kalerkantho

শনিবার ।  ২১ মে ২০২২ । ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৯ শাওয়াল ১৪৪৩  

শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা

খড়িয়াকাজীরচরে চরে বেড়ান ভুয়া কাজিরা!

শ্রীবরদী (শেরপুর) প্রতিনিধি   

২০ জানুয়ারি, ২০২২ ১৫:০৬ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



খড়িয়াকাজীরচরে চরে বেড়ান ভুয়া কাজিরা!

শেরপুরের শ্রীবরদীর খড়িয়াকাজীরচর ইউনিয়নে এখন ভুয়া কাজির ছড়াছড়ি। এদের খপ্পরে পড়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন সংসার ভাঙা নারী-পুরুষসহ সাধারণ মানুষ। এ অভিযোগ তুলে ভুয়া কাজিদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছে বাল্যবিয়ের শিকার কয়েকজন স্কুলছাত্রীসহ ভুক্তভোগীরা। আজ বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গেলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ও হয়রানির শিকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে উঠে আসে এমন তথ্য।

বিজ্ঞাপন

 

জানা যায়, খড়িয়াকাজীরচর ইউনিয়নে ২০১৭ সালে নিকাহ রেজিস্ট্রার আব্দুল ওয়াহাব অবসরে যান। এতে শূন্য হয় নিকাহ রেজিস্ট্রার পদ। পরে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়ার কথা পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্ট্রারকে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে ২০২০ সালে নিকাহ রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পান দূরবর্তী ইউনিয়ন গোসাইপুরের নিকাহ রেজিস্ট্রার বাদশা আলী। এর পর থেকেই ওই ইউনিয়নে বাড়তে থাকে ভুয়া কাজির সংখ্যা। সম্প্রতি এ সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১০ জনে দাঁড়িয়েছে। এদের মধ্যে সোহাগ রানা নামে একজন নিজেকে প্রধান কাজি হিসেবে পরিচয় দেন। নিজ বাড়িতে খুলেছেন কাজী অফিস। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বাল্যবিয়েসহ নানা অনিয়ম করে যাচ্ছেন তিনি।  

সোহাগ রানার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে একই ইউনিয়নে বিভিন্ন ওয়ার্ডে নিকাহ রেজিস্ট্রার হিসেবে কাজ করছে স্বপন মিয়া, সাইফুল ইসলাম, মামুন মিয়া, আসাদুজ্জামান, মোতালেব, নাসির উদ্দিন ও আব্দুল ওয়াহাব। এসব ভুয়া কাজির কাছেই মিলছে বিয়ে রেজিস্ট্রির কাবিননামা। তবে কাবিননামা নিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হন অনেকে। কেউ বা হচ্ছেন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিকাহ রেজিস্ট্রির জন্য নেওয়া হয় আরো বেশি টাকা। ফলে দিন দিন বাড়ছে বাল্যবিয়ের সংখ্যা। কয়েকটি বিদ্যালয়ের শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত এক বছরে অর্ধশতাধিক বাল্যবিয়ে হয়েছে ওই ইউনিয়নে। এসবই ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী।  

অভিযোগে প্রকাশ, ওই ইউনিয়নের মাদারপুর গ্রামের গোলাপ হোসেনের মেয়ে কনিকা নামে নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বিয়ে হয় দুই বছর আগে।  এর মধ্যেই গর্ভবতী হয় কনিকা।  

যৌতুক না দেওয়ায় শুরু হয় পারিবারিক কলহ। কনিকার ওপর নেমে আসে স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নির্যাতন। অবশেষে অসুস্থ হয়ে বাপের বাড়ি আসতে হয় তাকে। পরে তাকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। প্রায় এক মাস আগে মারা যায় কনিকা। এই হতভাগ্য কনিকার স্বামীর বাড়ি একই ইউনিয়নের রূপারপাড়া গ্রামে। পরে কনিকার পরিবারের লোকজন কাবিননামা খুঁজতে যায়। এ সময় তারা জানতে পারে সোহাগ রানা ভুয়া কাজী। তার কাছে কাবিননামা নেই। এ জন্য তারা মামলাও করতে পারেননি।  
 
সূত্র মতে, গত বছর লংগরপাড়া দাখিল মাদরাসা, খড়িয়াকাজীরচর উচ্চ বিদ্যালয়, ঝিনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, হালগড়া রাহেলা মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়সহ একাধিক স্কুলের ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। এসব বিয়ে রেজিস্ট্রির অভিযোগ ওই চক্রটির বিরুদ্ধে। স্থানীয় কয়েকজন সচেতন মানুষ জানান, ভুয়া কাজীরা রাতের আঁধারে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাল্যবিয়ে রেজিস্ট্রি করেন। বিয়ের পর তাদেরকে দেওয়া হয় না কাবিননামা। ফলে অন্ধকারেই থেকে যায় তাদের বিয়ে রেজিস্ট্রি। এদের কারো ঘর ভাঙলেই পড়ে বিপাকে। এসব ভুয়া কাজীর সত্যতা নিশ্চিত করেন ওই ইউনিয়নে ভারপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রার বাদশা আলী। তিনি বলেন, তাদেরকে আমি নিষেধ করেছি। কেউ যদি এখনো এমন কাজ করে তাহলে কর্তৃপক্ষকে জানাব।  

এ ব্যাপারে জেলা রেজিস্ট্রারসহ বিভাগীয় কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন ওই ইউনিয়নের রূপারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা শাহিনুল বারি। তিনি এই প্রতিনিধিকে বলেন, কর্তৃপক্ষ আমার অভিযোগ আমলে নেয়নি। এমনকি নিকাহ রেজিস্ট্রির বিধি অমান্য করে ভুয়া কাজিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।  

লংগরপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হারুন আল রশিদ বলেন, এভাবে বাল্যবিয়ের সংখ্যা বাড়তে থাকলে স্কুল থেকে ছাত্র-ছাত্রী ঝরে পড়ার সংখ্যাও বাড়বে।

অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেন শেরপুর জেলা রেজিস্ট্রার হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, নিবন্ধিত কাজির রেজিস্ট্রারের তথ্যের বাইরে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারব না। ভুয়া কাজির ব্যাপারে অভিযোগ পেয়েছি। তবে তাদেরকে আটক করবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। আমি প্রমাণ ছাড়া কিছুই করতে পারব না। সরেজমিনে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে প্রশাসন। এমনটাই মনে করেন ভুক্তভোগীসহ স্থানীয় বাসিন্দারা।  



সাতদিনের সেরা