kalerkantho

মঙ্গলবার ।  ১৭ মে ২০২২ । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৫ শাওয়াল ১৪৪৩  

সরেজমিন

‘ছবি তোলার জন্য মাস্ক খুলেছি’

যশোরের সিভিল সার্জন

ফিরোজ গাজী, যশোর   

২১ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:৪৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘ছবি তোলার জন্য মাস্ক খুলেছি’

বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রনের বিস্তার ঠেকাতে সরকার জারি করেছে ১১টি বিধি-নিষেধ। কিন্তু জনগণের পাশাপাশি খোদ যশোরের স্বাস্থ্য কর্তা (সিভিল সার্জন) ও কর্মীরা উদাসীন এসব বিধি-নিষেধ পালনে। গতকাল বৃহস্পতিবার সিভিল সার্জন অফিস, হাসপাতাল, বাজার, রাস্তা, বাস টার্মিনাল, রেস্টুরেন্টসহ জনসমাগমস্থলে গিয়ে এ চিত্র পাওয়া যায়। উল্লেখ্য, করোনা সংক্রমণ ৩০ শতাংশ পেরিয়ে ৩২ শতাংশ হওয়ায় অধিক ঝুঁকিপূর্ণ জেলা হিসেবে গত বুধবার থেকে রেড জোনের আওতায় এসেছে যশোর।

বিজ্ঞাপন

যশোরের সিভিল সার্জন অফিসে তাঁর কক্ষে দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, ছোট ঘরটিতে চেয়ারে বসা ও ফুল হাতে দাঁড়ানো প্রায় ২০ জন মানুষ। জানা গেল, তাঁরা যশোরের জেলা ও উপজেলার স্যানিটারি ইন্সপেক্টর। দল বেঁধে এসেছেন ১০ জানুয়ারি যোগ দেওয়া যশোরের সিভিল সার্জন বিপ্লব কান্তি বিশ্বাসকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে। সিভিল সার্জন তখন মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। কিন্তু তাঁর মুখে মাস্ক ছিল না। ফোনে কথা শেষ হলে গায়ে গা ঠেকিয়ে স্যানিটারি ইন্সপেক্টররা সিভিল সার্জনকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানালেন। যশোর জেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর শিশির কান্তি পালের নেতৃত্বে উপজেলাগুলোর স্যানিটারি ইন্সপেক্টররা এ শুভেচ্ছা জানান। এ সময় ইন্সপেক্টরদের মুখে মাস্ক থাকলেও তা ছিল অনেকের নাকের নিচে। এত মানুষের মধ্যে মাস্ক খুলে রাখার বিষয়ে সিভিল সার্জন বলেন, ‘ছবি তোলার জন্য মাস্ক খুলেছি। ’ এর পরই তিনি মাস্ক পরলেন।

সরকারের বিধি-নিষেধের প্রথমেই বলা হয়েছে, সব জনসমাগমস্থলে মাস্ক বাধ্যতামূলক। অন্যথায় শাস্তি। এদিকে সিভিল সার্জন অফিসের কর্মকর্তা ডা. রেহনেওয়াজ গতকাল জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় (গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত) যশোরে করোনায় আক্রান্তের হার ৩৫ শতাংশ।
এর আগে দুপুর ১২টার দিকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতাল এলাকায় স্বাস্থ্যবিধি না মানা মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। জরুরি বিভাগের সামনে একদল যুবকের জটলা। কয়েজনের মুখে মাস্ক নেই; বাকিদের মাস্ক থুতনিতে। তাঁরা সবাই বেসরকারি অ্যাম্বুল্যান্সের ড্রাইভার। মুখে মাস্ক নেই কেন? জানতে চাইলে কয়েকজন কেটে পড়লেন। থুতনিতে মাস্ক পরা একজন বললেন, সব সময় মাস্ক মুখে রাখা যায় না। জনসমাগমস্থলে মাস্ক বাধ্যতামূলক জানেন কি না? তিনি বলেন, ‘জানি, কিন্তু আমরা এখন কথা বলছি। তাই মাস্ক থুতনিতে। ’

পরে জরুরি বিভাগের পাশের কক্ষে রোগী ইসরাফিলের কাটা জায়গা পরিষ্কার করছিলেন দুজন স্বাস্থ্যকর্মী। একজনের মুখে মাস্ক আছে; অন্যজন হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স সুকান্ত সরকারের মাস্ক গলায় ঝোলানো। মোবাইল ফোনে ছবি তুলতে দেখে তিনি জোর গলায় ‘ছবি তুলছেন কেন?’ বলে এগিয়ে এলেন। তাঁকে রোগীর চিকিৎসায় মনোযোগী হতে বললে তিনি বলেন, ‘আমার কাজ হয়ে গেছে। ’ এরপর তাঁকে মাস্ক পরার বিধি জানেন কি না প্রশ্ন করলে তিনি পরিচয় জানতে চাইলেন এবং দ্রুত মুখে মাস্ক পরে নিলেন। পরিচয় পাওয়ার পর তিনি বললেন, ‘জানি। ’ তাহলে মাস্ক গলায় ঝোলানো কেন? তিনি বললেন, ‘মুখ চুলকাচ্ছিলাম। ’

অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের ওয়ার্ডের বিছানা ও মেঝেতে চিকিৎসা নিতে ভর্তি কয়েকজন রোগীকে ধমকাচ্ছিলেন এক ব্যক্তি। একটি টেবিল ঘিরে বসেছিলেন তিনজন ইন্টার্ন চিকিৎসক। তাঁদের দুজন মোবাইল ফোনে মগ্ন। একজনের মুখে মাস্ক নেই। এ ব্যাপারে তিনি বললেন, ‘শ্বাসকষ্টের সমস্যা, তাই মাস্ক খুলে রাখা। ’ বলতে বলতে মাস্ক পরলেন।

দুপুর ১টার দিকে যশোর-মাগুরা সড়কের খাজুরা বাসস্ট্যান্ডে যাত্রীভর্তি একটি বাস (ঢাকা মেট্রো-ব ১৪-৩৩০৮) গন্তব্যে রওনা হবে হবে। বাসের সব সিটেই যাত্রী। দুই সিটের মাঝেও দাঁড়ানো অনেক যাত্রী। বেশির ভাগ যাত্রীর মুখে মাস্ক নেই। কাউন্টারের সামনে বাসের সুপারভাইজার আরব আলীর মুখের মাস্কও থুতনিতে। তাঁর যাত্রীদের মুখে মাস্ক নেই কেন? জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘আছে। ’ তাঁর মাস্ক থুতনিতে কেন? উত্তর না দিয়ে তিনি দ্রুত গাড়িতে উঠে পড়লেন। নড়াইল বাসস্ট্যান্ড, চাঁচড়া মোড়, পালবাড়ি মোড়সহ শহরের আরো কয়েকটি বাসস্টপেজে দেখা গেল প্রায় একই চিত্র।

দুপুর ২টার দিকে নিউ নূর হোটেলের (রেস্তোরাঁ) মালিক শামিম উদ্দিন ক্যাশ কাউন্টারে মুখে মাস্ক ছাড়াই বসে ছিলেন। হোটেল বয়দের বেশির ভাগের মুখে মাস্ক নেই। হোটেলে খাবার খেতে ব্যস্ত ৩০ থেকে ৩৫ জন ক্রেতা। আজাদ নামের পুলিশ সদস্যের খাওয়া মাত্র শেষ। তাঁর পাশে বসে একজন। হোটেলে প্রবেশের সময় আজাদের কাছে কেউ করোনা সনদ দেখতে চেয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বললেন, ‘চায়নি। ’ আরেক ক্রেতা মাসুদ মোল্লা বললেন একই কথা। এ ব্যাপারে শামিম উদ্দিন বলেন, ‘নামাজ পড়ে আসলাম তো, তাই মুখে মাস্ক নেই। আর করোনা সনদ এখন থেকে দেখতে চাচ্ছি। ’ বলেই তিনি এক কর্মচারীকে নির্দেশ দিলেন করোনা সনদ না দেখে কাউকে হোটেলে ঢুকতে না দিতে। শহরের কালেক্টরেট ক্যান্টিনসহ অন্য রেস্টুরেন্টগুলোতেও একই অবস্থা।

বিকেলে কয়েকটি আবাসিক হোটেলে পাওয়া গেল দুই ধরনের চিত্র। মানসম্পন্ন হোটেলগুলো ১৩ জানুয়ারি জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা পাওয়ার পর ১৪ তারিখ থেকেই কার্যকর করেছে টিকা সনদ বাধ্যতামূলক। আর কম খরচের হোটেলগুলো করোনা সনদ দেখতেও চাচ্ছে আবার সনদ না থাকলেও অতিথিদের থাকতে দিচ্ছে। এক হোটেল কর্মচারী বললেন, ‘করোনার কারণে এমনিতেই বোর্ডার কমে গেছে। তারপর ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এ ছাড়া উপায় কী?’

এ বিষয়ে বিকেলে যশোরের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক হুসাইন শওকত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যশোর রেড জোনের আওতায় আসার বিষয়ে আমরা জানার পর করোনার বিস্তার ঠেকাতে সরকারের জারি করা ১১টি নির্দেশনা প্রতিপালনে পৌরসভাসহ উপজেলাগুলোতে আজ (গতকাল) ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। অন্য সময়ের থেকে আজ বেশি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে মাইকিং করা হচ্ছে। মসজিদে আসার সময় মাস্ক পরার বিষয়ে মুসল্লিদের জানানো হচ্ছে। গ্রাম পুলিশের মাধ্যমে ইউনিয়নগুলোতে প্রচার চালানো হচ্ছে। অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। ’



সাতদিনের সেরা