kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ২৬ মে ২০২২ । ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৪ শাওয়াল ১৪৪

এবার তার দেখা কল্পনায় নয়, মুগ্ধতায়

শাহীন আকন্দ, গাজীপুর   

১৯ জানুয়ারি, ২০২২ ০৫:০৪ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এবার তার দেখা কল্পনায় নয়, মুগ্ধতায়

জোনাকি

ঘর আলো করে প্রথম সন্তানের জন্ম। তাও আবার মেয়ে, বাবা খুশি হয়ে মেয়েটির নাম রেখেছিলেন জোনাকি। জোনাকি ঘর আলো করলেও তার দুই চোখে আলো ছিল না। সে ছিল জন্মান্ধ।

বিজ্ঞাপন

বুঝতে শেখার পর সে সব কিছুকেই দেখত কল্পনায় সাজিয়ে। এবার তার দেখা কল্পনায় নয়, মুগ্ধতায়। ভোরের আলোর মতো জোনাকির চোখেও আলো ফুটেছে, সে সবই দেখছে।

এক তরুণ ব্যবসায়ীর উদ্যোগে রাজধানীর একটি হাসপাতালে জোনাকির একটি চোখে কৃত্তিম লেন্স প্রতিস্থাপন করা হয়। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে চোখের ব্যান্ডেজ খোলার পর সামনে তাঁর দাদিকে দেখতে পেয়ে বলে ওঠে ‘তুমি আমার দাদু। আমি দেখতাছি ত!’

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার উজিলাব গ্রামের জাকির হোসেনের মেয়ে জোনাকি আক্তার (১০)।  

খোঁজ নিয়ে জানা গেল পিলে চমকানো তথ্য, ওই পরিবারে শুধু জোনাকিই নয়, জোনাকির চাচা আমির হোসেন, দুই ফুফু হাসিনা আক্তার ও নাসরিন আক্তারও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী।   ফুফাত বোন রুপা ও ভাই মারুফ জন্মান্ধ। এক চোখে দেখতে পান না জোনাকির চাচি শিউলী আক্তার। দুঃখের এখানেই শেষ নয়, জোনাকির বাবাও চোখে অনেক কম দেখেন।

জোনাকির দাদি রাশিদা বেগম জানান, তাঁর স্বামী হোসেন আলীরও এক চোখ অন্ধ ছিল।

প্রতিবেশী রফিকুল ইসলাম জানান, আমির হোসেন একটি পথশিল্পী দলের সদস্য। তিনি দলটির ঢোলবাদক। জাকির হোসেন গ্রামে একটি কারখানায় চাকরি করতেন। চোখে কম দেখেন বলে প্রায় ছয় মাস আগে তাঁর চাকরি চলে গেছে।

রাশিদা বেগম জানান, সামান্য ভিটেমাটি ছাড়া কিছুই নেই তাঁদের। সরকারি সাহায্য যা পান তা দিয়ে এক সপ্তাহও চলে না। প্রতিবেশীদের সাহায্যে বাড়ির কাছেই তাঁর দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী দুই মেয়েকে বিয়ে দেন। তাঁর দুই মেয়ের সংসারও নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা। ছেলেমেয়েদের সংসারে সাহায্যের জন্য এখনো তাঁকে বিভিন্ন মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতে হয়। ফলে পরিবারে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের কাউকেই চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার সুযোগ হয়নি। রাশিদা বেগমের ভাষায়, ‘খাইয়া-পইরা বাইচ্চা থাকবার লাইগ্যা কতো কষ্ট করি গো বাজান! পোলাপাইনতের চক্কের চিন্তা কুনসময় হরাম!’

জোনাকির বাবা জাকির হোসেন জানান, চিকিৎসায় চোখের আলো ফিরতে পারে-এ ছিল তাঁদের জন্য স্বপ্ন দেখা। এতে যে ব্যয় হবে সেই সামর্থ্য না থাকায় ওই স্বপ্নও তাঁরা দেখতেন না। বছর খানেক আগে একদিন সাদ্দাম হোসেন অনন্ত নামে এক তরুণ ব্যবসায়ী তাঁদের বাড়িতে আসেন। ওই ব্যবসায়ী তাঁদের দুর্দশার চিত্র দেখে প্রথমে খাদ্য সহায়তা দেন। পরে তাঁর শিশু মেয়ে জোনাকির চোখের আলো ফেরানোর চেষ্টা করতে চান।

সাদ্দাম হোসেন অনন্ত জানান, জোনাকিকে প্রথম গাজীপুরের সালনায় এবিসি চক্ষু হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা অপারগতা জানায়। পরে গত ৬ জানুয়ারি রাজধানীর ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। গত ৮ জানুয়ারি চোখের নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জোনাকির চোখের আলো ফেরানো সম্ভব বলে জানান। তবে তার চোখে কৃত্তিম লেন্স প্রতিস্থাপন করতে হবে।

সাদ্দাম হোসেন অনন্ত আরো জানান, গত সোমবার জোনাকির একটি চোখে লেন্স প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। আগামী ২৫ জানুয়ারি অন্য চোখেও লেন্স প্রতিস্থাপন করা হবে।

জোনাকির দাদি রাশিদা বেগম জানান, গতকাল দুপুরে তাঁর নাতনির চোখের ব্যান্ডেজ খোলার সময় সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। চোখ মেলেই জোনাকি বলে ওঠে, ‘তুমি আমার দাদু। আমি দেখতাছি ত!’ তখন আনন্দে কেঁদে ফেলেন তিনি।

গতকাল সন্ধ্যায় হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরে জোনাকি। একে একে স্বজনদের জড়িয়ে ধরে সে কী আনন্দ তাঁর। কেউ কথা বললেই বলে দিতে পারে সে কে।

জোনাকির বাবা জাকির হোসেন জানান, তাঁর শিশু মেয়েটির স্মরণশক্তি খুবই ভালো। মক্তবে শুনে কোরআন শিখেছে সে। এবার তাঁকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেবেন তিনি।  



সাতদিনের সেরা