kalerkantho

রবিবার । ১৪ আগস্ট ২০২২ । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৫ মহররম ১৪৪৪

ঘুমন্ত জনপদ ভাসিয়ে দেয় ধলেশ্বরী, এখনো বিপন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনজীবন

মনিরুজ্জামান মহসিন, নেত্রকোণা   

৫ জুলাই, ২০২২ ১৩:৪৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঘুমন্ত জনপদ ভাসিয়ে দেয় ধলেশ্বরী, এখনো বিপন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনজীবন

ধলেশ্বরী নদী। এর উত্তর-পশ্চিম পাড়ে কাঁটাতারের বেড়ার ভেতর এক থেকে তিন হাজার ফুটেরও বেশি উঁচু পাহাড়ের সারি, রয়েছে গহিন অরণ্য। জায়গার নাম রংরা। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের অংশ।

বিজ্ঞাপন

পাহাড় বেয়ে ছোট-বড় অসংখ্য পানির ছড়া নেমেছে ধলেশ্বরীতে। পূর্ব-দক্ষিণ পাড়ে ভারত বাংলাদেশের জিরো পয়েন্ট। সেখানে ১১৭২ নম্বর সীমান্ত পিলার।  

নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার দুর্গম এলাকা এটি। ধলেশ্বরীর পাড়ঘেঁষা সবুজ গাছগাছালিতে ঘেরা এই জনপদের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। গারো ও হাজং সম্প্রদায়ের বাস এখানে। গত ১৬ জুন ভোররাত ৩টার দিকে যখন গভীর ঘুমে মগ্ন এই পাহাড়ি জনপদের বাসিন্দারা, ঠিক তখনই তাদের জীবনে ঘটে এক ভয়াবহ ঘটনা। রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকার ভেদ করে ওপারের পাহাড়ের ছড়া বেয়ে  প্রচণ্ড গতিতে বালু-পানির ঢল নামে ধলেশ্বরীর বুকে। মুহূর্তেই নদী উপচে সমতল থেকে ১০ ফুট উঁচুর বালু-পানির ঢল ভয়াল রূপ ধারণ করে। প্রথম ধাক্কাটি দেয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঘরবাড়িগুলোতে। এতে মাটি, বাঁশ ও টিনের তৈরি বহু ঘরবাড়ি খড়কুটোর মতো ভেসে বিলীন হয়ে যায়। সঙ্গে ভেসে যায় গবাদি পশু, ঘরে থাকা ধান-চাল, নগদ টাকা, আসবাবপত্র, বিছানা-পাটি, পরনের কাপড়, থালাবাটিসহ দৈনন্দিন ব্যবহারের সব জিনিস। ঘরের চালে, গাছে ঝুলে, বুকপানিতে দাঁড়িয়ে মানুষ বাঁচার লড়াই চালিয়ে যায়। যে যেভাবে পারেন জীবন বাঁচিয়েছেন সেদিন রাতে।  
     
সরেজমিনে সীমান্তবর্তী দুর্গম জনপদ গারো পাহাড়ঘেঁষা ফুলবাড়ী, জগন্নাথপুর, কাউবাড়ী, কালাপানি, চৈতানগর, চেঘ্নী, রঘুনাথপুর, বালুচড়া, শিবপুর, তারানগর, মানিকপুর, রাধানগরসহ কমপক্ষে ২০টি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, ঢলের পানির তাণ্ডবে তছনছ হয়ে গেছে জনজীবন।  
    
ফুলবাড়ী গ্রামের বিধ্বস্ত বাড়িতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা থালাবাটিসহ গৃহস্থালি জিনিস সংগ্রহ করছিলেন সোলেমন রিছিল। তিনি বলেন, ধলেশ্বরীর প্রথম ধাক্কাটা লাগে আমার বাড়িতে। ঢলের স্রোতে বাড়ির পাঁচটি ঘর বিলীন হয়ে গেছে। চোখের সামনে দুটি ছাগল, হাঁস-মুরগিসহ সব জিনিসপত্র ভেসে গেছে। পরনের কাপড় ছাড়া কিছুই নাই। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবম্ব হয়ে পড়েন স্ত্রী অনুশীলা ঘাগ্রা। এর পর থেকে তিনি মানসিকভাবে কিছুটা অস্বাভাবিক হয়ে পড়েছেন বলে জানান সোলেমন।
       
একই এলাকার বাসিন্দা লাভলী রংদি। ওই দিন রাতে বৃদ্ধ বাবা-মা, এক মাসি ও ৯ বছরের ছেলে বৃদ্ধ রংদিকে নিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, ওই দিন রাতে হঠাৎ বিকট শব্দ ও হাঁসমুরগির ডাকে ঘুম ভাঙতেই চোখের পলকে ঘরের ভেতর গলা সমান পানি হয়ে যায়। ছেলেকে একটি আমগাছের ডালে তুলে দিই। সেখানেও তাকে পিঁপড়া আক্রমণ করে। ছেলে, বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে কোনোরকমে প্রাণে বেঁচে গেলেও খোরাকের চাল, ডাল, সন্তানের বইপত্র, গবাদি পশু কিছুই রক্ষা করতে পারিনি। এখন দুর্ভোগে পড়েছি। কিছু শুকনো খাবার ছাড়া কোনো ত্রাণ সহায়তা পাইনি। লাভলী রংদি জানান, ঢলের পর থেকে তার বৃদ্ধ মাসি নীলিমা ডিও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার অভাবে কাহিল হয়ে পড়ছেন।

রঘুনাথপুর ব্যাপ্টিস্ট চার্চের বারান্দার কোণে বসে খিচুড়ি রান্না করছিলেন ঘরহারা ফজিলা রোরাম। গির্জার পবিত্রতা রক্ষায় তারা ভেতরে ঢোকেন না, বারান্দায়ই থাকেন। তিনি বলেন, গরু পালন ও কৃষিকাজ করে সংসার চলত। ঢলে ঘর ভাঙছে। অন্যের কাছ থেকে নেওয়া দুটি গরু ভেসে গেছে। নিঃস্ব হয়ে গেছি। মেয়ে সেতু রোরাম এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। কীবায় চলাবাম, উপায় দেখছি না। ঢলের পানিতে ঘরবাড়ি, সহায়-সম্বল হারিয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শত শত পরিবারসহ কয়েক হাজার মানুষ এভাবেই অসহায় হয়ে পড়েছেন। হতাশা আর দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের। দুর্গম এলাকা হওয়ায় ত্রাণসামগ্রী বা চিকিৎসাসেবা কোনোটাই তেমন পাচ্ছেন না বলে ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ।  

কলমাকান্দা উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, লেংগুরা, রংছাতি ও খারনৈ ইউনিয়নসহ সীমান্ত এলাকায় প্রায় ৩০ হাজার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মানুষের বসবাস। উপজেলায় সাড়ে চার শ  ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে।  
     
লেঙ্গুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান ভূইয়া জানান, তার ইউনিয়নে দুই শতাধিক পরিবারে প্রায় তিন হাজার আদিবাসীর সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। অপ্রতুল ত্রাণের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত চাল বরাদ্দ পেয়েছি মাত্র ছয় টন। অথচ প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ টন চালের দরকার। এর মধ্যে বরাদ্দ পাওয়া চাল ও ৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। সরকারি সহায়তা ছাড়া স্থানীয় সব পেশার মানুষের সহযোগিতায় ঘরহারা মানুষকে একটি করে ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
   
কমলাকান্দা উপজেলার ইউএনও মো. আবুল হাসেম কালের কণ্ঠকে বলেন, ঢলের ভয়ংকর আঘাতে রাস্তা ভেঙে উপজেলার আটটি ইউনিয়নের মধ্যে সীমান্তবর্তী তিনটি ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মেরামতের জন্য টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। ঢলের আঘাত কাটিয়ে উঠতে একটু সময় লাগবে। ইতিমধ্যে ৭৫ মেট্রিক টন চাল ও এক হাজার ১০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।



সাতদিনের সেরা