kalerkantho

শুক্রবার । ১৯ আগস্ট ২০২২ । ৪ ভাদ্র ১৪২৯ । ২০ মহররম ১৪৪৪

অসহায় রুমার কোলে যমজ হাসান-হোসেন!

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া    

১ জুলাই, ২০২২ ১০:৫২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অসহায় রুমার কোলে যমজ হাসান-হোসেন!

ফুটফুটে যমজ এসেছে রুমার কোলে, তাদের সার্বিক সহযোগিতা দিচ্ছে হাসপাতাল

বসে আছেন রুমা আক্তার। তবে মুখে গোমড়া ভাব। হাসির রেশমাত্র নেই। সন্তানদের নাম কী রেখেছেন জানতে চাইলে মুখে হাসি ফুটল।

বিজ্ঞাপন

পরক্ষণেই তা মিলিয়ে যায় সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা জানতে চাইলে।

ভোলার লালমোহন উপজেলার বাসিন্দা রুমা আক্তার। সৎমায়ের অত্যাচারে ছোটবেলায়ই বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। বেড়ে ওঠা এখানে-সেখানে। কয়েক বছর আগে বিয়ে হয় হবিগঞ্জের এক যুবকের সঙ্গে। স্বামীকে নিয়ে থাকতেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায়। কয়েক মাস হলো বড় সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে স্বামী আরেকজনকে বিয়ে করে অন্যত্র চলে গেছেন। রুমা জানেন না তার স্বামী কোথায়।

৩০ বছর বয়সী রুমা আক্তারের কোলজুড়ে এখন ফুটফুটে দুই সন্তান। জিলহজ মাসকে সামনে রেখে সন্তানদের নাম রেখেছেন হাসান ও হোসেন। তবে সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় রুমা। নিজে এখানে-সেখানে বেড়ে উঠলেও ছেলেসন্তানদের কিভাবে লালন-পালন করবেন সে নিয়ে দুশ্চিন্তায় তিনি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, এই মুহূর্তে রুমাকে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে হয়তো হাসপাতালে তাকে বেশিদিন রাখা সম্ভব হবে না। দুই সন্তানসহ রুমা এখন ভালো আছেন।

আখাউড়ার খড়মপুরে আসার সূত্র ধরে দিনমজুর ইব্রাহিম মিয়ার সঙ্গে রুমার বিয়ে হয়। এক কন্যাসন্তান নিয়ে ভালোই কাটছিল রুমার সংসার। দ্বিতীয়বার গর্ভধারণের পর প্রায় ছয় মাস আগে কন্যাকে নিয়ে চলে যান স্বামী ইব্রাহিম। মাথায় বাজ পড়ে রুমার। ভাড়া বাসা ছেড়ে আশ্রয় নেন আখাউড়া রেলওয়ে জংশন স্টেশনে। অন্যের কাছে হাত পেতে চলত পেট। সুমি আক্তার নামে এক নারীকে মা ডাকতেন। সেই নারী বুধবার রাত ১১টার দিকে রুমাকে আখাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসেন। সেখানেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দুই ছেলেসন্তানের জন্ম দেন রুমা আক্তার।

হাসপাতালের ধাত্রী (মিডওয়াইফ) তানিয়া আক্তার ও রোকসানা আক্তার বলেন, প্রসব করাতে গিয়ে দেখি টুইন বেবি। কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করানোয় প্রসূতি নারীরও বিষয়টি জানা ছিল না। সমস্যা দেখা দেয় যখন দেখা যায় ওই নারীর এক সন্তান গর্ভে উল্টো অবস্থায় আছে। আগে এক সন্তান স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হওয়ায় সৃষ্টিকর্তার কৃপায় ভালোভাবেই প্রসব করানো যায়। রাত ১১টা ১০ মিনিট ও ২০ মিনিটের সময় ওই  নারী দুই সন্তান প্রসব করেন।

হাসপাতালের সেবিকা সানজিদা মাহমুদ বলেন, মা ও শিশু দু’জনেই ভালো আছে। এক শিশুর ওজন কম হওয়ায় তাকে অবজারভেশনে রাখা হয়েছে। হাসপাতালের পক্ষ থেকে দুই সন্তানকে নতুন কাপড় দেওয়াসহ সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে।

চিকিৎসক নুরে সাবা বলেন, অসহায় ওই নারীর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রসব হওয়ায় আমি আনন্দিত। সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিক সহযোগিতায় এ কাজটি সহজে করা গেছে। এ জন্য তিনি সৃষ্টিকর্তার প্রতি শুকরিয়া আদায় করেন।

সুমি আক্তার নামে এক নারী বলেন, আমাকে মা ডাকে রুমা। বুধবার রাতে আমি একজনের জন্য ভাত নিয়ে যাওয়ার সময় তাকে কান্না করতে দেখি। তখন সে সমস্যা হচ্ছিল বলে জানায়। সঙ্গে সঙ্গেই তাকে আখাউড়া হাসপাতালে নিয়ে যাই। এখানে সকলের আন্তরিক সহযোগিতায় রুমা দুই ছেলেসন্তানের জন্ম দেয়।

রুমা আক্তার বলেন, মেয়েটাকে নিয়ে স্বামী চলে যাওয়ার পর স্টেশনে আশ্রয় নেই। ছোটবেলা থেকেই আমি বাবা-মা হারা। সৎমায়ের অত্যাচারে ঘর থেকে বের হয়ে যাই। আমাদের পাঁচ বোনের মধ্যে এক বোন মারা গেছে। বাকিদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই।

তিনি জানান, নবজাতকদের নিয়ে কোথায় যাবেন সেটা জানেন না। সবাই মিলে যেন অন্তত একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেন সেই অনুরোধ করেন রুমা আক্তার।

হাসপাতালের চিকিৎসকের পরামর্শে সন্তানদের নাম হাসান ও হোসেন রেখেছেন বলে জানান।

আখাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিমেল খান বলেন, হাসপাতাল থেকে ওই নারী ও নবজাতকদের সব ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে। সবাই আন্তরিকভাবে অসহায় ওই নারী ও তার সন্তানদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।



সাতদিনের সেরা