kalerkantho

সোমবার । ২৭ জুন ২০২২ । ১৩ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৬ জিলকদ ১৪৪৩

‘মুল্লুকে চলো’র ১০১ বছর : বঞ্চনা ফুরায়নি চা শ্রমিকদের

নাসরুল আনোয়ার, হাওরাঞ্চল   

২১ মে, ২০২২ ১৬:০৭ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



‘মুল্লুকে চলো’র ১০১ বছর : বঞ্চনা ফুরায়নি চা শ্রমিকদের

চা শ্রমিকদের বঞ্চনার ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় ‘মুল্লুকে চলো’। ১৯২১ সালের ২০ মে গভীর রাতে শ্রমিকের রক্তঝরা এ দিবসের ১০১ বছর পূর্ণ হয়েছে শুক্রবার। এই দীর্ঘ সময় ধরে চা শ্রমিকরা অধিকার আদায়ের আন্দোলন চালিয়ে গেলেও তাদের বঞ্চনার অবসান হয়নি। ফুরায়নি মানবেতর জীবনের দিনযাপন।

বিজ্ঞাপন

এ আন্দোলনের ১০১ বছর উপলক্ষে সমগীত আয়োজন করে ‘মুল্লুকে চলো আন্দোলনের ১০১ বছর―চা শ্রমিকদের বঞ্চনা ও সংগ্রামের ইতিহাস’ শীর্ষক আলোচনার। ঢাকার পরীবারের সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে শুক্রবার সন্ধ্যায় আয়োজিত আলোচনাসভায় বক্তব্য দেন অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ, শিল্পী কফিল আহমেদ, শিল্পী-সংগঠক অমল আকাশ প্রমুখ।

আনু মুহাম্মদ এই ঐতিহাসিক আন্দোলন নিয়ে আলোচনার আয়োজন করায় এবং তরুণদের যুক্ত করায় সমগীতকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘পুঁজির বিকাশের পেছনে নিপীড়নের ভয়ংকর ইতিহাস থাকে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য বিদ্যায়তনেও এগুলোকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা থাকে। দেশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কেমন করে অর্থনৈতিক মানোন্নয়ন সম্ভব বা প্রযুক্তিকে সেই কাজে কিভাবে ব্যবহার করা যায় সেদিকে নীতিনির্ধারকদের কোনো আগ্রহ নেই। ’

তিনি সারা পৃথিবীর মাইগ্রেটেড শ্রমিকদের নিপীড়নের চিত্র ও সর্বপ্রাণের অধিকার আদায়ের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষা করে। জনজীবন উন্নয়নের সাথে জড়িত কোনো গবেষণা বা প্রকল্প তারা জনসম্মুখে আনে না। ' তিনি চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে অধিকার আদায়ের চলমান লড়াইয়ের সাথে সংহতি প্রকাশ করেন।

শিল্পী অমল আকাশ বলেন, ‘‘এতগুলো বছর এ দেশে কাটিয়েও চা শ্রমিকরা এ দেশের ভূমিকে নিজের ভূমি বলে ভাবতে পারছে না। কারণ তারা জানে, আজকে কাজ চলে গেলে কাল সে ভূমি থেকে বিতাড়িত হবে। এদের ট্রেড ইউনিয়ন নেই, মজুরি এখনো যেকোনো শ্রম খাতের চেয়ে সর্বনিম্ন। এটাই এখন তার ‘মুল্লুক’। আমাদের সবাইকে এই বঞ্চিত জীবনের দায় নিতে হবে এবং তার ন্যায্য অধিকার দিতে হবে। ’’

আলোচনা পর্বের শেষে গান পরিবেশন করেন গানের দল সমগীত, লীলা ব্যান্ড এবং শিল্পী কফিল আহমেদ।

বঞ্চনার ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ব্রিটিশ চা মালিকরা ভারতবর্ষের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে উন্নত জীবনের লোভ দেখিয়ে নিজেদের ভূমি ছাড়িয়ে আসাম-বাংলা অঞ্চলের চা বাগানগুলোতে নিয়ে এসেছিলেন। বিনিময়ে তারা পেয়েছেন সীমাহীন নির্যাতন, নিপীড়ন। এই দুঃসহ জীবন থেকে মুক্তির আশায় ১০১ বছর আগে অবিভক্ত আসাম-বাংলা অঞ্চলের চা শ্রমিকরা যখন নিজের ভূমিতে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন, মালিকরা ফেরার সব পথ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তাদের কাছে রেলের টিকিট বিক্রি করা হয়নি। এমনকি রেলে উঠতেও দেওয়া হয়নি।

এরপর তারা নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য রেলপথ ধরে প্রায় ১৭ দিন হেঁটে চাঁদপুর জাহাজঘাটায় পৌঁছলে ১৯২১ সালের ২০ মে গভীর রাতে ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনী শত শত ঘুমন্ত চা শ্রমিককে গুলি করে হত্যা করে বেয়নেট দিয়ে পেট চিরে মেঘনা নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিল। ওই ঘটনার পর নিজের ভূমিতে অনেকেই ফিরে যেতে পেরেছিলেন। আটকে যাওয়া শ্রমিকরা নানা বৈষম্যের বেড়াজালে পড়ে আছেন এবং এখনো ‘মানুষ’ হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকারটুকু ফিরে পাননি।



সাতদিনের সেরা