kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ অক্টোবর ২০২২ । ১৯ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

শ্রমিকের জীবনের মূল্য এক লাখ ২৪ হাজার টাকা!

সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি   

১৯ আগস্ট, ২০২২ ১৪:৫০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শ্রমিকের জীবনের মূল্য এক লাখ ২৪ হাজার টাকা!

চেক তুলে দেওয়া হচ্ছে ফাহিমের বাবার হাতে

নির্মাণশ্রমিক ফাহিম হোসেনের বাবা তার একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলের জীবনের মূল্য মাত্র এক লাখ চব্বিশ হাজার টাকা! তারা জোর করে আমার কাছ থেকে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে কাউকে কিছু না বলে এই টাকা দিয়ে আমাকে গ্রামের বাড়িতে চলে যেতে বলেন। আমি এখন কী করব? কোথায় যাব? কোথায় গেলে ছেলের মৃত্যুর বিচার পাব? কিছুই ভেবে পাচ্ছি না। এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের আইয়ুব নগর এলাকার নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করতে গিয়ে সাততলা থেকে পড়ে নিহত ফাহিমের বাবা মহিন হোসেন।

বিজ্ঞাপন

এলাকাবাসী জানান, গত ১০ আগস্ট বুধবার আইয়ুব নগর এলাকায় নির্মাণাধীন দশতলা বিশিষ্ট পার্ক টাওয়ারের সপ্তম তলায় কাজ করার সময় লিফটের অংশ দিয়ে পড়ে ফাহিম হোসেন (১৪) নামের এক কিশোর নির্মাণশ্রমিক। সেই নির্মাণাধীন পার্ক টাওয়ারের মালিক সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম, মিজানুর রহমান, সিরাজুল ইসলাম, রাশেদুল ইসলামসহ ১৮ জন। কাজের সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা না মেনেই ভবণ নির্মাণের কাজ করছিলেন তারা। কর্মরত অবস্থায় নির্মাণশ্রমিক ফাহিম হোসেন পা ফসকে নিচে পড়ে গিয়ে মারা যান। এ ঘটনায় স্থানীয় থানায় কোনো মামলা করতে দেয়নি মালিকপক্ষ। এ ভবনের নির্মাণের কাজ পান ইকবাল হোসেন নামে এক রাজমিস্ত্রি। তিনি মিজমিজি এলাকার বাসিন্দা।   

নিহত ফাহিম হোসেনের বাবা মহিন হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, আমি দোকান চালিয়ে কোনরকমে সংসার চালাই। আমার তিন মেয়ে ও একমাত্র ছেলে ফাহিম হোসেন। সংসারে অভাবের তাড়নায় আমার ছেলে রাজমিস্ত্রির সহযোগী হিসেবে কাজ নেয়। মোবাইল ফোনে আমাকে আমার ছেলের মৃত্যুর খবর জানালে আমি নির্বাক হয়ে পড়ি। ভবনের মালিক আমিনুল ইসলামসহ কয়েকজন আমাকে থানায় মামলা না করতে চাপ দেন। আমি অশিক্ষিত মানুষ। আমাকে এক প্রকার ভয় দেখিয়ে ভবনের মালিক আমিনুল ইসলাম, রফিক মিয়াসহ কয়েকজন একলাখ বিশ হাজার টাকার একটি চেক ও নগদ চার হাজার টাকা গাড়ি ভাড়া ও কয়েক সেট কাপড় দিয়ে বিদায় করে দেন। আমি তাদের এ রায়ে সন্তুষ্ট নই। আমার ছেলে 

পার্ক ভবনের পাশের ভবনের ফ্ল্যাটের মালিক সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্রের অফিস সহকারী আলী আকবর কালের কণ্ঠকে জানান, নির্মাণশ্রমিক ফাহিম হোসেনের মৃত্যুতে অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে আমরা খুবই মর্মাহত হয়েছি। তবে তার পরিবার খুবই গরীব হওয়ায় তার পরিবারকে ভালো অংকের একটি অনুদান দিলে পরিবারটি উপকৃত হতো। মাত্র এক লাখ চব্বিশ হাজার টাকা কীভাবে নিহতের পরিবারে হাতে তুলে দেওয়া হলো বিষয়টি আমাকে ভাবিয়ে তুলছে।

পার্শ্ববর্তী ভবনের ফ্ল্যানের মালিক ও হরিপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের অপারেটর রুহুল আমিন কালের কণ্ঠকে জানান, একটি ভবন করতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও একটি মানুষের জীবনের মূল্য তাদের কাছে তুচ্ছ মনে হয়েছে। এটা অত্যান্ত দুঃখজনক। বিষয়টি কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

নাসির উদ্দিন নামে ওই এলাকার বাসিন্দা কালের কণ্ঠকে জানান, ভবনের মালিকরা নিহত পরিবারের প্রতি সুবিচার করেননি।

আইয়ুব নগর এলাকার বাসিন্দা মনা মিয়া কালের কণ্ঠকে জানান, সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎ অফিসের প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম এই এলাকায় ইতিমধ্যে সাত-সাতটি ফ্ল্যাটের মালিক বনে গেছেন। যার মূল্য কয়েক কোটি টাকা। একজন সরকারি কর্মকতা কীভাবে এত অল্প সময়ে এত টাকার মালিক বনে গেছেন এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন তার সম্পদের হিসেব দেখলেই আসল রহস্য বেরিয়ে আসবে।

পার্ক ভবনের নির্মাণকাজের ঠিকাদার ইকবাল হোসেন কালের জানান, অসাবধানতাবশত ছেলেটি কাজ করার সময় পা ফসকে গিয়ে নিচে পড়ে গিয়ে মারা যায়। নিহত পরিবারকে এ পর্যন্ত যতটুকু সম্ভব আমি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভবনের মালিক আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে জানান, আমরা নির্মাণকাজ করার জন্য ঠিকাদার ইকবাল হোসেনের সাথে চুক্তিবদ্ধ হই। কোনো শ্রমিক মারা গেলে এর দায়দায়িত্ব তার ওপরই পড়বে। নিহত পরিবারকে এক লাখ চব্বিশ হাজার টাকা দিয়ে কীভাবে দফারফা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিলেন এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। সরকারি কর্মকর্তা হয়ে অল্পসময়ে কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়ার বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন আমি জমি কিনে ভবন নির্মাণ করার কাজ করে টাকা অর্জন করেছি।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ৫ নম্বর ওয়ার্ড কমিউনিটি পুলিশের সভাপতি আলহাজ্ব কবির হোসেন বলেন, ছেলেটির পরিবার অসহায় ও গরীব। একজন নির্মাণশ্রমিকের জীবনের মূল্য হিসেবে ভবন মালিকপক্ষ একলাখ চব্বিশ হাজার টাকা দিয়েছে বিষয়টি শুনে মর্মাহত হলাম। ভবন মালিকদের এমন আচরণে আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। আশা করছি নিহত নির্মাণশ্রমিকের পরিবার ন্যায়বিচার পাবেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়নগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম কালের কণ্ঠকে জানান, এ বিষয়ে নিহতের পরিবার মামলা করতে চাইলে অবশ্যই আমরা আইনগত সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব।



সাতদিনের সেরা