kalerkantho

শুক্রবার । ৭ মাঘ ১৪২৮। ২১ জানুয়ারি ২০২২। ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

বিবাহিতা নারীদের ‘মাঙ্গলিক কুলা প্রদক্ষিণ’ (ভিডিও)

চকরিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি   

১৫ জানুয়ারি, ২০২২ ০২:২৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিবাহিতা নারীদের ‘মাঙ্গলিক কুলা প্রদক্ষিণ’ (ভিডিও)

দিনভর উপবাস থেকে সাঁজগোজ করা বরণকুলা (ঘট, পল্লব, ফুল, তৈল দ্বারা জ্বালানো মঙ্গল প্রদীপসহ) মাথায় নিয়ে নতুন পরিধেয় বস্ত্র সমেত সন্ধ্যার পর থেকে একেকজন বিবাহিতা নারী মন্দিরে আসছেন। এরপর তারা মন্দিরের মূল বিগ্রহের চারপাশে কুলাগুলো থরে থরে সাঁজিয়ে রাখলেন। শুক্রবার রাত ১০টা অবদি পুরো মন্দিরের পাদদেশ ভরে উঠল শত শত বরণকুলায়।

এর পর গীতাপাঠের সঙ্গে শুরু হলো হরিনাম সংকীর্ত্তণ।

বিজ্ঞাপন

রাত পৌনে ১১টার দিকে বিবাহিতা নারীরাই নিজ নিজ বরণকুলা মাথায় নিয়ে মন্দিরের মূল বিগ্রহের চারিদিকে গোলাকৃতির হয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে গেলেন। এর পর মন্দিরের পুরোহিতের নির্দেশনা মোতাবেক মাথার ওপর বরণকুলাসহ গোলাকৃতির হয়ে দাঁড়ানো নারীরা শুরু করলেন মাঙ্গলিক কুলা প্রদক্ষিণ। এভাবে প্রায় রাত ১টা পর্যন্ত মন্দিরের মূল বিগ্রহের চারিদিকে প্রদক্ষিণ করলেন বিবাহিতা নারীরা। আর এই দৃশ্য উপভোগ করতে কনকনে শীত উপেক্ষা করে বিভিন্ন ধর্মের শত শত মানুষ ভিড় জমান মন্দিরে।

বিশ্ববাসীর শান্তি কামনায় প্রতিবছরের মতো ঐতিহ্যগতভাবে হয়ে আসা গত বুধবার রাতে (১২ জানুয়ারি) এই ‘মাঙ্গলিক কুলা প্রদক্ষিণ’ সম্পন্ন হলো চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়া ইউনিয়নের আমতলী জগতার পাড়া শ্রী শ্রী হরিমন্দিরে। নতুন পরিধেয় বস্ত্র সমেত বিবাহিতা নারীরাই এই কুলা প্রদক্ষিণ করে থাকেন প্রতিবছর। ঐতিহ্যগতভাবে দীর্ঘ ৭৯ বছর ধরে প্রতিবছর উত্তরায়ণ সংক্রান্তি তিঁথি উপলক্ষে ব্যতিক্রমী এই কুলা প্রদক্ষিণ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে মন্দিরটিতে।

প্রচলিত আছে-নারীরা তাঁদের সন্তান-সন্ততির মঙ্গল কামনায় মাঙ্গলিক কুলা প্রদক্ষিণ করার মানত করে থাকেন। এখানকার সনাতনী সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাস-উত্তরায়ণ সংক্রান্তি তিঁথিতে এই মাঙ্গলিক কুলা প্রদক্ষিণ করা হলে মনোবাসনা পূর্ণ হয় তাদের এবং সন্তান-সন্ততিও নিরাপদে থাকেন। এই ধর্ম বিশ্বাস থেকে প্রতিবছর মহা সাড়ম্বরে এই মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে মাঙ্গলিক কুলা প্রদক্ষিণ। যা এলাকার ঐতিহ্যগত অনুষ্ঠানে পরিণত হয়ে উঠেছে।

বড়হাতিয়া ইউনিয়নের আমতলী জগতার পাড়ার (নাথপাড়া) বাসিন্দা দেবাশীষ নাথ নান্টু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের কোথাও বিবাহিতা নারীদের দ্বারা এই ধরনের ‘মাঙ্গলিক কুলা প্রদক্ষিণ’ অনুষ্ঠান দ্বিতীয়টি আর নেই। একমাত্র দক্ষিণ চট্টগ্রামের জগতার পাড়া হরিমন্দিরে উত্তরায়ণ সংক্রান্তি তিঁথিতে দীর্ঘ ৭৯ বছর ধরে ব্যতিক্রমী এই অনুষ্ঠান হয়ে আসছে। যা আমাদের বাপ-দাদাদের সময় থেকে শুরু হয়েছিল। ’

মাঙ্গলিক কুলা প্রদক্ষিণ, গীতাযজ্ঞ, ধর্মসভা, মহানামযজ্ঞসহ চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠান উদযাপন পরিষদের সহ-সাধারণ সম্পাদক মাষ্টার রূপাস কান্তি নাথ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমান করোনা মহামারির মতোই ১৯৪০ সালের দিকে কলেরা মহামারি দেখা দিয়েছিল। তখন আমাদের জগতার পাড়ার প্রতি ঘরেই মানুষ মারা যাচ্ছিল। সেই কলেরা মহামারি থেকে পরিত্রাণ পেতে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার বৈলতলী গ্রামের রসানন্দ অবধূতের (পায়ে হেটে ধর্মপ্রচারক) নির্দেশনায় পাড়ার ভুক্তভোগী মানুষেরা মিলে ১৯৪৩ সালের দিকে হরিমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। ওই বছর থেকেই শুরু হয়েছে এই মাঙ্গলিক কুলা প্রদক্ষিণ। পরবর্তীতে অনুষ্ঠানের পরিধি বৃদ্ধির মাধ্যমে চার দিনব্যাপী করা হয়েছে। ’

গীতা শিক্ষক রূপাস কান্তি নাথ আরো বলেন, ‘প্রতিবছর উত্তরায়ণ সংক্রান্তি তিঁথিতে এই মাঙ্গলিক কুলা প্রদক্ষিণে অংশ নিতে মানত করে থাকেন এবং দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য বিবাহিতা নারী এবং ভক্ত এই মন্দিরে ভিড় করেন। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ‘মাঙ্গলিক কুলা প্রদক্ষিণ’ করলেই তাদের সন্তান-সন্ততিসহ পরিবারের সকল সদস্য বিপদাপদ থেকে মুক্ত থাকবেন। ’

বড়হাতিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী প্রধান শিক্ষক সুধাংশু বিমল নাথ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে আমার বয়স আশির কাছাকাছি। খুব ছোটকাল থেকেই দেখে আসছি, আমাদের পাড়ার মন্দিরের মাঙ্গলিক এই কুলা প্রদক্ষিণ অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে শুধুমাত্র সনাতনী সম্প্রদায়েরা অংশ নিলেও উপভোগ করে থাকে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও। তাই ঐতিহ্যগতভাবে অসাম্প্রদায়িক এই অনুষ্ঠান উপভোগ করার জন্য মানুষের ভিড় পড়ে যায় প্রতিবছর। বিশ্ববাসীর মঙ্গল কামনায় আমাদের উত্তরসূরীরাও এই অনুষ্ঠান প্রতিবছর চালিয়ে নেবে। যোগ করেন প্রবীণ এই শিক্ষক।
 
মাঙ্গলিক কুলা প্রদক্ষিণে অংশ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মহামায়া দেবী, জুবলী নাথ, মঞ্জুলিকা দত্তসহ বিবাহিতা অসংখ্য নারীর ভাষ্য-তাঁরা ধর্মীয়ভাবে বিশ্বাস করেন উত্তরায়ণ সংক্রান্তি তিঁথিতে এই মাঙ্গলিক কুলা প্রদক্ষিণ করলেই তাঁদের সন্তান-সন্ততি এবং পরিবার সদস্যরা নানা বিপদাপদ থেকে পরিত্রাণ পাবেন। এজন্য তারাও এসেছেন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে। এখানে এসে মাঙ্গলিক কুলা প্রদক্ষিণে অংশ নিতে পেরে ধন্য মনে করছেন তাঁরা।

 



সাতদিনের সেরা