kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

ক্যাম্পাসে অভিনব ডাকবাক্স, নামে-বেনামে চলবে চিঠি চালাচালি

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি   

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ২২:৫০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ক্যাম্পাসে অভিনব ডাকবাক্স, নামে-বেনামে চলবে চিঠি চালাচালি

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্ত কুবির চিঠি চত্বর। ছবি- কালের কণ্ঠ।

'ভালো আছি ভালো থেকো আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো'- রুদ্রের সেই আকাশের ঠিকানায় আর কত চিঠি লিখবেন! তথ্য প্রযুক্তির এই অত্যাধুনিক যুগে কেউ তেমন আর চিঠি লিখে না। তবুও ভালো লাগা থেকে, আবেগ কিংবা স্নিগ্ধ অনুভূতিগুলো চিঠি লিখে ওই আকাশের ঠিকানাতেই হয়তো পাঠায় অনেকে।

আকাশের ঠিকানা অনেক পুরনো হয়ে গেছে। এখন চিঠি পাঠানোর নতুন ঠিকানা হয়েছে, সেই ঠিকানা বৃত্ত কুবির 'চিঠি চত্বর।

বিজ্ঞাপন

' চিঠি চত্বরের ঠিকানায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কেউ চিঠি দিতে পারবে। সেই চিঠি পৌঁছেও দেওয়া হবে প্রাপকের নিকট।

কুবির 'চিঠি চত্বর। ' ছবি- কালের কণ্ঠ।

একটা সময় ছিল যখন যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যমই ছিল চিঠি। চিঠির মাধ্যমে মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করত। মুখে বলতে না পারা যত অব্যক্ত কথা চিঠিতে লিখে পাঠাত প্রিয়জনের কাছে। একটা চিঠির অপেক্ষা ডাকপিয়নের পথ চেয়ে বসে থাকত কতজন! সেই দিন ফুরিয়েছে দুই যুগ আগেই। তথ্য প্রযুক্তি, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই যুগে মানুষ এখন মূহুর্তেই যোগাযোগ করতে পারে যে কারো সাথে। আধুনিক বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ, প্রযুক্তি কেঁড়ে নিয়েছে আবেগ।

একবিংশ শতাব্দীর তরুণ-তরুণীদের মাঝে সোনালী দিনের চিঠি আদান-প্রদানের প্রক্রিয়া চালু করার চিন্তা থেকেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রাঙ্কন সংগঠন বৃত্ত কুবি তৈরি করে চিঠি চত্বর। বৃত্ত কুবির এমন ব্যতিক্রমী কাজের প্রশংসা করে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। এমন কাজে উৎসাহ দিতে চিঠি চত্বরে একটি ডাকবাক্স উপহার দেয় কুমিল্লা প্রধান ডাকঘর।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের সহকারী পোস্টমাস্টার জেনারেল ও কুমিল্লা প্রধান ডাকঘরের কাম পোস্টমাস্টার আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, 'কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠন বৃত্তকে চিঠি চত্বর করার জন্য সাধুবাদ জানাই। এই চত্বর তরুণ প্রজন্মের সাথে নতুন করে চিঠি-পত্র ও পোস্ট অফিসের সাথে মেলবন্ধন তৈরি করবে। উক্ত চত্বরের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম অনুভব করবে পত্র ব্যবহার নিয়ে, ভাব বিনিময়ের মাধ্যম হবে চিঠি। '

তিনি আরো বলেন, 'তরুণদের কাছে আহ্বান থাকবে চিঠি লিখার, আবেগ, অনুভূতি ব্যক্ত করার হাজারো বছরের পুরাতন মাধ্যমকে টিকিয়ে রাখার। পাশাপাশি কুমিল্লা প্রধান ডাকঘর এই চিঠি চত্বরকে আরো সমৃদ্ধ করার জন্য সবসময় পাশে থাকবে। '

চিঠি চত্বরের ডাকবাক্সে দেওয়া যাবে তিন ধরনের চিঠি। নাম ঠিকানাসহ চিঠি, বেনামি চিঠি ও খোলা চিঠি।

চিঠিগুলোর মধ্যে নামসহ চিঠির গুরুত্ব সর্বাধিক। এই ধরনের চিঠির খামে প্রেরক এবং প্রাপক দুইয়ের নাম ঠিকানা উল্লেখ থাকবে। চিঠিতে প্রাপকের নাম, ঠিকানা (বিভাগ, ব্যাচ, হল) উল্লেখ থাকতে হবে। সেই নামসহ চিঠি সর্বোচ্চ গোপনীয়তায় (ক্ষেত্রে বিশেষ) পৌঁছে দেওয়া হবে প্রাপকের কাছে।

বেনামি চিঠির খামে শুধু প্রাপকের নাম-ঠিকানা উল্লেখ থাকবে। বেনামি চিঠির ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে কিছু চিঠি চেক করে দেওয়া হবে। যাতে উদ্ভব, হুমকিসরূপ কিংবা অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ কোনো চিঠি না দেওয়া হয়।

খোলা চিঠির ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম নেই। যার যেভাবে খুশি লিখতে পারবে। এই ধরনের চিঠিগুলো দিয়ে যথাসম্ভব দুমাস অন্তর অন্তত চিঠি প্রদর্শনী করা হবে। একই সাথে চিঠি চত্বরের ফেইসবুক পেইজে পোস্ট করা হবে।

চিঠির খামের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে যে কোনো ধরনের খাম। তবে সেই খামে চিঠি চত্বরের সিল সম্বলিত মোড়কে করে প্রাপকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

চিঠি চত্বর নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা খুবই উচ্ছ্বসিত। উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী সোনিয়া আক্তার বলেন, 'চিঠি চত্বর -এই কথাটাতেই কেমন যেন একটা রোমান্টিক ভাব আছে। মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য আজকাল মাধ্যমের কমতি নাই কিন্তু চিঠির মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশের যে অনুভূতি তা অন্যরকম এক অনুভূতি। '

তিনি আরো বলেন, 'বৃত্তি কুবির সবগুলো কাজের মধ্যে এটা সবচেয়ে ক্রিয়েটিভ এবং ইন্টারেস্টিং কাজ এটা। চিঠি চত্বরে চিঠি আসবে নিজের নামে এটা নিয়ে অনেকেই খুব এক্সাইটেড। না বলা কথাগুলো চিঠি চত্বরের চিঠির খামে জমা পড়ুক। '

অপর এক শিক্ষার্থী গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তারিকুল ইসলাম নিলয় বলেন, 'চিঠি চত্বর বৃত্ত কুবির খুবই প্রশংসনীয় একটা কাজ। একটা পরিত্যক্ত জায়গাকে কিভাবে সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলা যায় সেটাই করে দেখিয়েছে বৃত্ত কুবি চিঠি চত্বর প্রতিষ্ঠা করে। '

তিনি বলেন, 'চিঠি আদান-প্রদানের ব্যাপারটা এখন বিলুপ্ত প্রায়। এখানে যেহেতু কারো নামে চিঠিও দেওয়া যাবে, তাই কুবির স্টুডেন্টরা চাইলেও যে কাউকে চিঠি দিতে পারবে। এটা অনেকটা কাউকে সারপ্রাইজ দেওয়ার মত হবে। কুবির শিক্ষার্থীদের মধ্যে আবার চিঠি আদান প্রদান শুরু হবে। তাছাড়া খোলা চিঠি দিয়ে ক্যাম্পাসের প্রতি আবেগ ভালোবাসার কথাও জানানো যাবে। সবমিলিয়ে ব্যাপারটা আমার কাছে অনেক আকর্ষণীয় লেগেছে। '

বৃত্ত কুবির উপদেষ্টা এবং প্রত্নতত্ত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ড মুহাম্মদ সোহরাব উদ্দীন বলেন, 'রাফি, রাব্বি আমাকে যখন বলল স্যার আমরা তো এখন চিঠি লিখি না, একটা চিঠি চত্বর করলে কেমন হয়? সেখানে স্টুডেন্টরা চিঠি দিবে। যাদের নামে চিঠি আসবে সেগুলো আমরা আশেপাশে পৌঁছে দিব। আমার কাছে এতো চমৎকার লেগেছে তাদের আইডিয়াটা, সাথে সাথে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেই। '

তিনি আরো বলেন, 'এই উদ্যোগটা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মনে হলো, এই প্রজন্মের অনেকেই পোস্টবক্স দেখেনি, কিভাবে চিঠি ফেলত, চিঠির বক্স খুলতো, এসব জানে না।  যদি একটা পোস্টবক্সের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে ব্যাপারটা আরো আবেদনময়ী হয়। ছোটবেলায় আমরা হোস্টেলে ছিলাম মা-বাবার কাছ থেকে চিঠি পেতাম। এটা একটা আনন্দ আছে। সেই জায়গা থেকেই এই চত্বরটা করা যেখানে মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করবে। '

চিঠি চত্বর প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তাদের মধ্যে একজন এবং বৃত্ত কুবির সিনিয়র সদস্য মাহফুজ রাব্বি বলেন, 'চিঠি আদান-প্রদানের যে প্রচলন সেটা নিজের চোখে হারাতে দেখেছি। সেই জায়গায় থেকে মনে হলো আমরা যদি চিঠি আদান-প্রদানের মাধ্যম করতে পারি তাহলে কেউ প্রয়োজনীয় চিঠি না লিখলেও নিজের ভালো লাগা থেকে একটা চিঠি লিখতে পারবে। সেই ভাবনা থেকেই চিঠি চত্বর তৈরি করা। '

আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে বৃত্ত কুবির চিঠি চত্বর। একই সাথে সাংগঠনিকভাবে যাত্রা শুরু করবে বৃত্ত কুবি।



সাতদিনের সেরা