kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০২২ । ১৬ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

উত্তরায় গার্ডার দুর্ঘটনা

দুই সন্তানসহ ঝর্না-ফাহিমার লাশ জামালপুরে, চলছে শোকের মাতম

জামালপুর প্রতিনিধি   

১৭ আগস্ট, ২০২২ ০০:৫৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দুই সন্তানসহ ঝর্না-ফাহিমার লাশ জামালপুরে, চলছে শোকের মাতম

ঢাকায় গার্ডার দুর্ঘটনায় স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তানের মৃত্যুতে শোকার্ত জাহিদুল ইসলাম অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঢাকার উত্তরায় বিআরটির গার্ডারচাপায় প্রাইভেট কারের নিহত পাঁচজন যাত্রীর মধ্যে চারজনের বাড়িই জামালপুরে। ঢাকায় ময়নাতদন্তের আনুষ্ঠানিকতা শেষে আজ মঙ্গলবার দুপুরে শোকার্ত স্বজনরা ঢাকায় তাদের মরদেহ গ্রহণ করেন। লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়িতে করে তাদের মরদেহ মঙ্গলবার রাতেই জামালপুরে পৌঁছেছে। নিহত দুই বোন ফাহিমা আক্তার (৪০), ঝর্না আক্তার (২৮) ও তার দুই শিশু সন্তানের মৃত্যুতে পরিবারের স্বজনদের মাঝে শোকের মাতম চলছে।

বিজ্ঞাপন

পরিবারের স্বজনরা জানান, গত সোমবার বিকেলে ঢাকায় গার্ডারচাপায় প্রাইভেট কারের যাত্রী নিহত ফাহিমার মরদেহ তার বাবার বাড়ি জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার পাথর্শী ইউনিয়নের ঢেঙ্গারগড় গ্রামে সমাহিত করা হবে। ফাহিমার ছোট বোন ঝর্না (২৮), তার দুই সন্তান জান্নাত (৬) ও জাকারিয়ার (৩) মরদেহ ঝর্নার শ্বশুরবাড়ি জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়নের পয়লা গ্রামে সমাহিত করা হবে। দুর্ঘটনায় নিহত ফাহিমার মেয়ের শ্বশুর আইউব হোসেন ওরফে রুবেল মিয়ার মরদেহ তার স্বজনরা গ্রহণ করেছেন। দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া একই প্রাইভেট কারের যাত্রী রিয়ামনি ও তার স্বামী রেজাউল করিম হৃদয় হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়েছেন।

এদিকে মঙ্গলবার দুপুরে মেলান্দহের পয়লা গ্রামে ঝর্না আক্তারের শ্বশুবাড়ি গিয়ে দেখা গেছে, পুরো বাড়িটি যেন নিস্তব্ধ হয়ে আছে। অধিক শোকে কাতর হয়ে জাহিদুল ও তার মা অসুস্থ হয়ে খাটে শুয়ে আছেন। জাহিদুল কথাই বলতে পারছেন না। জাহিদুলের মা জবেদা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার দুইডা ছেলে। বড় ছেলাডা নির্মাণাধীন দালান থেইকা পইড়া মারা গেছে। জাহিদ আমার ছোট ছেলে। বেটাবউ আর দুই নাতি মারা গেছে। এখন আমি কি করমু। আমার ছেলেডা পাগল হয়া গেছে। অর কি অবো। ছেলের বাপও নাই। ভাইও নাই। এখন কোনো উপায় নাই। আমি কোনডাই কবার পাইনা বাবা। আল্লায় কপালে এইডা কি দিল। আমার মাথা ঠিক নাইখা।

এর আগে ইসলামপুরের ঢেঙ্গারগড় গ্রামে ফাহিমা ও ঝর্ণার বাবার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে,  শোকার্ত স্বজনরা নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। প্রতিবেশীরাও ছুটে এসেছেন সমবেদনা জানাতে। ঢাকায় ফোন করে জানছিলেন কখন তাদের মরদেহ জামালপুরে পাঠাবে। নিহত ফাহিমার চাচা আবু বক্কর কালের কণ্ঠকে বলেন, কি থেকে যে কি হয়ে গেল আমরা ভাইবা কোনো কুল পাইতাছি না। দুইটা পরিবার তছনছ হইল। আমার ভাই রশিদুল হক বাট্টু তার তিন মেয়ে ও দুই ছেলেকে নিয়ে ঢাকার আশুলিয়ায় থাকে। ফাহিমারা কেউ বাড়িতে থাকে না। ফাহিমাকে আমাদের বাড়িতেই দাফন করা হবে। আরেক মেয়ে ঝর্না ও তার দুই সন্তানকে ঝর্নার শ্বশুরবাড়ি মেলান্দহের পয়লা গ্রামে দাফন করা হবে।

নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার পাথর্শী ইউনিয়নের ঢেঙ্গারগড় গ্রামে মধ্যবিত্ত কৃষক রশিদুল হক বাট্টুর মেয়ে ফাহিমা ও ঝর্না। এই দুই মেয়েসহ পাঁচ সন্তান এবং স্ত্রী আকলিমাকে নিয়ে রশিদুল হক দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার আশুলিয়ার খেজুর বাগান এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে জীবিকা নির্বাহ করেন। ফাহিমা তার একমাত্র কন্যা রিয়া মনিকে নিয়ে আশুলিয়ার খেজুর বাগান এলাকায় আলাদা বাসা ভাড়া নিয়ে পোশাক কারখানায় কাজ শুরু করেন। রিয়া মনিও একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। গত শনিবার আশুলিয়া খেজুর বাগান এলাকার ভাড়া বাসায় রিয়ামনির বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল। অপর মেয়ে ঝর্না আক্তারের শ্বশুরবাড়ি জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়নের পয়লা গ্রামে।

ঝর্নার স্বামী জাহিদুল ইসলাম গত বৃহস্পতিবার তার স্ত্রী ঝর্না, দুই শিশু সন্তান জান্নাত ও জাকারিয়াকে নিয়ে ঢাকার খিলক্ষেত এলাকায় রিয়ামনির বিয়ের দাওয়াতে যান। গত শনিবার বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে পরদিন জাহিদুল স্ত্রী ও দুই সন্তানকে রেখে মেলান্দহের বাড়িতে চলে আসেন। ঝর্না ও তার দুই শিশু সন্তান নিয়ে শনিবার ঢাকার খিলক্ষেত এলাকায় রিয়ামনির বৌভাত অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। সোমবার দুপুরে রিয়ামনি ও তার স্বামী রেজাউল করিম হৃদয়সহ পরিবারের সবাই ফের আশুলিয়ায় রিয়ামনিদের বাসায় ফিরছিলেন।

নবদম্পতিসহ একটি প্রাইভেট কারে ফিরছিলেন ফাহিমা, ঝর্না ও তার দুই শিশু সন্তান। পরিবারের অন্যরা বাসে রওনা হন। পথে ঢাকার উত্তরা এলাকায় বিআরটির একটি গার্ডার প্রাইভেট কারটিকে চাপা দিলে নবদম্পতি প্রাণে বেঁচে গেলেও প্রাইভেট কারের চালক রিয়ামনির শ্বশুর আইউব হোসেন রুবেল মিয়া, রিয়ামনির মা ফাহিমা, খালা ঝর্না ও তার দুই শিশুসন্তান ঘটনাস্থলেই নিহত হন। ঢাকায় ময়নাতদন্ত শেষে ফাহিমা, ঝর্না ও তার দুই শিশু সন্তানের মরদেহ লাশবাহী ফিজিং গাড়িতে করে মঙ্গলবার রাত ১০টার পর জামালপুরের ইসলামপুর ও মেলান্দহে তাদের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছেছে। এ সময় দুটি পরিবারের শোকার্ত স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। জানাজা শেষে রাতেই তাদেরকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করার কথা রয়েছে।    



সাতদিনের সেরা