kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

চট্টগ্রামে গরমে বেড়েছে রোগব্যাধি

♦ হাসপাতালে রোগীর চাপ, চেম্বারেও ভিড়
♦ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

১৭ জুলাই, ২০২২ ০২:৫২ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চট্টগ্রামে গরমে বেড়েছে রোগব্যাধি

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে শিশু ডায়রিয়া ওয়ার্ডে রোগীর চাপ। ছবি : নূপুর দেব

মোহাম্মদ ওমর গনি নামে ১৯ মাস বয়সী একটি শিশুর গতকাল সকালে গা গরম হয়ে ওঠার পর দুপুর ১২টার দিকে খিঁচুনি দেখা দেয়। তখন নগরের মির্জাপুলের বাসা থেকে শিশুটিকে পাশের একটি ফার্মেসিতে নিয়ে গেলে তার ১০৪ ডিগ্রি জ্বর ধরা পড়ে। শিশুটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলা হলে মা আমেনা বেগম তাকে তাড়াতাড়ি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু আউটডোরের চিকিৎসককে দেখান।

গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সরকারি এ হাসপাতালের শিশু আউটডোরে অবস্থান করে দেখা যায়, ওমর গনির মতো জ্বর, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন উপসর্গ থাকা শিশুদের নিয়ে আসছেন তাদের অভিভাবকরা।

বিজ্ঞাপন

দুপুর দেড়টার দিকে নগরের আগ্রাবাদে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের ফটক দিয়ে প্রবেশ করতেই দেখা যায়, এক নবজাতককে নিয়ে মা হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। জানতে চাইলে পোর্ট কলোনি এলাকা থেকে আসা মেহেরুননেছা নামের ওই মা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গতকাল (শুক্রবার) রাত থেকে আমার বাচ্চার (১৪ দিন বয়সী হাবিবা আকতার রিয়া মনি) সর্দি-জ্বর। আজ বেশি খারাপ লাগাতে হাসপাতালে চিকিৎসককে দেখাতে আসি। চিকিৎসক বলেছেন, এখনই বাচ্চাকে ভর্তি করাতে হবে। দিনে পাঁচ হাজার টাকা লাগবে। তাই এখন বাসায় যাচ্ছি, বাচ্চার বাবার সঙ্গে পরামর্শ করতে। ’ 

তীব্র দাবদাহের কারণে পবিত্র ঈদুল আজহার পর দু-তিন দিন ধরে নগরীর সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে মৌসুমি নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে অনেকেই চিকিৎসা নিচ্ছে। এদের মধ্যে বেশির ভাগই শিশু ও বয়স্ক। অনেকেই হাসপাতালের আউটডোরে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরে গেছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ অনেক বেড়ে গেছে। তাপমাত্রা যত বাড়ছে ততই নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্তের সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে। চিকিৎসকদের চেম্বারেও রোগীর ভিড় বেড়েছে।

চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোতে মৌসুমি রোগে আক্রান্ত রোগী বাড়ছে। গতকাল শনিবার চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য মতে, জেলার ১৫ উপজেলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (গতকাল সকাল ৮টার আগে) ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১১২ জন ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে গত সাত দিনে ৯৯৫ জন এবং গত এক মাসে তিন হাজার ৬৬০ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়।

এদিকে চমেক হাসপাতালের ৯ নম্বর শিশু স্বাস্থ্য ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ১২২টি শিশু ভর্তি রয়েছে। শয্যার অভাবে এক শয্যায় একাধিক শিশুকে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে বেসরকারি চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের শিশু ডায়রিয়া ওয়ার্ডে দেখা যায়, সেখানে শয্যা আছে ৪৩টি। এর মধ্যে সকাল ৮টা পর্যন্ত ৩৯টিতে রোগী (শিশু) রয়েছে।

সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট বক্ষব্যাধি হাসপাতালের ডায়রিয়া ব্লকে আগের দিন (শুক্রবার) ১৬ জন চিকিৎসাধীন থাকলেও গতকাল তা বেড়ে ২১ জনে উন্নীত হয়েছে।

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের পরিচালক ডা. নুরুল হক তাঁর কার্যালয়ে গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঈদের পর থেকে জ্বর, সর্দি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে গেছে। শিশু ওয়ার্ডে (ডায়রিয়া) ৩৯ জন ভর্তি, মেডিসিন ওয়ার্ডে (প্রাপ্তবয়স্ক) মোট ভর্তি থাকা ৪৯ জনের মধ্যে আটজন জ্বর এবং চারজন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। ’

চমেক হাসপাতালের বহির্বিভাগে আবাসিক চিকিৎসক (শিশুস্বাস্থ্য) ডা. মো. সাইফুল ইসলাম দুপুরে কালের কণ্ঠকে বলেন, আউটডোরে আনা বেশির ভাগ শিশুর জ্বর ও সর্দি-কাশি। কারো কারো খিঁচুনি রয়েছে। আজ (গতকাল) শিশুস্বাস্থ্য আউটডোরে সকাল ৮টা থেকে দুপুর প্রায় আড়াইটা পর্যন্ত ১৪৬টি শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১০টি শিশু ভর্তি হয়েছে। চিকিৎসা নেওয়াদের মধ্যে অন্তত ৩০ শতাংশ জ্বর ও সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডা. মোস্তফা মোহাম্মদ জামাল বলেন, ঈদের আগে থেকে পরের কয়েক দিনে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ জ্বর ও ডায়রিয়ার রোগী বেড়েছে। গরমের কারণে চর্ম রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। এর আগে চমেক হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য ওয়ার্ডের বারান্দায় আলাদা ব্লকে রাখা হয় শিশু ডায়রিয়া রোগীদের। ওই ব্লকে ঢুকতেই ডান পাশে আবদুল হামিদ (দুই বছর) নামের একটি শিশুর পাশে মা-বাবা বসে আছেন। জানতে চাইলে মা জরিনা বেগম বলেন, ‘রাঙ্গুনিয়া থেকে এসেছি। আমার ছেলের তিন-চার দিন আগে জ্বর উঠেছিল। জ্বর কমার পর ডায়রিয়া শুরু হয়। গত শুক্রবার দুপুরে এখানে ভর্তি করেছি। ’

ওই শিশুর পাশে আরেকটি শয্যায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত মোবারক খান (দুই বছর দুই মাস) চিকিৎসাধীন। নগরের চকবাজারের রসুলবাগ থেকে আসা এই শিশুর মা আয়েশা বেগম বলেন, ‘জ্বর ও পাতলা পায়খানায় বাচ্চা খুব দুর্বল হলে শুক্রবার বিকেলে ভর্তি করাই। ’

এদিকে শিশুস্বাস্থ্য ওয়ার্ডের ২৭ নম্বর শয্যায় দুটি শিশু চিকিৎসাধীন। একই অবস্থা ওয়ার্ডের আরো বিভিন্ন শয্যায়।

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের শিশু ডায়রিয়া ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, মা-বাবা কিংবা স্বজনরা চিকিৎসাধীন শিশুদের পাশে বসে আছেন, আবার কেউ শিশুকে কোলে নিয়ে হাঁটছেন ওয়ার্ডে। ৬ নম্বর শয্যায় চিকিৎসাধীন ১১ মাস বয়সী তাওয়ার মা সালমা বলেন, ‘নগরের সল্টগোলা থেকে এসেছি। বাচ্চার ডায়রিয়া হয়েছে। ’ গতকাল সকাল ৮টার পর থেকে ওই ওয়ার্ডে আহাদ, তাকবির, সামিয়া, পুষ্পিতা নামে ছয় মাস থেকে এক বছর বয়সী ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের ভর্তি করা হয়।



সাতদিনের সেরা