kalerkantho

শনিবার । ২ জুলাই ২০২২ । ১৮ আষাঢ় ১৪২৯ । ২ জিলহজ ১৪৪৩

কনটেইনার ডিপোগুলো নিয়ম-নীতি মানে না

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

১৫ জুন, ২০২২ ১৬:১৪ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



কনটেইনার ডিপোগুলো নিয়ম-নীতি মানে না

চট্টগ্রামে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা ১৯টি কনটেইনার ডিপোতে নিয়মের বালাই নেই, নিয়ম মানার প্রবণতাও নেই। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বন্দর উপদেষ্টা কমিটি, চেম্বার, পোর্ট ইউজার্স ফোরামসহ সব বৈঠকে ডিপোগুলোর অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার অভিযোগের বিষয়ে ব্যবহারকারী সংস্থা, এমনকি জনপ্রতিনিধিরা সোচ্চার হলেও কোনো অভিযোগকে তোয়াক্কা করেননি ডিপো মালিকরা। বিভিন্ন ফোরামে আসা অভিযোগগুলো তদন্তের জন্য মন্ত্রী, এমপি, জনপ্রতিনিধিরা চাপ দিলেও সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের দোহাই দিয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁরা পার পেয়ে গেছেন।

বিএম কনটেইনার ডিপোর ‘অব্যবস্থাপনার কারণে’ ভয়াবহ বিস্ফোরণে ব্যাপক প্রাণহানির পর বেসরকারি কনটেইনার ডিপো মালিকরা এই প্রথম চাপে পড়েছেন।

বিজ্ঞাপন

তাঁদের অব্যবস্থাপনার চিত্র উঠে আসছে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রাথমিক তদন্তে।

বেসরকারি ১৯টি কনটেইনার ডিপোতে যে নিয়ম মানা হয় না, তার বড় প্রমাণ মিলেছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন এই সংস্থা ২০২১ সালে পরিদর্শন করে গত মার্চে প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে শুধু বিএম কনটেইনার ডিপোতেই ব্যাপক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, অনুমোদনবিহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্সসহ ১৭টি অনিয়ম খুঁজে পায়। এর মধ্যে নকশাবিহীন স্থাপনা নির্মাণ, আগুন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকা, বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রতিষ্ঠানের সনদ না থাকা, পরিবেশ দপ্তর, জেলা প্রশাসন, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের লাইসেন্স ছাড়াই পরিচালনা অন্যতম।

প্রতিবেদনে বিএম ডিপো সর্বমোট ১০২ সূচকের মধ্যে ৩৪ পয়েন্ট পেয়েছে, শতাংশের হিসাবে তা ৩৩। অথচ বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোর মধ্যে দেশি-বিদেশি যৌথ বিনিয়োগে গড়ে ওঠা একমাত্র প্রতিষ্ঠান হলো বিএম কনটেইনার ডিপো। বাংলাদেশ-নেদারল্যান্ডসের বেসরকারি খাতে বড় বিনিয়োগে সর্বশেষ গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানের যদি এই হাল হয়, তাহলে অন্যগুলোর কী অবস্থা তা অনুমেয়।

বিডার পরিদর্শন প্রতিবেদনে অন্তত অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত, দক্ষ প্রশিক্ষিত জনবল, লাইসেন্স অনুমোদন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতের তাগাদা দিয়ে ১৭টি সুপারিশ করা হয়। সেগুলো বাস্তবায়নের সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়, কিন্তু সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি।

পরিদর্শন কমিটির সদস্যসচিব মাহমুদুল হাসান এখন বদলি হয়ে ঢাকায় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের ল্যাব ইন্সপেক্টর। গতকাল মঙ্গলবার তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা যে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা পেয়েছিলাম, সেগুলো উত্তরণে সুপারিশও দিয়েছিলাম। সেগুলো যথাযথভাবে মানা হলে এত বড় ক্ষয়ক্ষতি হতো না। এত প্রাণহানি হতো না। ’ তিনি বলেন, ‘আমরা তখন মোট তিনটি ডিপোর ওপর এ ধরনের প্রতিবেদন দিয়েছিলাম। সেগুলোর সুপারিশ মানা হয়েছে কি না তদারকি সংস্থা বিডা বলতে পারবে। ’

বিপজ্জনক রাসায়নিক বা পণ্য রাখার ব্যবস্থা নেই

বিপজ্জনক রাসায়নিক বা পণ্য কনটেইনার ডিপোতে রাখার জন্য আইএমডিজি কোড মানতে হয়। ডিপো পরিচালনার শর্তেও এই কোড মানার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থার ‘ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ডেঞ্জারাস গুডস’ বা ‘আইএমডিজি কোড’ অনুযায়ী হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড বিপজ্জনক পণ্যগুলোর একটি। কিন্তু শর্ত মানা তো দূরে থাক, রাসায়নিক ও সাধারণ পণ্য বা পোশাক পণ্য একসঙ্গেই রাখা হয়। এতেই বিস্ফোরণের মাত্রা ব্যাপকতা পায়।

২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থা বাংলাদেশে এই কোড বাস্তবায়নে ঘাটতির কথা জানিয়েছিল নৌপরিবহন অধিদপ্তরকে। এ জন্য নৌ সংস্থা তদারকি কমিটি গঠন করে এর বাস্তবায়ন করার সুপারিশ করেছিল অধিদপ্তরকে; কিন্তু গত পাঁচ বছরেও এসবের কোনো কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। শুধু বিএম ডিপো নয়, ১৯টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপোর কারোরই এসব রাসায়নিক নিরাপদে রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই।

আইএমডিজি কোড অনুযায়ী, কোনো দুর্ঘটনার পরপরই বিপজ্জনক পণ্য আগে সরিয়ে ফেলার নির্দেশনা রয়েছে। এই কোড বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষণের কথাও বলা আছে। বিপজ্জনক পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে সংরক্ষণে কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে, সেটি বলা আছে আইএমডিজি কোডে।

তদারককারী সংস্থাগুলো তদারক করেনি কেন?

কনটেইনার ডিপো পরিচালনা নীতিমালায় লাইসেন্স অনুমোদন দেয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। আর বন্ড প্রতিষ্ঠান হিসেবে পণ্যের তদারক করে রাজস্ব বোর্ড প্রতিনিধি হিসেবে চট্টগ্রাম কাস্টমস। এই দুই সংস্থার মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতার সুযোগ পুরোপুরিভাবে লুফে নিচ্ছে কনটেইনার ডিপোগুলো। ফলে কখনো বন্দর, কখনো কাস্টমস পৃথকভাবে তদারকির উদ্যোগ নিলেও তদবিরের কারণে শেষ পর্যন্ত সুফল মেলেনি।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের এক শীর্ষ কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা প্রায়ই ডিপোর অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা চিহ্নিত করি। কারণ দর্শানো নোটিশ দিই, কিন্তু অদৃশ্য কারণে আর সামনে এগোনো যায় না। শাস্তি পর্যন্ত নিশ্চিত করা যায়নি কখনো। নিখুঁত তদারকির জন্য অদৃশ্য কারণের পাশাপাশি আমাদের লোকবল স্বল্পতাও একটা বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ’

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা শুধু বন্দরের অধীন অংশটিই দেখভাল করি। এখন পর্যন্ত সেগুলোতে কোনো ত্রুটি পাইনি। এখন থেকে আমরা আরো নিবিড় তদারকির মধ্যে যাব। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। ’ তিনি বলেন, ‘ডিপোর খুঁটিনাটি বিষয় তদারকির ক্ষমতা বেশি কাস্টমসের। আমাদের সেখানে সার্বক্ষণিক জনবল থাকে না। স্থায়ী অফিস জনবল থাকে কাস্টমসে। ফলে তাদেরই বেশি নজর দিতে হবে। ’

একতরফা মাসুল বৃদ্ধি

কনটেইনার ডিপো পরিচালনা নীতিমালায় মাসুল বাড়াতে হলে তদারকি বা লাইসেন্স প্রদানকারী সংস্থাকে অবহিত করা ও অনুমোদনের প্রয়োজন হয়; কিন্তু ডিপো মালিকরা কখনোই মাসুল বাড়ানোর ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলা দূরে থাক, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার অনুমোদনের তোয়াক্কা করেনি। সর্বশেষ ২০২১ সালের নভেম্বরে এক লাফে ২৩ শতাংশ মাসুল বাড়ান কনটেইনার ডিপো মালিকরা। বাড়তি মাসুল না দিলে পণ্য ডিপোতে না নেওয়ার হুমকিও দেন তাঁরা। তখনো একতরফা মাসুল বাড়ানোর প্রতিবাদ করে গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও শিপিং লাইনগুলো; কিন্তু সুফল মেলেনি।

সরানো হয়নি ডিপো, উল্টো নতুন ডিপোর অনুমোদন

চট্টগ্রাম শহর ঘিরে ব্যাপক যানজটের অন্যতম কারণ শহরের মধ্যেই পরিকল্পনাহীনভাবে গড়ে ওঠা বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলো। এসব ডিপো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে গড়ে না ওঠার কারণে দুর্ঘটনাও বেড়েছে, শহরের সড়কগুলোর স্থায়িত্ব দ্রুত নষ্ট হয়ে চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এসব সমাধান করতে চট্টগ্রাম বন্দর উপদেষ্টা কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয় ২০ কিলোমিটারের মধ্যে ডিপো সরিয়ে নেওয়া এবং নতুন ডিপোর অনুমোদন বন্ধ রাখার, কিন্তু সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। উল্টো দুটি নতুন কনটেইনার ডিপোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ২০ কিলোমিটারের মধ্যেই।

সড়কজুড়ে পার্কিং করে রেখেছে ডিপোগুলো

নগরজুড়ে থাকা এই ডিপোগুলোর সামনেই ভয়াবহ যানজট তৈরি হয়। ডিপোতে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান লরিগুলো গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দখল করে রাখে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরমুখী যাত্রীদের চলাচলের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ডিপোগুলোর ‘রাজত্ব’। বিমানবন্দর সড়কের ১৫ নম্বর গেটের আগে ইনকনট্রেড ডিপো যেভাবে সড়কের এক পাশ দখল করে রাখে, মনে হয় তাদের নিজস্ব গাড়ি পার্কিং। আর বিমানবন্দরমুখী কাঠগড় থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত সড়কটির দুই পাশ প্রায়ই দখল করে রাখে ডিপোর গাড়িগুলো। ফলে সড়কটি দিয়ে স্থানীয় অধিবাসী ছাড়া কেউ এখন চলাচল করে না। এখন ডিপোগুলোর নতুন উৎপাত শুরু হয়েছে পতেঙ্গা সাগরপার ঘিরে গড়ে ওঠা দৃষ্টিনন্দন চার লেনের আউটার রিং রোড। নতুন এই সড়কটি বিমানবন্দরগামী যাত্রীরা দ্রুত চলাচলের জন্য বেছে নিলেও সেটিও দখলে গেছে ডিপোর গাড়িগুলোর। এসব গাড়ি প্রধান সড়ক দখল করে রাখায় এবং অত্যন্ত বেপরোয়া গতির কারণে এখন পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে আসা পর্যটকরাও নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে।

বন্দর উপদেষ্টা কমিটির সভায় সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়, সিদ্ধান্ত আসে। থানায় নতুন ওসি যোগদান করেন, কিছু কড়াকড়ি চলে। এরপর সব আগের মতোই।

ডিপো মালিকদের সংগঠন কী বলছে

কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডা সভাপতি নুরুল কাইয়ুম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘৩৭ ধরনের আমদানি পণ্য ছাড় ছাড়াও এখন শতভাগ পণ্য রপ্তানি ১৯টি ডিপোর মাধ্যমেই হচ্ছে। এর ফলে আমরা ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। এত বছর ধরে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। এখন হঠাৎ এত বড় দুর্ঘটনা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। এখন আমাদের ভুলত্রুটিগুলো সামনে চলে এসেছে। আমরা ভুলগুলো চিহ্নিত করে সামনে এগোনোর কাজ করতে চাই। এ জন্য তদারকি সংস্থার পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট সাজেশন নীতিমালায় অন্তর্ভুক্তি দরকার। ’

তিনি বলেন, ‘১৫ বছর ধরে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রপ্তানি হচ্ছে, কিন্তু কখনো বিস্ফোরণ ঘটেনি। তার পরও আমি বলব, এখানে নিরাপত্তার ঘাটতি ছিল। এতগুলো দেশি-বিদেশি সংস্থার নিরাপত্তা সনদ, লাইসেন্স নেওয়ার পরও আমাদের জানার ঘাটতি ছিল। আমরা সেগুলোর উত্তরণ ঘটিয়ে এগিয়ে যাব। ’

গত সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী নুরুল কাইয়ুম খান বলেন, ‘নীতিমালায় ডেঞ্জারাস কার্গো মজুদে পৃথক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিতের জন্য যদি একটি নির্দিষ্ট স্থান পৃথকভাবে বরাদ্দ রাখার সুপারিশ আসে, আমরা সবাই সেটি মানতে বাধ্য। কেউ যদি মনে করে শুধু সাধারণ পণ্য রাখবে, তাহলে তাদেরও সুযোগ দিতে হবে। ’

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে শহরের ২০ কিলোমিটারের মধ্যে বর্তমান ডিপো স্থানান্তর এবং নতুন ডিপো স্থাপন নিয়ে কাইয়ুম খান বলেন, এখানে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দুটি পৃথক শর্ত দেওয়া হয়েছে। ফলে কনফিউশন আছে।



সাতদিনের সেরা