kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ অক্টোবর ২০২২ । ১৯ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

সুন্দরবনের কুখ্যাত ‘আনারুল বাহিনী’

ছিলেন ভয়ঙ্কর বনদস্যু, ফিরেছেন আলোর পথে

কয়রা (খুলনা) প্রতিবেদক   

১৯ আগস্ট, ২০২২ ১১:৪২ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ছিলেন ভয়ঙ্কর বনদস্যু, ফিরেছেন আলোর পথে

সাবেক বনদস্যু আনারুল ও মোস্তফা

পৃথিবীর বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে একসময় রাজত্ব ছিল ‘আনারুল বাহিনী’ নামে অস্ত্রধারী একটি দস্যুদলের। সেই দলের দস্যু সর্দার আনারুল ও তাঁর একান্ত সহযোগী মোঃ মোস্তফা একসময় বনজীবীদের নিকট রয়েল বেঙ্গল টাইগারের চেয়েও বড় আতঙ্কের নাম ছিল। তাদের নামে কাঁপত গোটা সুন্দরবন।  

তবে ২০১৮ সালের পহেলা নভেম্বর সেই দস্যু বাহিনীর সর্দার আনারুল ইসলাম ও তার সহযোগীসহ দলের ১১ জন সদস্য অস্ত্র ছেড়ে আত্মসমর্পণ করে শান্তির পথে ফিরে এসেছেন।

বিজ্ঞাপন

স্বাভাবিক জীবনে ফিরে সরকারের দেয়া এক লাখ টাকা আর র‌্যাবের দেয়া ২০ হাজার টাকা দিয়ে বাহিনী প্রধান আনারুল ও তাঁর সহযোগী মোস্তফা মিলে কয়রার মহারাজপুর ইউনিয়নে শুরু করেছেন মাছ ও কাঁকড়ার খামার। গরমের সময় মাছে লাভ হয় বেশি তাই এখন করছেন মাছ চাষ। আর শীতের সময় মাছে লাভ হয় কম, তাই সেই সময় করেন কাঁকড়ার ব্যবসা। পাঁচ বিঘা জমির ছোট্ট মৎস্য খামারটির আয় দিয়ে কোনো রকমে চলছে তাদের সংসার। তারপরও মনে কোনো আফসোস নেই। কারণ, একাধিকবার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছে তারা।  

দস্যুতা ছেড়ে আলোর পথে ফেরা আনারুল ইসলাম ও মোঃ মোস্তফা দুজনই খুলনার সর্বদক্ষিণের জনপদ কয়রা উপজেলার বাসিন্দা। কয়রা উপজেলা সদর থেকে পাঁচ কিলোমিটার পূর্ব দিকে শাকবাড়িয়া নদী তীরবর্তী মহারাজপুর ইউনিয়নের মঠবাড়িয়া গ্রামে বাড়ি তাদের। নিজেদের দুজনের দস্যু হয়ে ওঠা আর আত্মসমর্পণ করে আলোর পথে ফিরে আসার গল্প বলেন কালের কন্ঠের প্রতিবেদকের কাছে।

সাবেক দস্যু নেতা আনারুল ইসলামের পাঁচ সদস্যের সংসারে আছে তিন ছেলে। বড় ছেলে ইটের ভাটায় শ্রমিক। বাকি দুজন ছোট। স্কুলে যায় তারা। অপরদিকে তাঁর সহযোগী মোস্তফা এখন বাবা-মার সাথে আট সদস্যের পরিবার নিয়ে বেশ ভালো আছেন। মঠবাড়িয়া গ্রামে তাদের মৎস্য খামার। বছরের প্রথম দিকে পাঁচ বিঘা জমি লীজ চুক্তিতে নিয়েছে তারা।  

দুই সাবেক বনদস্যুর মাছের খামারে পৌছানোর পর গল্পে গল্পে প্রথমে সাবেক দস্যুনেতা আমিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে জানায়, ২০০১ সালের দিকে প্রতিপক্ষের দেয়া মিথ্যা মামলায় হয়রানি হতে হয় তাকে। মামলা থেকে রেহাই না পেয়ে সুন্দরবনে দস্যুতায় নেমে পড়েন তিনি। মোজাম বাহিনী তখন সুন্দরবনের সবচেয়ে প্রভাবশালী দস্যুবাহিনী। তাঁর বাহিনীর ৫০ জনের একজন সদস্য ছিল আনারুল। দস্যু সরদার মোজাম পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পরে দল ভেঙ্গে যায়। এরপর তিনি ছোটা জাকির বাহিনীর সঙ্গে চলে আসে সুন্দরবনের আরেক এলাকায়। ততদিনে দস্যু হিসেবে আনারুলের নাম ছড়িয়ে গেছে এলাকায়। বাড়ি ফেরার উপায় ছিল না আর। এরপর একে একে নোয়াব বাহিনী, মান্নান বাহিনীসহ বহু দস্যুবাহিনীর সদস্য হয়ে কাজ করেছেন তিনি। সর্বশেষে বিভিন্ন বাহিনী থেকে দলছুট ১৯ জন সদস্যকে নিয়ে নিজের নামেই গড়ে তুলেছিলেন আনারুল বাহিনী। তার বাহিনীতে ছিলো ১১ টি বিদেশী বন্দুক আর ৮টি দেশী অস্ত্র।

গল্পের ছলে আনারুল বাহিনীর আরেক সদস্য মোস্তফাও জানালেন তাঁর দস্যু হওয়া আর জীবনের পথে ফিরে আসার গল্পটা। একসময় কয়রার নামকরা মাছ ব্যবসায়ী মহাজন ছিলেন তিনি। তাঁর অধীনেই নৌকা নিয়ে সুন্দরবনে মাছ শিকার করতেন প্রায় অর্ধশত জেলে। ব্যবসার এক পর্যায়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন স্থানীয় আরেক মহাজনের সাথে। প্রতিপক্ষ ব্যবসায়ী মহাজন তৎকালীন সুন্দরবনের ত্রাস জিয়া বাহিনীর মাধ্যমে মোস্তফার ১৫ টি জেলে নৌকা থেকে ৩০ জন জেলেকে অপহরণ করে জেলেদের প্রচন্ড নির্যাতন ও বড় অংকের মুক্তিপণের দাবি করে। প্রতিপক্ষের টার্গেট ছিল জেলেদের নির্যাতন করলে ওই জেলেরা আর মোস্তফার নৌকায় কাজ করবেনা। ষড়যন্ত্রে সফলও হয় প্রতিপক্ষ মহাজন। আর জেলেদের মুক্ত করতে ৬ লাখ টাকা ঋণী হয়ে যায় মোস্তফা। ২০১৬ সালের শেষ দিকের ঘটনা এটি। জেলে না পেয়ে ব্যবসায় ধস নামে।  ওদিকে ঋণের বোঝা নিয়ে পাওনাদারদের থেকে আত্মগোপনে থাকতে থাকতে হাপিয়ে ওঠেন তিনি। পাওনাদারদের হাত থেকে নিস্তার পেতে ফিরতে পারেননি নিজ ঘরে। সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী আনারুল তখন সুন্দরবনের দস্যুনেতা। মোস্তফা পা বাড়ান সুন্দরবনে, যোগ দেন দস্যু আনারুল বাহিনীতে। এভাবেই জলদস্যু হয়ে উঠেন তিনি।  

তবে বনদস্যু আনারুল ও মোস্তফা জীবনের অর্থ খুজে পান সুন্দরবনের গহীনে থেকে। তারা জানায়, দস্যুতা করে টাকার দেখা মিললেও অসৎ পথে আয়ে সংসারে শান্তি আসতো না। বরং অশান্তি যেন চিরসঙ্গী হয়ে গেলো। তার উপর র‌্যাব-পুলিশের অভিযানের ভয়ে কতো রাত যে নির্ঘূম কেটেছে তা গুনে বলা যাবে না। মা, ছোট ভাই-বোন এবং স্ত্রী, কারো কাছে মুখ দেখাতে পারত না। কেউ মিশত না তাদের সাথে। জন্ম নেয়া শিশু সন্তানের ভবিষ্যৎও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাড়াত। অপরাধের জগত ছেড়ে ভালো হয়ে যাবার ইচ্ছা থাকলেও সেই সুযোগ পাচ্ছিলেন না তারা। অবশেষে সুযোগ আসে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার। সুযোগটা আর হাত ছাড়া করেননি দুজন। পূর্ব নির্ধারিত সময়ে ১১ জন সদস্য আর ১৯ টি অস্ত্রসহ আমিরুল ও মোস্তফা র‌্যাবের হেফাজতে যায়। র‌্যাবের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণের পর জেলখানা হয়ে জামিন নিয়ে এলাকায় ফিরে আসে তারা। গ্রামের আত্মীয় স্বজন আর প্রতিবেশীরা তাদের স্বাগত জানায়।  

তবে সাবেক দুই বনদস্যু আবেদন করে আরো জানান যে, পরিবার নিয়ে ভালোভাবে বসবাস করতে সরকারের পক্ষ থেকে আরেকটু সাহায্যের প্রয়োজন তাদের। আর আত্মসমর্পণ করার সময় তাদের নামে থাকা মামলাগুলোর মধ্যে কিছু মামলা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। মাথার উপরে থাকা মামলার বোঝাটাও নামেনি এখনও। কয়েকটি মামলায় প্রতিনিয়ত হাজিরা দিতে যেতে হয় বাগেরহাট জেলায় আর খুলনা জেলা শহরের কোর্টে। মামলাগুলোর হাজিরা দিতে যাওয়া আসার পথেই কয়েক হাজার টাকা খরচ হয় তার। আত্মসমর্পণের সময় মামলা থেকে রেহাই দেয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘসুত্রিতায় এখনো বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে আনারুল ও মোস্তফাকে।

এরপর সুতি বাজার এলাকায় এসে কয়েকজন বনজীবী জেলের সাথেও কথা বলা হয় কালের কণ্ঠের পক্ষ থেকে। তাদেরই একজন বৃদ্ধ আঃ রহমান (৬০) জানান, কয়েক বছর আগে একবার মাছ ধরার লক্ষ্যে সুন্দরবনের ভেতরে একটি নদীতে তিনিসহ আটজন জেলে দস্যুদের শিকার হয়েছিলেন। অস্ত্রের মুখে তাদের জিম্মি করে তাদের ওপর নির্যাতন চালাতে থাকে দস্যুরা। পরে কাছে থাকা টাকা ও মহাজনের কাছ থেকে টাকা এনে মুক্ত হন তারা। তবে বর্তমানে সুন্দরবনের ভেতরে আর দস্যুদের উপদ্রব নেই। সুন্দরবনে এখন কিছুটা হলেও নিরাপদভাবে চলাচল করা যাচ্ছে। এক সময় প্রত্যেক মৎস্য ব্যবসায়ীকে দস্যুদের আগাম চাঁদা দিতে হতো, এখন আর আগাম চাঁদা দিতে হয় না।

কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি বিদেস রঞ্জন মৃধা কালের কণ্ঠকে বলেন, বনদস্যুদের আত্মসমর্পণের উদ্দেশ্য সাধারণ জেলেদের জীবনটাকে নিরাপদ করা, মুক্তিপণের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক নিপীড়নের হাত থেকে জেলেদের মুক্ত করা। সেই কাজটি আপাতত সফল হয়েছে।  

কয়রা থানার অফিসার ইনচার্জ এবি এম এস দোহা বলেন, একসময় সুন্দরবন দাপিয়ে বেড়ানো বনদস্যু বাহিনী প্রধান আনারুল ও তার দলের সদস্য মোঃ মোস্তফা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসায় এলাকায় স্বস্তি ফিরে এসেছে। পরবর্তীতে তারা যেন কোন অন্যায় কাজে না জড়ায় সে জন্য তাদের খোঁজখবর রাখছে কয়রা থানা পুলিশ।  

কয়রা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এসএম শফিকুল ইসলাম বলেন, বনদস্যু বাহিনী প্রধান আনারুল ও তাঁর দলের সদস্য মোঃ মোস্তফার আত্মসমর্পণের ঘটনা কয়রা উপজেলার জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তারা দস্যুতা ছেড়ে আলোর পথে ফিরে আসায় পুলিশ বা কোনো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এখন আর তাদের বিরক্ত করছে না। তারা শান্তিতে বসবাস করছে। দস্যুতা ছেড়ে আলোর পথে ফেরা পরিবারগুলোর খোঁজখবর নিয়ে তাদের আরও বেশি কর্মসংস্থানে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হবে বলেও আশ্বাস প্রদান করেন তিনি।



সাতদিনের সেরা