kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

ইটভাটার ধোঁয়ায় স্বপ্ন শেষ কৃষকদের

মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি   

১৮ মে, ২০২২ ২১:২৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ইটভাটার ধোঁয়ায় স্বপ্ন শেষ কৃষকদের

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলায় কয়েকটি ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় প্রায় ১০০ একর জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনা ঘটেছে উপজেলার গোড়াই ইউনিয়নের মীর দেওহাটা, কদিম দেওহাটা, দেওহাটা মল্লিকপাড়া ও সারেংবাড়ি এলাকায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, ওই সব এলাকায় ১৫-২০টি ইটভাটা রয়েছে। এসব ইটভাটার চিমনির কালো ধোঁয়ার কারণে পাশের ক্ষেতের ধানগাছের পাতা লালচে ও বিবর্ণ হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

ধানের ছড়া শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পাশেই থাকা ঢ্যাঁড়স, ঝিঙ্গা, চালকুমড়া, শসা, ডাঁটাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজিও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া ইটভাটার ধোঁয়ার কারণে আশপাশের বাড়ির গাছে ফল ধরে না। ফল যা-ও আসে তা আবার ঝরে পড়ে এবং পচে নষ্ট হয় যায়।

স্থানীয় ব্যক্তিরা অভিযোগ করে, গোড়াই ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইসরাফিল সরকার (ডিবিএম), মীর দেওহাটা গ্রামের বাসিন্দা ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য আবদুল হাই (স্টাইল), মো. আমান উল্লাহ (এইচএসবি), সাবেক ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলী (এসএমবি-১), মো. শহিদুর রহমান (এসএমবি-২), ইব্রাহিম খলিল (আরইউবি), রিখিল চন্দ্র রাজবংশী (এনএসটি), ফজল মিয়া (এফবিসি), ইউসুল মিয়া (এইচবিসি), ফরিদ হোসেন (এমএসবি), উপজেলার গোড়াইল গ্রামের বাসিন্দা বিল্লাল হোসেন (আরবিসি), পৌর সদরের স্বপন মিয়ার (হাদী) ও সোহাগপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহিমের বহুরিয়া এলাকায় (এএনবি) ইটভাটার ধোঁয়ার কারণে জমির ফসল ও বিভিন্ন ফল গাছের এমন ক্ষতি হচ্ছে। এসব ইটভাটা যে জায়গায় অবস্থিত, সেখানে কমপক্ষে ২০০ একর জমিতে ধানের আবাদ হয়।

ইটভাটাগুলো চালুর পর থেকেই জমির ফসল নষ্ট হতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন কদিম দেওহাটা গ্রামের লাভলু মিয়া। তিনি বলেন, প্রতিবছর জমির আবাদকৃত ধান তাদের বছরের খোরাক। ধোঁয়ায় নষ্ট হওয়ায় এ বছর চাল কিনে খেতে হবে।

কদিম দেওহাটা গ্রামের সেচযন্ত্রের মালিক নুরুল ইসলাম জানান, তিনি প্রায় ৭০০ শতাংশ জমিতে পানি দিয়ে থাকেন। বোনার পর ধোঁয়ার কারণে চারাগাছের পাতা বিবর্ণ হতে থাকে। এ অবস্থায় ধানের চারা বড় হয়। কিন্তু এক সপ্তাহ ধরে পাতার রং দেখে মনে হয় পুড়ে গেছে। ধানের ছড়া শুকিয়ে নষ্ট হয়ে চিটা হচ্ছে।

একই গ্রামের বেলায়েত হোসেন, আব্দুল খালেক, আলাল মিয়া, আনোয়ার হোসেন, কদ্দুস মিয়া, মো. আবু বক্কর জানান, প্রতিবছর যে পরিমাণ ধান পাওয়া যায় এ বছর সিকিও পাওয়া যাবে না। এতে আবাদের খরচ ওঠানো তো দূরের কথা শ্রমিক দিয়ে কেটে বাড়ি নিলে শ্রমিকের মজুরিও আসবে না। ধোঁয়ার কারণে জমিতে আবাদকৃত সবজি নষ্ট হচ্ছে। এ ছাড়া গাছে ফল আসাও বন্ধ হয়ে গেছে। যা-ও আসে তা কালো হয়ে ঝরে পড়ে।  

মীর দেওহাটা গ্রামের শাজাহান বয়াতির স্ত্রী হোসনে আরা বলেন, তারা ১৫০ শতক জায়গা বর্গা নিয়ে ধান চাষ করেছেন। চার-পাঁচ বছর আগে ওই স্থানে ইটভাটা নির্মাণ শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে ইটভাটা বাড়তে থাকে। ইটভাটা হওয়ার আগে জমি থেকে তারা যথেষ্ট ধান পেতেন। কিন্তু তিন বছর ধরে জমির ধান পুড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

মীর দেওহাটা গ্রামের সমেজ উদ্দিন (৮৫) বলেন, গত বছর প্রতি শতাংশ জমিতে ২০০ টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়েছিলেন ইটভাটার মালিকরা। কিন্তু ওই ক্ষতিপূরণের টাকা দিয়ে আবাদের খরচ মেটেনি। তিনি আরো বলেন, ‘কাউরে কিছুই কওয়ার নাই। ধান তো পাই না। গাছের ফল থাকে না। নারকেলগাছের নারকেল পইড়া যায়। অন্য গাছে যদি ফল আহে, ইট্টু অয়্যা পইড়া যায় গা। ’

মল্লিকপাড়া ও সারেংবাড়ি এলাকায় ধান চাষের জন্য চারটি সেচ প্রকল্প রয়েছে জানিয়ে স্থানীয় একটি সেচযন্ত্রের মালিক আমিনুর রহমান বলেন, ‘ইটভাটার কারণে সব প্রজেক্টের ধানেরই ক্ষতি হইছে। ভাটার ধোঁয়ায় সব পুইড়া গেছে। সবগুলা ভাটার ধোঁয়ার কারণে এই অবস্থা হইছে। ’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইটভাটার মালিক মোহাম্মদ আলী বলেন, ঈদের আগেই তার ভাটার আগুন নিভিয়ে ফেলেছেন। তার ভাটার কারণে কোনো ধানক্ষেত নষ্ট হয়নি।

এইচএসবি ইটভাটার মালিক মো. আমান উল্লাহ বলেন, অপেক্ষাকৃত নিচু চিমনি ও আগুন নেভানোর আগে কিছু নিয়ম রয়েছে তা মানা না হলে ইটভাটার ধোঁয়ায় ফসল নষ্ট হয়ে থাকে বলে দাবি করেন। তিনি জানান, তার ইটভাটার চিমনির উচ্চতা প্রায় ১৩০ ফুট, যার ধোঁয়া আকাশে মিলিয়ে যায়। ফলে তার ভাটার কারণে ধানের কোনো ক্ষতি হয়নি।

তিনি বলেন, ‌'আমি সরকার ও ইটভাটা নিয়ম-কানুন মেনে ইটভাটা পরিচালনা করে থাকি। '

জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সঞ্জয় কুমার পাল বলেন, সংশ্লিষ্ট এলাকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। তিনি নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেতগুলো পরিদর্শন করবেন বলে জানান।



সাতদিনের সেরা