kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ২৬ মে ২০২২ । ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৪ শাওয়াল ১৪৪

গণ-অনশন শুরু

সিলেট অফিস ও শাবিপ্রবি প্রতিনিধি   

২৩ জানুয়ারি, ২০২২ ০৪:৩১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



গণ-অনশন শুরু

উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে শাবিপ্রবি ক্যাম্পাসের গোলচত্বরে গত রাতে মোমবাতি প্রজ্বালন করে শিক্ষার্থীরা সমাবেশ করেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমদের পদত্যাগের দাবিতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা গণ-অনশন শুরু করেছেন। গতকাল শনিবার রাত ৮টার দিকে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গণ-অনশনের ঘোষণা দেন আন্দোলনকারীরা। এ সময় আরো তিন শিক্ষার্থী নতুন করে অনশনে যোগ দেন।

এর আগে কাফনের কাপড় পরে ক্যাম্পাসে মৌন মিছিল করেন আন্দোলনকারীরা।

বিজ্ঞাপন

এ সময় সামনে খাটিয়ায় একটি প্রতীকী মরদেহ রাখা হয়। গতকাল বিকেল ৩টার দিকে মিছিলটি গোলচত্বর থেকে শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে একই স্থানে এসে শেষ হয়।

শরীর ও মাথায় সাদা কাপড় জড়িয়ে ক্যাম্পাসে মৌন মিছিল শেষে শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘চলমান আমরণ অনশনের চতুর্থ দিন শনিবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৬ জন শিক্ষার্থী। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু প্রশাসন এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। উপাচার্য পদত্যাগ করছেন না। ’

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী মোহাইমিনুল বাশার বলেন, ‘আমাদের একটাই দাবি, ভিসি ফরিদ উদ্দিন আহমদের পদত্যাগ। প্রয়োজনে আমরা মারা যাব, তবু আন্দোলন থেকে পিছপা হব না। ’

ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলতে চান শিক্ষার্থীরা : ঢাকায় প্রতিনিধিদল গিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়ে আগের দিন প্রথমে রাজি হয়ে পরে তা থেকে সরে আসার পর গতকাল শনিবার ফের ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আলোচনা করার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। গতকাল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ক্যাম্পাসে নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তাঁরা এ কথা জানান।

শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমরণ অনশনে অসুস্থ হয়ে পড়া সহপাঠীদের রেখে আমরা ঢাকায় যেতে চাই না। বর্তমানে অনলাইনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আলোচনার মাধ্যমে অনেক সমস্যার সমাধান হচ্ছে। আমাদের সহপাঠীদের শারীরিক অবস্থা ভালো নেই। খারাপের দিকে যাচ্ছে। আমরা শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলতে চাই।

‘মৃত্যু মেনে নেব, তবু এই ভিসিকে না’
টানা চার দিনের অনশনে বিবশ শরীর। অনশনে অংশ নেওয়া আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা একে একে অসুস্থ হতে থাকলে দ্রুত তাঁদের হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অনেকের উঠে বসার শক্তি নেই। স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে না পারায় কাউকে কাউকে দেওয়া হচ্ছে অক্সিজেন সাপোর্ট। হাসপাতালের বেডে শুয়ে কাতরাচ্ছেন তাঁরা। এ পরিস্থিতির মধ্যেও তাঁদের এক কথা—‘মৃত্যু মেনে নেব, তবু এই ভিসিকে মানব না। ’

গতকাল শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার স্টাফ সিক কেবিনের সামনে গিয়ে দেখা গেল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে করিডরে পায়চারী করছেন বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী। কয়েকজন কেবিনগুলোর সামনের দরজায়। অপরিচিত কেউ কেবিনের দিকে যেতে চাইলে গতি রোধ করছেন। ওখানেই তিনটি কেবিনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আমরণ অনশনে অসুস্থ হয়ে পড়া ১০ জন শিক্ষার্থী। ২ নম্বর কেবিনে চারজন, ৩ নম্বর কেবিনে একজন, ৫ নম্বর কেবিনে পাঁচজন।

শিক্ষার্থীদের পরিচয় দিয়ে ২ নম্বর কেবিনে গিয়ে দেখা গেল, চারজন অনশনকারী শিক্ষার্থী সেখানে। কেবিনের উত্তর-পূর্ব কোনের বেডে গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছেন শিক্ষার্থী ফয়জুর রহমান। গত বৃহস্পতিবার রাতে তাঁকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সহপাঠীরা জানালেন, ফয়জুরের ফুসফুসে পানি জমেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, ফলে তাঁকে অক্সিজেন সাপোর্ট দিতে হচ্ছে।

টানা তিন দিনের অনশনে দুর্বল ফয়জুর কথা বলতে পারছিলেন না। ফিসফিস করে তিনি বললেন, ‘৭৩ ঘণ্টা হয়ে গেছে ভিসি পদত্যাগ করেননি। যতক্ষণ না পদত্যাগ করছেন, ততক্ষণ অনশনে থাকব। এই ভিসিকে ছাড় দেব না। ’

একই কেবিনে ফয়জুরের পাশের বেডে শুয়ে আছেন আরেক শিক্ষার্থী। নাম বলতে রাজি হলেন না। বললেন, ‘৭৩ ঘণ্টা পার হয়েছে। এক দিনে একটি প্রাণ, অন্যদিকে ২৪ প্রাণ। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রাণ আছে, এই ভিসির বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাব। তাঁকে আর দেখতে চাই না। তাঁকে চলে যেতে হবে। এটাই আমাদের একমাত্র দাবি। ’

৩ নম্বর কেবিনে ভর্তি রয়েছেন ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টি টেকনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী এস এম আহসান উল্লাহ রুবেল। একদিকে শরীর দুর্বল, অন্যদিকে তীব্র পেট ব্যথা। তবে অনশন তাঁকে মানসিকভাবে দুর্বল করতে পারেনি। জানালেন, গ্লুকোজের পরিমাণ কমে যাওয়ায় সহযোদ্ধারা তাঁকে শুক্রবার হাসপাতালে নিয়ে আসেন। অনশনের বিষয়ে পরিবারকে জানিয়েছেন কি না প্রশ্ন করলে রুবেল বলেন, ‘অনশনে যাওয়ার আগে বাবার সঙ্গে কথা বলে তাঁর সম্মতি নিয়েছি। তিনি বলেছেন, যদি সত্যি মনে করো ভিসি অন্যায় করেছেন, তাহলে তুমি যেতে পারো। ’

অনশনে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিক্ষার্থীদের শয্যাপাশে সার্বক্ষণিক দেখভালে আছেন তাঁদের সহপাঠীরা। কিছু চাইলে তাঁরা দ্রুত ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন।

এমন একজন শিক্ষার্থী ইসমাইল হক বললেন, ‘আন্দোলনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি যে যার মতো করে হাসপাতালেও ছুটে আসছে। আমরা দেশবাসীকে বলতে চাই, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই, ভিসির বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ তা এক দিনের নয়। এটা চার বছরের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ। আমাদের ক্যাম্পাসে সিনিয়র-জুনিয়রদের যে মেলবন্ধন ছিল, সেটা নষ্ট করেছেন এই ভিসি। শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও তাই করেছেন। সর্বশেষ ক্যাম্পাসে পুলিশ দিয়ে হামলা চালিয়ে সেই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছেন। তাঁকে আমরা আর এক মুহূর্তও ক্যাম্পাসে চাই না। ’

ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক জাহিদ আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে না খাওয়ার কারণে অনেক শিক্ষার্থীর সমস্যা হচ্ছে। যাদের আগে শারীরিক সমস্যা ছিল, এখন তাদের বেশি সমস্যা হচ্ছে। একজনের হার্টে সমস্যা থাকায় তার একটু জটিলতা দেখা দিয়েছিল। তবে এখন সবার অবস্থা স্থিতিশীল। আমরা তাদের পর্যবেক্ষণে রেখেছি। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। ’

এ পর্যন্ত আমরণ অনশনে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৬ জন শিক্ষার্থী। ওসমানী হাসপাতালে ১০ জন, দুজন জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং মাউন্ট অ্যাডোরা হাসপাতালে। বাকিরা চিকিৎসা নিয়ে আবারও ক্যাম্পাসে আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন।

তাঁরা আরো জানান, যে ভিসি পুলিশ ডেকে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করাতে পারেন, তাঁর পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত তারা সর্বোচ্চ ত্যাগ শিকার করতে প্রস্তুত।

গণ-অনশনের ঘোষণা, যুক্ত হলেন আরো তিন শিক্ষার্থী
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে গণ-অনশনের ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এরই মধ্যে নতুন আরো শিক্ষার্থী অনশনে যোগ দিয়েছেন। গতকাল শনিবার রাত ৮টার দিকে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গণ-অনশনের ঘোষণা দেন আন্দোলনকারীরা। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো তিন শিক্ষার্থী নতুন করে অনশনে যোগ দেন।

অনশনে যোগ দেওয়া নতুন শিক্ষার্থীরা হলেন ইফতেখার আল মাহমুদ, সামিরা ফারজানা, সামিউল এহসান শাকিল। তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী।

এ নিয়ে অনশনরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়াল ২৬ জনে। এর মধ্যে বর্তমানে ১৬ জন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কেউ কেউ চিকিৎসা নিয়ে ফের ফিরে আসছেন অনশনস্থলে।

মোমবাতি প্রজ্বালনে চাইলেন ভিসির পদত্যাগ
উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে একদিকে অনশন করছেন শিক্ষার্থীরা, অন্যদিকে একই দাবিতে গতকাল রাত সাড়ে ৮টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বরের সামনে মোমবাতি প্রজ্বালন করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এ সময় উপাচার্যবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন তাঁরা। পরে গত রবিবার সন্ধ্যায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার তথ্যচিত্র এবং অনশনরত শিক্ষার্থীদের শারীরিক অবস্থা নিয়ে একটি ডকুমেন্টরি প্রদর্শন করা হয়।



সাতদিনের সেরা