kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ অক্টোবর ২০২২ । ১৯ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন

ধামরাইয়ে আওয়ামী লীগের ২ নেতার দ্বন্দ্ব, নেতাকর্মীরা বিভক্ত

ধামরাই (ঢাকা) প্রতিনিধি    

১১ আগস্ট, ২০২২ ১৩:৪৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ধামরাইয়ে আওয়ামী লীগের ২ নেতার দ্বন্দ্ব, নেতাকর্মীরা বিভক্ত

ঢাকার ধামরাইয়ে ক্ষমতার প্রভাব আর আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আওয়ামী লীগের দুই নেতার দ্বন্দ্ব প্রকট হয়েছে উপজেলা ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন ঘিরে। বর্তমান সংসদ সদস্য ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বেনজীর আহমদ ও সাবেক সংসদ সদস্য উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ মালেকের মধ্যে এ দ্বন্দ্ব চলে আসছে প্রায় এক যুগ ধরে।  

দুই মাস আগেও এক মঞ্চে থেকে পাশাপাশি বসে তাদের মধ্যে খোশগল্প করতে দেখা গেছে। দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতেও একে অপরের মুখে কেক তুলে দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী পালনের প্রস্তুতি সভা ও ইউনিয়ভিত্তিক দোয়া ও আলোচনাসভা পৃথকভাবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় উভয় নেতার নেতৃত্বে। এতে দুই পক্ষের বিরোধ আবারও প্রকাশ্যে এসেছে। এতে নেতাকর্মীরাও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছেন। দুই নেতার দ্বন্দ্বে ২০১৯ সালের ১০ ডিসেম্বর হয়নি উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন। ওই সময় এম এ মালেককে না জানানোর ফলে তার আপত্তিতে ওই সম্মেলন স্থগিত হয় ডা. দীপু মনির নির্দেশে। স্থগিতকৃত সম্মেলন ৯ বছর পর আবার আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর ধার্য করা হয়েছে। সম্মেলনে উপজেলার নেতৃত্ব কার হাতে দেওয়া হবে এ নিয়ে উপজেলাজুড়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা।  

দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে আলোচনা করে জানা গেছে, কেউ বলছেন ঢাকা জেলার সভাপতি বর্তমান সংসদ সদস্য বেনজীর আহমদ যাকে দেবেন তার নেতৃত্বেই চলবে উপজেলা আওয়ামী লীগ। আবার কেউ বলছেন, কেন্দ্রীয় নেতারা সম্মেলনে এসে শুধু ঘোষণা করে যাবেন কে সভাপতি আর কে সাধারণ সম্পাদক। তবে দলীয় গঠনতন্ত্র মোতাবেক ইউনিয়ন কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার মতামতের ভিত্তিতে উপজেলা কমিটি গঠন করার কথা। এতে দুই নেতা তাদের অনুসারীদের নিয়ে প্রতিটি ইউনিয়নে আলাদা কমিটি গঠন করেছেন। এখন প্রশ্ন থেকে যায়, বেনজীর আহমদের নেতৃত্বে গঠিত, নাকি মালেকের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির নেতাদের সমর্থনে উপজেলা কমিটি গঠিত হবে? এ নিয়ে বেনজীর-মালেকের মধ্যে চরম বিরোধিতা চলছে।

বেনজীর আহমদ চাচ্ছেন তার নেতৃত্বে গঠিত ইউনিয়ন কমিটির নেতাদের সমর্থনে আর এম এ মালেক চাচ্ছেন তার নেতৃত্বে গঠিত কমিটির নেতাদের সমর্থনে উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করতে হবে।  

এ বিষয়ে জানতে বেনজীর আহমদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কাদের ভোটে উপজেলার নেতা নির্বাচিত হবে সেটা পরের বিষয়। তবে তার নেতৃত্বে গঠিত নতুন কমিটি অনুমোদন হয়ে গেছে বলে জানান তিনি।  

এদিকে এম এ মালেক বলেন, 'আমি উপজেলা কমিটির সভাপতি হিসেবে ইউনিয়নের নতুন কমিটির কোনো অনুমোদন দিইনি। কমিটি অনুমোদনের বিষয়ে বেনজীর আহমেদ মিথ্যা কথা বলেছেন। ' 

ফলে দলীয় গঠনতন্ত্র মোতাবেক সেই কমিটির কতটুকু বৈধতা রয়েছে তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ২২ নভেম্বরের একটি সভায় ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনের দিন ধার্য করা হয়েছিল। ওই সভায় এম এ মালেক উপস্থিত থেকে সিদ্ধান্তপত্রে স্বাক্ষরও করেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর থেকে ১৬টি ইউনিয়নের মধ্যে ১৩টি ইউনিয়নে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি সম্মেলনে সংসদ সদস্য বেনজীর আহমদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকলেও এম এ মালেককে দেখা যায়নি। বেনজীর আহমদের নেতৃত্বে ১৩টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদ গঠন করা হয়।  

তবে উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর থেকে অনুষ্ঠিতব্য ১৬টি ইউনিয়নের মধ্যে ১৩টি ইউনিয়ন সম্মেলনে এম এ মালেক অনুপস্থিত থাকার পেছনে রয়েছে তার স্ত্রী মিনা মালেকের এক মানহানি মামলা। এ মামলায় বেনজীর বলয়ের উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন সাকু, পৌর মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম কবির মোল্লা ও পৌর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও কাউন্সিলর আরিফুল ইসলামের নামে আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। তারা ২০১৯ সালের ২৬ নভেম্বর আদালত থেকে জামিন নেন। জামিন নিয়ে তারা ওই দিনই সভা করে সন্ধ্যায় এম এ মালেককে ধামরাইয়ে অবাঞ্ছিত ও প্রতিহত করার ঘোষণা দেন।  

এম এ মালেক এমপি থাকাকালীন গোলাম কবিরকে মেয়র পদে নির্বাচিত করা হয়। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার কয়েক দিন পর থেকেই গোলাম কবির মালেকের বিপক্ষে চলে যান। ওই সময় কাউন্সিলর আরিফুল ইসলাম এম এ মালেকের স্ত্রীকে মা বলে ডাকতেন। আবার তাদের বিরুদ্ধেই মিনা মালেক মানহানি মামলা করেছিলেন। বেনজীর আহমদ যখন এমপি ছিলেন তখন গোলাম কবির বেনজীর আহমদের সাথে ছিলেন। আবার যখন মালেক এমপি হলেন তখন বেনজীর আহমদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে মালেকের পক্ষে চলে যান। মালেক তাকে মেয়র নির্বাচিত করেন। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিন পরই মালেকের বিপক্ষে চলে যান তিনি। বর্তমানে এমপি বেনজীর আহমদের সাথে রয়েছেন গোলাম কবির।

এদিকে সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাজনৈতিক মাঠ সরগরম হয়ে উঠছে। এতে দেখা যায়, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে প্রার্থী হবেন বর্তমান সভাপতি এম এ মালেক। মালেকের বিপরীতে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বেনজীর আহমদ বলয়ের পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র গোলাম কবির।  

সাধারণ সম্পাদক পদে মালেক বলয়ের উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি মোহাদ্দেস হোসেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এর বিপরীতে বেনজীর বলয়ের উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা সাখাওয়াত হোসেন সাকু, উপজেলা আওয়ামী  লীগের ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ  সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান সিরাজ উদ্দিন ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সানোড়া ইউপি চেয়ারম্যান খালেদ মাসুদ খান লাল্টু এবং উপজেলা কৃষক লীগের সাবেক সভাপতি আহম্মদ হোসেন। এ ছাড়া সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহীর সাবেক এপিএস সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মনোয়ার হোসেন।

এদিকে দুই পক্ষ একে অপরের ঘুষ বাণিজ্য, জমি দখল, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতির ফিরিস্তি তুলে ধরে উত্তপ্ত বাক্যে বিষোদগার করে আসছে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে। বিগত দিনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে (ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচন) নৌকা প্রতীকের মনোনয়নপ্রাপ্তদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে―এসব ফিরিস্তিও স্থান পায় তাদের উভয় পক্ষের সভা-সমাবেশে। বিশেষ করে পৌর মেয়র গোলাম কবিরের ভূমিকা নিয়ে সরগরম থাকে আলোচনাসভা।  

এদিকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তৃণমূল নেতাদের সমর্থনে উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করার পক্ষে মতামত দেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পুনরায় সাধারণ সম্পাদক পদের প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা সাখাওয়াত হোসেন সাকু। তবে দুই নেতার নেতৃত্বে গঠিত ইউনিয়ন কমিটির কোনোটারই বৈধতা নেই বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, একমাত্র পুরাতন কমিটিরই বৈধতা রয়েছে।

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী মোহাদ্দেস হোসেন বলেন, 'আগামীর সম্মেলনে তৃণমূল নেতাদের ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে উপজেলার কমিটি গঠন করা হলে আমার কোনো আপত্তি নেই। ' 



সাতদিনের সেরা