kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১২ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৩০ সফর ১৪৪৪

বন্যা-পরবর্তী সুনামগঞ্জ

বন্যার পলি মাটি বদলে দিয়েছে ভূ-প্রকৃতি

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ    

২০ আগস্ট, ২০২২ ১১:৩৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বন্যার পলি মাটি বদলে দিয়েছে ভূ-প্রকৃতি

বন্যার পর জেগে ওঠা পলিমিশ্রিত কৃষিজমি। সুনামগঞ্জের খরচার হাওরের সালামপুর থেকে গত বৃহস্পতিবার তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

এবারের ভয়াবহ বন্যার সঙ্গে আসা অস্বাভাবিক পলি বদলে দিয়েছে সুনামগঞ্জের ভূ-প্রকৃতি। হাওরের বোরো জমি রূপ নিয়েছে আমনে। ভরাট হয়ে গেছে নদী-নালা, পুকুর-খাল। এতে মাটির ভৌত-রাসায়নিক গঠন ও বুনট নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এর প্রভাব কৃষি ছাপিয়ে জীববৈচিত্র্যের ওপরও পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তা ছাড়া নদী ও খালে নতুন করে বেশি পলি পড়ায় নাব্যসংকট তৈরি হবে। এতে আগামী দিনে বাড়বে বন্যার ঝুঁকি। অস্বাভাবিক এই পলির চিত্র দৃশ্যমান হলেও কী পরিমাণ পলি পড়েছে, তার তথ্য নেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ নিয়ে গবেষণার দাবি জানিয়েছেন।

সরেজমিনে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়ন ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদ ইউনিয়নের একাধিক গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, খরচার হাওরের বোরো জমিতে অস্বাভাবিক পলি পড়েছে। দেখলে মনে হবে ড্রেজার মেশিন লাগিয়ে সম্প্রতি জমি ভরাট করা হয়েছে। হাওরজুড়ে পলির বিস্তার।

বিভিন্ন এলাকার কৃষক ও সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, গত ১৭ জুন থেকে সুনামগঞ্জে সর্বকালের ভয়াবহ বন্যা শুরু হয়। এই বন্যায় সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার, তাহিরপুর, ছাতক ও শান্তিগঞ্জ উপজেলার শতভাগ এলাকা প্লাবিত হয়। জেলার বাকি পাঁচ উপজেলার ৯০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। ডুবে যায় জেলার সব রাস্তাঘাট। জেলা শহরের প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যায়। টানা এক সপ্তাহ ছিল পানির বিস্তার। বন্যায় ভৌত অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি কৃষিজমিরও ক্ষতি হয়েছে।

জমিতে পলির আস্তরণ। সঙ্গে রয়েছে পাথরের টুকরা ও বালু।      ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রায় এক মাস পর ধীরে ধীরে বন্যার পানি নামতে শুরু করে। বন্যার পানি নামার পরপরই দেখা যায় সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর, ছাতক, দোয়ারাবাজার ও তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকার নদী-খালসংলগ্ন ভূমি, নিচু জমি, পুকুর, নালায় কয়েক স্তরে পলি পড়েছে। কোনো কোনো স্থানে দুই থেকে দেড় ফুট পলি পড়েছে। পানি যত কমতে থাকে পলির স্তরও তত দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এই পলি সরিয়ে জমিকে আগের অবস্থায় নিয়ে আসতে কৃষকদের অতিরিক্ত শ্রম ও অর্থ ব্যয় করতে হবে বলে জানান কৃষকরা। তবে ছোট ছোট পুকুর, নালাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয় বলে জানান তাঁরা।

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সালামপুর গ্রামের কৃষক রজব আলী (৭০) বলেন, ‘পাহাইড়া মাটি আইয়া আমাদের জায়গাজমিন উলটপালট অই গেছে। আগের মতোন আর জমিন নাই। বইন্যায় পুকুর, জায়গাজমিন, খাল-বিল ভইরা গেছে গা। অনে কৃষিকাজ করতে সমস্যা অইবো। ’

একই উপজেলার ভাদেরটেক গ্রামের সত্তরোর্ধ কৃষক রূপ মিয়া বলেন, ‘বইন্যায় পলি আইয়া হাওরের জমি ভরাই হইয়া গেছে। পুকুর ও খাল ভরাট হইয়া গেছে। পানি নামার সুযোগ নাই। আগের মতো হাওরের ফসল এখন আর করতে পারতাম না। ’

সালামপুর গ্রামের কৃষক জাকির হোসেন খরচার হাওরের তাঁর ফসলি ক্ষেত দেখিয়ে বলেন, ‘এই জমিন ছিল বোরো জমিন। এখন পলি পইরা আমন জমিন অইগেছে। দেড় ফুট পলি পড়েছে। আগের মতো হাওরের জমি হিসেবে এই জমিতে চাষ করতাম পারতাম না। ’

হাওরের জীববৈচিত্র্যের গবেষক কল্লোল তালুকদার বলেন, ‘গত দেড় শ বছরের দুর্যোগ নিয়ে আমি পাড়াশোনা করে দেখেছি, এই অঞ্চলে এমন ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ আগে হয়নি। এবারের বন্যা অস্বাভাবিক পলি নিয়ে এসেছে। এতে মাটির ভৌত ও রাসায়নিক গঠনে পরিবর্তন এসেছে। মাটির বুনট নষ্ট করে দিয়েছে। জমির পুষ্টি উপাদান নষ্ট হচ্ছে। সীমান্ত এলাকার জমিতে মাটির বদলে বালুর পরিমাণ বেড়ে গেছে। এটা শুধু কৃষির জন্যই ক্ষতিকর নয়; অস্বাভাবিক এই পলি জলজ ও স্থলজ জীববৈচিত্র্যের ওপরও প্রভাব ফেলবে। এটা নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে গবেষণা করে ব্যবস্থা নিতে হবে। ’

সুনামগঞ্জের হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্যসচিব অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, ‘ভারতের মেঘালয় থেকে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে প্রতিবছরই বালু ও মাটি এসে আমাদের পানির আধার ভরাট করছে। আমাদের নদী-নালা, খাল-বিল দিন দিন ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে, ৫০ বছর পর হাওর নামের জলাধারের অস্তিত্ব থাকবে না। ’

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, ‘উজানে ব্যাপক ভাঙনের কারণে আমাদের এখানে পলি আসে। মাটিতে লেয়ার তৈরি করে। এই মাটিতে নানা পদার্থ থাকে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জন্য এই পলি ঠিক আছে; কিন্তু এখানে পাহাড়ি এলাকার কারণে পলির সঙ্গে বালু আসে। এতে জমির উর্বরতা নষ্ট হয়ে যায়। ’

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বলেন, ‘এবারের বন্যায় অনেক পলি মাটি জমা হয়েছে। যে জমিতে বেশি পলি পড়েছে, তা থেকে ওপরের মাটি সরিয়ে নিয়ে বাড়িঘর উঁচু করা যাবে। এতে আগামী দিনে বন্যা মোকাবেলা করা কিছুটা সহজ হবে। ’



সাতদিনের সেরা