kalerkantho

মঙ্গলবার। ৯ আগস্ট ২০২২ । ২৫ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১০ মহররম ১৪৪৪

নেমেছে বন্যার পানি, জেগে উঠছে ক্ষত

কুদ্দুস বিশ্বাস, কুড়িগ্রাম (আঞ্চলিক)   

২৮ জুন, ২০২২ ২০:১৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নেমেছে বন্যার পানি, জেগে উঠছে ক্ষত

‘সাত দিন ভইরা ঘর বানের পানিতে ডুইবা আছিল। মাইনসের বাইত্তে আশ্রয় নিয়ে থাকছি। ঘরে যেটুকু চাইল আছিল তা সাত দিন বইসা খাইছি। পানি নাইমা গেছে; কিন্তুক ঘরের বারোটা বাইজা গেছে।

বিজ্ঞাপন

একটা ঘর বানের স্রোতে ভাইসা গেছে। আরেক ঘরের হোলার (পাটখড়ি) বেড়ায় বানের কাদামাটিতে পইচা গেছে। এহন নতুন করে একটা ঘর তোলা নাগব। আরেক ঘরের বেড়া ঠিক করতে যে ট্যাহা নাগব তা পামু কটাই?’ কথাগুলো বলছিলেন বন্যার ছোবলে তছনছ হওয়া স্বামীহারা মনোয়ারা বেগম (৫০)।

আজ মঙ্গলবার সরেজমিনে রাজীবপুর উপজেলার শংকর মাধবপুর বিলপাড়া চরে গিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। বন্যায় ওই চর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চরের প্রায় অর্ধশত দিনমজুর পরিবারের সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকের ঘর বন্যার স্রোতে ভেসে গেছে আবার অনেকের ঘরবাড়ি নদে বিলীন হয়ে গেছে। পানি নামছে আর বন্যার ক্ষতচিহ্নগুলো ভেসে উঠছে। চরের প্রায় ৪০০ মানুষের মাঝে এখন খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে।

মনোয়ারা বেগম আরো বলেন, ‘এহন কী খামু তার কোনো জো নেই। কামাই-রোজগার নাই। কাইলকা এক কেজি চাইল কর্জ নিছিলাম। এক পোয়ার মতো আছে। এই যে পাটের শাক তুলছি তা দিয়া আইতে খামু। আগামীকাল কী খামু তা জানি না। মাইনসের কাছে হুনি সরকার বানভাসিদের ত্রাণ দিছে, সাহায্য করছে। আমরা তো পাইলাম না। আমগর চরের সকল বাড়িঘর ডুইবা গেছিল। ’

রাজীবপুর উপজেলার কোদালকাটি ইউনিয়নের শংকর মাধবপুর বিলপাড়া গ্রামের আব্দুল লতিফের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম। ২০ বছর আগে কুমিল্লায় কাজ করতে যাওয়ার পর আর ফিরে আসেননি তার স্বামী। কোথায় আছেন, নাকি মরে গেছেন তাও জানেন না। তার ঘরে একমাত্র পুত্রসন্তান হাফিজুর রহমান ঢাকায় রিকশা চালান। বাড়িতে ছেলের বউ ও নাতি আতিক হাসান (৮) নিয়ে মনোয়ারা বেগমের সংসার। মানুষের বাড়িতে ও রাস্তায় মাটি কাটার কামলা দেন মনোয়ারা বেগম। সঙ্গে ছেলে রিকশা চালিয়ে যা টাকা পাঠান তা দিয়ে তাদের সংসারের খরচ চলে। কিন্তু এবারের বন্যায় সব কিছু ওলটপালট হয়ে গেছে তাদের। একটানা সাত দিন বন্যার পানিতে ঘর ডুবে ছিল।

একই চরের জহুরা বেগমের (৫৫) একটিমাত্র ঘর ব্রহ্মপুত্র নদে বিলীন হয়ে গেছে। পানি কমে যাওয়ার সময় নদের ভাঙনে হারিয়ে যায় ভিটেমাটিও। মানুষের সহযোগিতা নিয়ে কোনো রকমে ঘরের চালা উদ্ধার করতে পেরেছিলেন তিনি। ঘরের বেড়া, খাম খোটা ও অন্যান্য জিনিসপত্র হারিয়ে গেছে নদের পানিতে। বিলীন হওয়ার পর ঘরের চালা নিয়ে পার্শ্ববর্তী চরে রাখেন। সেখানে খোলা জায়গায় অবস্থান করছেন জহুরা বেগম। ঘরে খাবার নেই, কাছে টাকা নেই। খাবার জোগাড়ে মাঠে নামবেন না ঘর তোলার খরচ জোগাবেন―এমন চিন্তা করে দু’চোখে অন্ধকার দেখছেন তিনি।

জহুরা বেগম বলেন, ‘বানের পানিতে ঘর ডুইবা ছিল ১০ দিনের মতো। মাইনসের বাইত্তে আশ্রয় নিয়েছিলাম। যহন পানি কমতে শুরু করছে তহন একজন কইল নদীতে তোমার ঘর ভাইঙ্গা যাইতেছে। তাড়াহুড়ো করে যাইয়া দেহি ভিটিমাটি গেছে, ঘরও যাওনের মুখে। চিৎকার শুরু করলে মাইনসে আইসা খালি ঘরের চালাটা সরাবার পাইছে। চোহের সামনে সব কিছু হারায় গেল নদীতে। স্বামী আমার অসুস্থ। চলাফেরা করবার পারে না। তাকে ধইরা নিয়া হাকামোতা করণ নাগে। এবারের বানে আমার ঘরবাড়ি সবই গেল। ’

তিনি আরো বলেন, ‘এহন ঘরে খাবার নাই। মাইনসের কাছে ধারকর্জ কইরা কয় দিন টেকা যায়। তাও চরের সবার ঘরেই অভাব। ধারকর্জ দিব কেরা? খাইয়া না খাইয়া দিন-রাত যায় আমগর। বানের পানিতে দুই দিন এক বেলা খাইয়া ছিলাম। কেউ আমগর খোঁজখবর নেয় নাই। কোনো সাহায্য-সহযোগিতাও পাই নাই। নতুন খরে ঘর তোলা নাগব। খাম খোটা বেড়া ও কামলা খরচ নাই। কোন দিন ট্যাহা জোগাবার পারব, তত দিন খোলা আকাশের নিচেই থাকা নাগব। আমগর মতো গরিব বানভাসিদের কষ্ট করে বাঁচা ছাড়া কোনো উপায় নাই। মেম্বার-চেয়ারম্যান ত্রাণ দিব তাগরে চেনা মানুষদের। দ্যাশের প্রধানমন্ত্রীকে কইয়েন আমগর কষ্টের কথা। ’



সাতদিনের সেরা