমধ্যেই শোনা যায়। আশা করছি তাতে পূজা পালনে প্রভাব পড়বে না।

তুমব্রু বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ও মাদরাসার পরিচালক হাফেজ মাওলানা আজিম উদ্দীন জানান, মসজিদ ও মন্দির পাশাপাশি হলেও কারো ধর্ম পালনে অসুবিধা হয় না। তারা পূজা পালনের সময় বা অন্য যেকোনো ধর্মীয় উৎসবে আজান ও নামাজের সময় তাদের কার্যক্রম বন্ধ রাখে। আমরাও আমাদের বেলায় তেমনটি করে থাকি। কেউ কারো প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ করে না। এখান মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষগুলো হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রতি ভিন্ন দৃষ্টি পোষণ করে না। মানুষ হিসেবে আমরা এখানে সবাই শান্তিতে বাস করি।

ঘুমধুম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এ কে এম জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, শনিবার থেকে তুমব্রু মন্দিরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজা শুরু হচ্ছে। সীমান্ত পরিস্থিতি এখন অনেকটা স্বাভাবিক, মর্টারের শব্দও কম শোনা যাচ্ছে। তবে সীমান্ত পরিস্থিতি একেবারে শঙ্কামুক্ত না হলেও আপাতত হিন্দুদের পূজা পালনে তেমন সমস্যা হবে বলে মনে করছি না। এর পরও সীমান্তে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে গোলাগুলি, মর্টারের শব্দ সর্বোপরি সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। সীমান্তের পরিস্থিতি যখন খারাপ দেখা দেবে তখন সবার নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখন উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা পালন করতে তেমন সমস্যা নেই।

চেয়ারম্যান এ কে এম জাহাঙ্গীর আজিজ আরো বলেন, দুর্গাপূজা উদযাপনে স্থানীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কথা হয়েছে। তাদের সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে। তা ছাড়া এখানে স্থানীয়ভাবে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা নেই। তুমব্রুতে যুগ যুগ ধরে সামাজিক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রয়েছে।



সাতদিনের সেরা