kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

কুমিল্লা সিটি নির্বাচন

সাক্কু-কায়সারকে নিয়ে বিপাকে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা

আবদুর রহমান, কুমিল্লা   

২১ মে, ২০২২ ০২:৪১ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সাক্কু-কায়সারকে নিয়ে বিপাকে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা

২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) প্রথম নির্বাচনে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে নাগরিক সমাজের ব্যানারে একবার এবং ২০১৭ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির মনোনয়নে ধানের শীষ প্রতীকে দ্বিতীয়বার মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপি নেতা মনিরুল হক সাক্কু। ওই দুটি নির্বাচনে সাক্কুর ভোটের ব্যবধানও ছিল বিপুল। বিএনপি এবার নির্বাচনে না যাওয়ায় আগামী ১৫ জুনের কুসিক নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়তে মাঠে রয়েছেন সাক্কু।

বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন, কুমিল্লা নগরীতে বরাবরই বিএনপির ভোট বেশি।

বিজ্ঞাপন

এ কারণে পর পর দুবার নির্বাচনে সাক্কু বিশাল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। ওই দুটি নির্বাচনে সাক্কুর বিরুদ্ধে বিএনপির অন্য কোনো প্রার্থী মাঠে ছিলেন না। তবে এবার মাঠে রয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা নিজাম উদ্দিন কায়সার। বিএনপির এই দুই নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে মাঠে থাকায় তফসিল ঘোষণার পর বিপাকে পড়েছেন দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীরা। আবার সাক্কুর সঙ্গে কায়সারের রাজনৈতিক বিরোধ দীর্ঘদিনের। এ কারণে অনেকে মনে করছেন, এবার কায়সার নির্বাচনী মাঠে নেমেছেন মূলত সাক্কুকে ঠেকাতে।

মনিরুল হক সাক্কু কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। আর কায়সার কুমিল্লা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। গত বৃহস্পতিবার দুজনেরই মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং অফিসার। এরপর ওই দিন দুপুরে কায়সার এবং সন্ধ্যায় সাক্কু দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এতেও শেষ রক্ষা হয়নি। বৃহস্পতিবার রাতে পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সাক্কু ও কায়সারকে দল থেকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় বিএনপি ও স্বেচ্ছাসেবক দল। এর মধ্যে সাক্কুকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়।

পরে কেন্দ্রীয় বিএনপি ও স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া হয় সাক্কু-কায়সারের পক্ষে কেউ যেন নির্বাচনী মাঠে কাজ না করেন।

কেন্দ্রের নির্দেশে কুসিক নির্বাচন নিয়ে হার্ডলাইনে কুমিল্লা বিএনপির নেতারা। তাঁরা এরই মধ্যে দলের নেতাকর্মীদের নির্বাচন থেকে দূরে থাকতে বলতে শুরু করেছেন।

কুমিল্লা নগরীতে এই দুই নেতার অনেক অনুসারী রয়েছেন। তৃণমূলেও এই দুজনের জনপ্রিয়তা কম নয়। ফলে এবারের নির্বাচনে এই দুই নেতাকে নিয়ে বিপাকে পড়েছেন দলের নেতাকর্মীরা। নেতাকর্মীদের ভয়—নির্বাচনী মাঠে তাঁরা যদি নামেন তাহলে নিজেদের ওপর নেমে আসতে পারে বিপদ। এ নিয়ে বেশি বিপাকে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা। অবশ্য বিএনপির বহিষ্কৃত এই দুই মেয়র প্রার্থীর দাবি, পদ-পদবিধারী নেতারা মাঠে না নামলেও তৃণমূলের কর্মীরা তাঁদের জেতাতে মাঠে নামবেন। জয়ের ব্যাপারে এই দুজনই আশাবাদী।

দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ও মহানগর বিএনপি দুই ধারায় বিভক্ত। এক পক্ষে রয়েছেন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় বিএনপির ত্রাণ ও পুনর্বাসনবিষয়ক সম্পাদক হাজি  আমিন উর রশিদ ইয়াছিন। আরেক পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাক্কু। বিএনপির এই দুই নেতার বিরোধ অনেকটা প্রকাশ্যে। এবার কুসিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা নিজাম উদ্দিন কায়সার বিএনপি নেতা হাজি  আমিন উর রশিদ ইয়াছিনের শ্যালক।

নগরীর কান্দিপাড় এলাকার বাসিন্দা বিএনপির তৃণমূল কর্মী ফয়েজ উল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কুমিল্লা সিটি মেয়রের পদটি বিএনপির। আমরা চাই স্বতন্ত্রভাবে লড়লেও বিএনপির কেউ এই চেয়ারে বসুক। যদিও এবার নির্বাচন নিয়ে হার্ডলাইনে বিএনপি নেতারা। তাঁরা এরই মধ্যে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেছেন। এ কারণে তৃণমূল কর্মীরা আতঙ্কে। কারণ অনেক কর্মী দলের জন্য কাজ করেন ভালো একটি পদে যেতে। এবার মনে হচ্ছে তৃণমূল কর্মীরা দুই প্রার্থীর কারো পক্ষে মাঠে নামলে বিপদে পড়তে হবে। ’

নগরীর ছোটরা এলাকার বিএনপি কর্মী মাহাবুব আলম বলেন, ‘একে তো বিএনপির দুই গ্রুপ নির্বাচনী মাঠে মুখোমুখি অবস্থানে। তার ওপর দলের পক্ষ থেকে যেসব বিধি-নিষেধ দেওয়া হচ্ছে, তাতে দলের কর্মীরা আতঙ্কে আছেন। এবার ১০৫টি কেন্দ্রে ভোট হবে। প্রার্থীদের পক্ষ থেকে প্রতিটি কেন্দ্র কমিটি করা হয়। এবার বিএনপির তৃণমূল কর্মীরা যদি কেন্দ্র কমিটির দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে তাঁদের বিপদে পড়ার আশঙ্কা বেশি। ’

জানতে চাইলে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক সরওয়ার জাহান ভূঁইয়া দোলন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপি এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না—এটা অনেক আগেরই ঘোষণা করা আছে। আর কুসিক নির্বাচন নিয়ে কেন্দ্র থেকে আমাদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পদ-পদবিধারী কোনো নেতার মাঠে নামার প্রশ্নই আসে না। আমরা তৃণমূল নেতাকর্মীদেরও নির্দেশনা দিচ্ছি নির্বাচনী মাঠে না নামতে। ’

মেয়র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দলকে বিব্রত করতে চাইনি বলেই পদত্যাগ করেছি। এর পরও দল আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। ২০১২ সালের নির্বাচনেও দল থেকে পদত্যাগ করে নির্বাচন করেছি। তখন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ভোটারদের কাছে গিয়ে আমাকে বিজয়ী করেছেন। ২০১৭ সালে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করায় দলের নেতারা আমার পক্ষে ছিলেন। ’ 

তিনি বলেন, ‘আমি ৪২ বছর ধরে রাজনীতি করি। কখনো নেতাদের ওপর নির্ভর করিনি। এ পর্যন্ত যত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছি প্রতিটি নির্বাচনে তৃণমূল কর্মীরাই আমার বিজয়ের চাবিকাঠি ছিলেন। আশা করছি অতীতের মতো এবারও তাঁরা আমার পক্ষে মাঠে থাকবেন। বিজয়ের ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী। ’

আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে বহিষ্কৃত নেতা নিজাম উদ্দিন কায়সার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যৌক্তিক কারণে দল এই নির্বাচন বর্জন করেছে। আমি দলের সম্মান রক্ষায় পদত্যাগ করেছি। এর পরও দল আমার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কুমিল্লার নির্যাতিত মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পরিবর্তন চায়। আমার দলের তৃণমূলের নেতাকর্মী ও নগরীর মানুষের অনুরোধে আমি এবার নির্বাচনী মাঠে। আমি চাই ভোটে বিজয়ী হয়ে কুমিল্লার নির্যাতিত মানুষের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। ’

তিনি বলেন, ‘আমি দলের আদর্শ নিয়েই মানুষের কাছে ভোট চাইব। তৃণমূল নেতাকর্মীদের জন্যই আমি এখন ভোটের মাঠে। আশা করছি তাঁরা আমাকে নিরাশ করবেন না। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিপুল ভোটে বিজয়ী হব ইনশাআল্লাহ।

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (কুমিল্লা বিভাগ) মোস্তাক মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় এরই মধ্যে দুই নেতার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর পরও যদি পদধারী কোনো নেতা এই দুই প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী মাঠে নামেন তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

রাবেয়ার দোয়া নিলেন সাক্কু

দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচনে মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করায় বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত মনিরুল হক সাক্কু দলটির নেত্রী বেগম রাবেয়া চৌধুরীর দোয়া নিয়েছেন। বেগম রাবেয়া চৌধুরী কেন্দ্রীয় বিএনপির সহসভাপতি ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি।

গতকাল শুক্রবার দুপুরে কুমিল্লা নগরীতে বেগম রাবেয়া চৌধুরীর বাসভবনে যান মনিরুল হক সাক্কু। এ সময় তাঁর সঙ্গে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি সাজ্জাদুল কবিরসহ কয়েকজন নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। পরে দোয়া চাইলে সাক্কুর মাথায় হাত বুলিয়ে দেন রাবেয়া।



সাতদিনের সেরা