kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ অক্টোবর ২০২২ । ১৯ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

চা শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ, ৩ শ টাকা মজুরির দাবিতে ধর্মঘট

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি    

১৩ আগস্ট, ২০২২ ১৫:২২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চা শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ, ৩ শ টাকা মজুরির দাবিতে ধর্মঘট

একদিকে বৈরী আবহাওয়ায় উৎপাদন ঘাটতি ও লোডশেডিংয়ে উৎপাদনে বিঘ্ন হচ্ছে। এর সঙ্গে উৎপাদনের ভরা মৌসুমে যোগ হয়েছে চা শ্রমিকদের আন্দোলন। ফলে হবিগঞ্জ তথা সারা দেশের চা-শিল্পের জন্য দেখা দিয়েছে চরম অশনিসংকেত।

আজ শনিবার (১৩ আগস্ট) সকাল থেকে জেলার সব চা বাগানে শুরু হয়েছে অনির্দিষ্টকালের শ্রমিক ধর্মঘট।

বিজ্ঞাপন

এ সময় সড়ক অবরোধের পাশাপাশি বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন করেন শ্রমিকরা। চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নিপেন পালসহ বক্তৃতা করেন চা শ্রমিক নেতারা।

আজ সকালে জেলার চুনারুঘাট উপজেলার চানপুর বাগানের শ্রমিকরা সাবেক ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে চলে আসেন। সেখানে তারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধনে অংশ নেন। অপরদিকে বাহুবল উপজেলার কামাইছড়া চা বাগানের শ্রমিকরা হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজার সড়কে এসে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।

জানা যায়, সারা দেশে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৩০০ টাকা করার দাবি জানিয়েছে চা-শ্রমিক ইউনিয়ন। এ দাবি আদায়ে আন্দোলনে নামেন তারা। গত মঙ্গলবার (৯ আগস্ট) থেকে বৃহস্পতিবার (১১ আগস্ট) প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে সব বাগানে কর্মবিরতি পালনের পাশাপাশি বিক্ষোভ সমাবেশেরও আয়োজন করা হয়। তবে তাদের এ কর্মবিরতিতে বাগান কর্তৃপক্ষের পরিবর্তন না হওয়ায় এবার ফুঁসে ওঠেন চা শ্রমিকরা।

এর আগে বৃহস্পতিবার (১১ আগস্ট) শ্রীমঙ্গলে শ্রম অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাহিদুল ইসলামের সঙ্গে ১০ চা শ্রমিক নেতার বৈঠক হলেও তা সুফল বয়ে আনেনি। এ সময় শ্রম অধিদপ্তর ২৮ আগস্ট পর্যন্ত সময় চাইলেও শ্রমিক নেতারা তা না মেনে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ঘোষণা দেন।

শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত শ্রম অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাহিদুল ইসলাম জানান, কর্তৃপক্ষ হিসেবে মহাপরিচালক চা শ্রমিকদের চিঠি দিলেও তারা এই চিঠির সম্মান না করেই আন্দোলনে নেমেছেন। এ ব্যাপারে মালিক পক্ষ কী কৌশল গ্রহণ করে তা আমাদের জানা নেই।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল বলেন, ‘শ্রম অধিদপ্তর আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করেছে। তারা আগামী ২৯ আগস্ট ত্রিপক্ষীয় আলোচনার সময় চেয়েছে। কিন্তু আমরা তাতে রাজি হইনি। শুক্রবার চুনারুঘাট উপজেলার সব চা বাগানে ২ ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন শেষে এক সমাবেশে সব চা বাগান একযোগে বন্ধের ঘোষণা করেছি। ' তিনি বলেন, ‘যদি কর্তৃপক্ষ দাবি না মানে তাহলে শায়েস্তাগঞ্জ নতুন ব্রিজ এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করা হবে। ’

তিনি আরো বলেন, চা শ্রমিকরা তাদের ভূমি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মজুরিসহ বিভিন্ন দাবিতে এই আন্দোলন করে আসছে। এই দাবি যৌক্তিক হওয়ায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও তাদেরকে সমর্থন দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

চা সংসদের আহ্বায়ক তাহসিন আহমেদ বলেন, ‘চা শ্রমিকদের অযৌক্তিক আন্দোলনে চা উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চা শ্রমিকদের সঙ্গে বাগান কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের ঝামেলা নেই। অথচ তারা অযৌক্তিকভাবে আন্দোলন করছেন। ’ তিনি জানান, তাদের দাবি নিয়ে আলোচনা চলমান থাকাকালীন তারা হঠাৎ করে এ কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছে, সেটা অবৈধ কর্মবিরতি, যা শ্রম আইনের পরিপন্থী।

এদিকে চা-শিল্পে উৎপাদন ও শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে শ্রমিকদের আইনবহির্ভূত কর্মবিরতি অবিলম্বে প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান শ্রম মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) খালেদ মামুন চৌধুরী এনডিসি। দ্রুততম সময়ে চলমান বিরোধ পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান ও চা-শিল্পে স্বাভাবিক উৎপাদনের পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।

চুনারুঘাট উপজেলার চানপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক মো. শামীম হুদা বলেন, ‘হঠাৎ করে কর্মবিরতি দিয়ে চা উৎপাদনে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এখন চা মৌসুমের মূল সময়। যেখানে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কেজি পাতা তোলা হতো এখন তা কমে প্রায় ২০ হাজার কেজিতে চলে এসেছে। অনির্দিষ্টাকালের কর্মবিরতিতে এখন উৎপাদন শূন্য। যথাসময়ে পাতা উত্তোলন না করলে চায়ের গুণগত মানও হ্রাস পাবে।

চা বাগান সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা যায়, হবিগঞ্জের চা বাগানগুলোতে অতিবৃষ্টির পর এবার প্রচণ্ড গরমের প্রভাবে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। পোকা-মাকড়ের আক্রমণে অধিকাংশ বাগানের বেহাল দশা। তা ছাড়া চলমান লোডশেডিংয়ের কারণেও উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। উৎপাদন খরচ আর বিক্রয়মূল্যে অনেক চা বাগান এখন লোকসানে রয়েছে। এমন সময়ে শ্রমিকদের ধর্মঘট চা বাগানশিল্পের জন্য অশনিসংকেত। ফলে এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশা দেখছেন না বাগান সংশ্লিষ্টরা।

চা বাগান সূত্রে জানা গেছে, হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ, বাহুবল, চুনারুঘাট, মাধবপুর উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলের প্রায় ১৫ হাজার ৭০৩.২৪ হেক্টর জমিতে ২৫টি ফ্যাক্টরিযুক্ত চা বাগান রয়েছে। এ ছাড়া ফাঁড়িসহ প্রায় ৩৫টি বাগানের প্রায় প্রতি হেক্টর জমিতে ২২-২৫ শ কেজি চা পাতা উৎপাদন হয়। এসব বাগানে বছরে ১ কোটি ৩০ লাখ কেজি চা উৎপাদন হয়ে থাকে।



সাতদিনের সেরা