kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

প্রণীলা তাদের আশার আলো

শ্রীবরদী (শেরপুর) প্রতিনিধি    

২৪ মে, ২০২২ ১৭:০৯ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রণীলা তাদের আশার আলো

'আমার যহন পরথম সন্তান আয়ে তহন চিকিৎসা অয় নাই। ধাত্রীও পাই নাই। এর লাইগা সন্তান প্রসবের সময় মইরা গেছে। অহন গর্ভবতী হওনের পর থাইকা প্রণীলা আপা খোঁজ-খবর নেয়।

বিজ্ঞাপন

শরীর খারাপ অইলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে কয়। প্রণীলা আপা আইয়া আমগোর ভালা অইছে। ' কথাগুলো বলছিলেন শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তবর্তী দিঘলাকোনা গ্রামের প্রথম সন্তান হারানো গৃহবধূ শেফালী বেগম। একই গ্রামের উপকারভোগী প্রীতি মারাক বলেন, প্রণীলা আমগোর গেরামের মেলা মাইয়ার সন্তান প্রসব করাইছে। মায়েরাও ভালা আছে। সন্তানরাও ভালাই আছে। কোনো অসুবিধা অয় নাই। গর্ভবতী মায়েগোর প্রণীলাই ভরসা।

আজ মঙ্গলবার (২৪ মে) সরেজমিন ঘুরে ভুক্তভোগী, সুবিধাভোগী, স্থানীয় লোকজন ও  হাসপাতালের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে উঠে আসে এসব তথ্য।  

স্থানীয়রা জানান, গারো পাহাড় অধ্যুষিত এলাকায় প্রশিক্ষত ধাত্রী দিঘলাকোনা গ্রামের প্রণীলা ম্রং। হতদরিদ্র পরিবারের এই নারী এসএসসি পাস করলেও অর্থের অভাবে পড়ালেখায় আর এগোতে পারেননি। এখানকার দিঘলাকোনা, দার্শিকোনা, হারিয়াকোনা, বাবেলাকোনা, লাউচাপড়া ও বালিঝুড়ি গ্রামসহ আশপাশের পাহাড়ি গ্রামগুলো উপজেলা শহর থেকে ৩০-৩৫ কিলোমিটার দূরে। যাতায়াত ব্যবস্থাও নাজুক। স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত ওইসব গ্রামের অন্তঃসত্ত্বা নারীরা এক সময় দিন কাটাতেন আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায়। প্রায় ৯ মাস আগে প্রণীলা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কারিতাসের সমাজ পরিচালিত স্থায়িত্বশীল জীবিকায়ন ও সহনশীলতা কর্মসূচির আওতায় মিড ওয়াইফ রুরাল প্রশিক্ষণ নেন। এরপর থেকেই সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি নারীদের নরমাল ডেলিভারিতে সহায়তা করে যাচ্ছেন তিনি। ধীরে ধীরে তিনি স্থানীয়দের কাছে হয়ে ওঠেন আস্থার নতুন ঠিকানা।  

প্রণীলা ম্রং জানালেন, এখন প্রসূতী মায়েরা সরাসরি কিংবা মুঠোফোনে কথা বলে সমাধান পাচ্ছেন। ওইসব মায়েদের বুকে ফুটফুটে শিশু তুলে দেওয়াই তার বড় প্রাপ্তি। তিনি বলেন, আমি আগে গৃহিনী ছিলাম। পরে মিড ওয়াইফ রুরাল প্রশিক্ষণ নিয়েছি। এরপর থেকেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করি। কোনো সমস্যা থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে বলি। আমি কোনো কাজে পারিশ্রমিক চাই না। কেউ ইচ্ছে করে যা দেয় তা নিয়েই সন্তুষ্ট। আমি বিনা পারিশ্রমিকে সারাজীবন নারীদের সুস্থভাবে সন্তান প্রসবে সহায়তা করে যেতে চাই।  

প্রতিবেশী অঞ্জলী ম্রং বলেন,  এই পাহাড়ি গ্রামের কোনো প্রসূতী মা সমস্যায় পড়লে সহজে শহরে গিয়ে চিকিৎসাসেবা নিতে পারে না। এখন প্রণীলাই আমাদের আশার আলো।

কারিতাসের সমাজ পরিচালিত স্থায়িত্বশীল জীবিকায়ন ও সহনশীলতা কর্মসূচির মাঠ কর্মকর্তা সুরঞ্জন রাকসাম বলেন, পাহাড়ি গ্রামগুলোর যাতায়াতব্যবস্থা ভালো না। গর্ভবর্তী নারীরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন। এজন্য আমরা প্রণীলাকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দেই। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন।  

দিঘলাকোনা মিশনের ফাদার ডমিনিক সরকার বলেন, পাহাড়ি গ্রামগুলোতে কোনো ক্লিনিক নেই। গর্ভবতীরা সমস্যায় পড়লে প্রাথমিক চিকিৎসা করানোর মতো কোনো লোক নেই। প্রণীলা প্রশিক্ষণ নিয়ে ভালো কাজ করে যাচ্ছে। এখন প্রণীলা পাহাড়ি প্রসূতি মায়েদের ভরসার প্রতীক।  

এ ধাত্রীর জন্য সহযোগীতার হাত সব সময় খোলা থাকবে বলে জানিয়েছেন শ্রীবরদী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাদিয়া তানজিন আফরিন। তিনি বলেন, ওই নারী পারিশ্রমিক নেন না, স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছেন। এটা ভালো। তার প্রশংসা করতে হয়। আমাদের কাছে সহযোগিতা চাইলে আমরা সহযোগিতা করবো। তবে আমি বলবো, প্রসূতিরা যেন হাসপাতালের শরণাপন্ন হন। কারণ হাসপাতালে সবসময় নার্স, ডাক্তার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ রয়েছে। যেকোনো সমস্যা হলে আমরা তার চিকিৎসা করতে পারবো। আশঙ্কাজনক হলে আরো উন্নত জায়গায় রেফার করতে পারবো।  

এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে গর্ভবতী নারীদের পাশে প্রণীলার মতো আরো প্রশিক্ষিত মেয়েরা এসে দাঁড়াবে এমনটাই প্রত্যাশা করছেন ভুক্তভোগী পরিবারসহ স্থানীয় বাসিন্দারা।



সাতদিনের সেরা