kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০২২ । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

রপ্তানিতে তৈরি পোশাক নির্ভরতা কমার ইঙ্গিত

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম    

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০৩:২১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রপ্তানিতে তৈরি পোশাক নির্ভরতা কমার ইঙ্গিত

রপ্তানিতে একক পণ্য নির্ভরতা কমার ইঙ্গিত দিচ্ছে দেশের আটটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (ইপিজেড) গত অর্থবছরের রপ্তানিচিত্র। সেখানে তৈরি পোশাকের একচেটিয়া আধিপত্য কমছে। বাড়ছে অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি।

বেপজার অধীন আট ইপিজেড থেকে গত অর্থবছরে তৈরি পোশাকের বাইরে বৈচিত্র্যপূর্ণ অন্যান্য পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকার।

বিজ্ঞাপন

এই আট ইপিজেডের মোট রপ্তানি ছিল ৮৫ হাজার কোটি টাকার। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সমিতি বিজিএমইএ সূত্র জানায়, তিন বছর আগেও দেশের মোট জাতীয় রপ্তানির প্রায় ৮৪ শতাংশ আসত তৈরি পোশাক খাত থেকে। গেল অর্থবছরে তৈরি পোশাক পণ্যের রপ্তানিতে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার বা ৩৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও জাতীয় রপ্তানিতে এর অংশীদারি কমে ৮১ শতাংশে নেমেছে। নন-আরএমজি পণ্যের রপ্তানি নীরবে বাড়ছে।

ইপিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে মোট পাঁচ হাজার ২০৮ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় চার হাজার ২৬১ কোটি ডলার, যা মোট জাতীয় রপ্তানির ৮১.৮২ শতাংশ।

বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জাতীয় রপ্তানিতে তৈরি পোশাকের অংশীদারি ছিল ৮৪.২১ শতাংশ। তিন বছরের ব্যবধানে তৈরি পোশাক পণ্য রপ্তানি প্রায় সাড়ে আট বিলিয়ন ডলার বাড়লেও জাতীয় রপ্তানিতে অংশীদারি কমেছে প্রায় আড়াই শতাংশ।

বেপজার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে আটটি ইপিজেডের চালু থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মোট রপ্তানি ছিল ৮৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। আগের বছরের তুলনায় যা ৩০.৪১ শতাংশ বেশি। ইপিজেডগুলোর মোট রপ্তানির মধ্যে পোশাক খাত থেকে আয় হয়েছে ৪৭৩.৩৪ কোটি ডলার বা ৫৪.৬৮ শতাংশ।

এই আটটি ইপিজেডের ৪৫৬টি চালু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৪৯টি তৈরি পোশাকের, অন্যগুলো ভিন্নধর্মী নানা পণ্যের। এর মধ্যে গার্মেন্ট অ্যাকসেসরিজ থেকে রপ্তানি আয় এসেছে ৯৬ কোটি ২০ লাখ ডলার। ৬৬ কোটি ৬৮ লাখ ডলার নিয়ে পরের স্থানে আছে টেক্সটাইল পণ্য। জুতা ও চামড়াজাত পণ্য এবং তাঁবু রপ্তানির আয় যথাক্রমে ৫৭ কোটি ও ৫৪ কোটি ৭২ লাখ ডলার। ধাতব পণ্য, ইলেকট্রনিক, গলফ শ্যাফট, প্লাস্টিক পণ্য, খেলনা, ক্যাপ, অটোমোবাইল, পরচুলা, আসবাব, লাগেজসহ অন্যান্য পণ্য থেকে বাকি রপ্তানি আয় হয়েছে।

ইপিজেডের বৈচিত্র্যপূর্ণ পণ্য উৎপাদনকারীদের অন্যতম জাপানি প্রতিষ্ঠান মামিয়া-ওপি (বাংলাদেশ) লিমিটেড। ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত কারখানাটি থেকে বর্তমানে বিশ্বমানের গলফ শ্যাফট রপ্তানি হচ্ছে। এই গলফ ফ্যাক্টরির উৎপাদিত একটি ব্র্যান্ড দিয়ে খেলেন বিশ্বখ্যাত গলফার টাইগার উডস। এ ছাড়া গত টোকিও অলিম্পিকে বিশ্বখ্যাত আর্চাররা যে তীর ব্যবহার করেন, সেগুলো চট্টগ্রাম ইপিজেডের এই কারখানায় উৎপাদিত।

গতকাল শনিবার দুপুরে নয়াদিল্লিতে অবস্থানরত মামিয়া-ওপির পরামর্শক চন্দন পুরোহিতের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয় কালের কণ্ঠের। তিনি জানান, মামিয়া-ওপি থেকে গত অর্থবছরে ২২৭ কোটি টাকার পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়েছে। করোনার আগে ২০১৯ সালে তাঁদের কারখানায় মাসে এক লাখ ৭০ হাজার গলফ শ্যাফট উৎপন্ন হতো। করোনার সময় চাহিদা বৃদ্ধির কারণে উৎপাদনক্ষমতা আড়াই লাখ পিসে উন্নীত করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে গলফ শ্যাফট উৎপাদনে বিশ্বব্যাপী মামিয়ার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদনক্ষমতা আরো ৩০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে মাসে সোয়া তিন লাখ গলফ শ্যাফট উৎপন্ন হবে সিইপিজেডের এই কারখানায়।

চন্দন পুরোহিত জানান, ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে থাইল্যান্ডে মামিয়া গ্রুপের গলফ গ্লাভসের কারখানার বিনিয়োগ চট্টগ্রামের কারখানায় সরিয়ে আনা হচ্ছে।

বৈচিত্র্যপূর্ণ পণ্যের আরেকটি কারখানা কোরিয়ান মালিকানাধীন এইচকেডি ইন্টারন্যাশনাল। বিশ্বের বৃহৎ এই ক্যাম্পিং তাঁবু উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে গত অর্থবছরে সাড়ে ২৪ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু তাঁবু পণ্য রপ্তানি হয়েছে ১৫ কোটি ৮০ লাখ ডলারের, যা আগের অর্থবছরের প্রায় দ্বিগুণ বলে জানিয়েছেন এইচকেডির উপমহাব্যবস্থাপক শাখাওয়াত হোসেন।

চাহিদার বিষয়টি মাথায় রেখে মিরসরাইয়ের বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে নতুন করে সম্প্রসারণের জন্য ১৫টি প্লট চেয়েছে এইচকেডি ইন্টারন্যাশনাল। পাঁচ কোটি ৬০ লাখ ডলার বিনিয়োগে এইচকেডি আউটডোর ইনোভেশন লিমিটেড নামের যে নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা করা হচ্ছে, এতে আরো সাড়ে পাঁচ হাজার বাংলাদেশির কর্মসংস্থান হবে বলে তিনি জানান।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও পণ্যের বৈচিত্র্যায়ণ প্রসঙ্গে বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল আবুল কালাম মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান বলেন, ‘পণ্যের বৈচিত্র্যায়ণের জন্য প্রধানমন্ত্রীরও নির্দেশনা আছে। সেই নির্দেশনার আলোকে পণ্য বৈচিত্র্যায়ণের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের এবং প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য উৎপাদনে জোর দিচ্ছি। আমাদের ইপিজেডে এখন অটোমোবাইল পার্টস, ইলেকট্রনিক পণ্য, মোবাইল অ্যাকসেসরিজ, ক্যামেরা লেন্স, মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট এমনকি খেলার সামগ্রী যেমন : গলফ, আর্চারির সামগ্রীও তৈরি হচ্ছে। ’

বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা মিরসরাইয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে আমাদের যে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল আছে এবং গাইবান্ধা, যশোর ও পটুয়াখালীতে আমাদের যে নতুন তিনটি ইপিজেড হতে যাচ্ছে, সেখানে ওই ধরনের বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করব, যারা প্রযুক্তিনির্ভর ও উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি করবে। তাতে আমাদের রপ্তানি দ্রুত বাড়বে। রপ্তানিতে একক পণ্য নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে এর বিকল্প নেই। ’



সাতদিনের সেরা