kalerkantho

শনিবার । ১৫ মাঘ ১৪২৮। ২৯ জানুয়ারি ২০২২। ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

সিদ্ধিরগঞ্জের শিমড়াইল মোড়

সওজের জায়গায় মার্কেট বানিয়ে কোটি টাকায় দোকান বিক্রি

►সম্প্রতি অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদের ফলে শত শত দোকানদার বেকার হয়ে পড়েছেন ►মালিকপক্ষ তাদের বিষয়ে কোনো সুরাহা করেনি

আসাদুজ্জামান নূর, সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি   

২৮ ডিসেম্বর, ২০২১ ১২:৩৯ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সওজের জায়গায় মার্কেট বানিয়ে কোটি টাকায় দোকান বিক্রি

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের শিমড়াইল মোড় এলাকায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) জায়গা দখল করে পাকা দোকান নির্মাণ ও বিক্রি করে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন মার্কেট মালিকরা। সম্প্রতি এসকল অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদের ফলে শত শত দোকানদার বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। মালিকপক্ষ তাদের বিষয়ে কোনো সুরাহা দিতে পারেনি।   

আজ মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়ক ও জনপথের ভেঙে ফেলা দোকানের পাশে দোকানিদের ভিড়, কান্নায় ভেঙে পড়েছেন অনেকেই।

বিজ্ঞাপন

তাদের পেটে ভাত নেই, পড়নে ভালো কাপড় নেই, ছেলে মেয়ে নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন তারা। আর মার্কেটের মালিকরা তাদের কাছ থেকে দোকান বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে বেশ আয়েশেই দিন কাটাচ্ছেন।  

শিমড়াইল মোড়ের চাঁন সুপার মার্কেটের সামনের সিড়ির নীচের জায়গায় ২০০১ সাল থেকে দোকান ক্রয় করে ওষুধের ব্যবসা করে আসছেন ইসমাইল মিয়া। সরকারের জায়গায় নির্মাণ করা দোকান ক্রয় করেছেন, এটা তিনি জানতেন না। সম্প্রতি তার দোকান ভেঙে ফেলায় হতাশ হয়ে পড়েছেন ইসমাইল মিয়া। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমার কাছ থেকে দলিল করে চার লাখ টাকা বিনিময়ে দোকানটি ক্রয় করে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছি। এখন জানতে পারলাম আমার সাথে মার্কেট মালিক প্রতারণা করেছে।  

একই মার্কেটের ওষুধের দোকানি জিসান মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, স্ত্রীর স্বর্ণ বিক্রি করে আট লাখ টাকা দিয়ে দোকানটি ক্রয় করেছিলাম। এখন বলছে দোকান নাকি সরকারি জমিতে। দোকানটি ভেঙে দিয়েছে সড়ক ও জনপথের লোকজন। এক বছর পূর্বে আমার স্ত্রী পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছেন, বলতেই তার চোখে ছল ছল। পরে আক্ষেপ করে তিনি বলেন, জানি না কপালে কী আছে, আল্লাহই ভালো জানেন।   

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন দোকানদার জানান, সড়কের পাশে শিমড়াইল মোড়ের একই সাথে গড়ে ওঠা ৫টি দোকানের মালিক তাদের মার্কেটের সামনে সিঁড়ির নিচে পাকাঘর উঠিয়ে প্রতি দোকান থেকে পাঁচ থেকে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রির মাধ্যমে অবৈধভাবে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। আমরা মালিকদের কাছে টাকা চাইতে গেলে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে সময় পার করছেন তারা।  

অনুসন্ধান চালিয়ে জানা যায়, হাজী আহসান উল্লাহ সুপার মার্কেটের সামনে বিল্লাল সাহেবের মালিকানাধীন আলাউদ্দিন ও আনন্দ বেকারি, লোকমান হোসেনের মালিকানাধীন আহসান বেকারি, আজিজ মিয়ার মালিকানাধীন আল্লাহ ভরসা বেকারি, সেলিম মিয়ার মালিকানাধীন সেলিম স্টোর, শহিদুল্লার মালিকানাধীন শহিদুল্লাহ স্টোর ও সোহেল মিয়ার মালিকানাধীন মুরগির দোকান থেকে ও সিঁড়ির ওপরে বসানো অর্ধশতাধিক দোকান থেকে প্রায় আশি লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন মার্কেট মালিক আব্দুল জাব্বার মিয়া।  

এ বিষয় জানতে চাইলে আহসান উল্লাহ মার্কেটের সভাপতি আব্দুল জাব্বার মিয়া কালের কণ্ঠকে জানান, সওজের জায়গার পাশে আমাদের মালিকানাধীন কিছু জমি রয়েছে। এ সকল জায়গায় দোকান উঠিয়ে ভাড়া আদায় করছি।

চান সুপার মার্কেটের মালিক মজিবুর রহমান ও তার পিতা ফকির চান সওজের জায়গা দখল করে দোকান বসিয়েছেন। তিনি জিসান ফার্মেসি, মোবারক ফার্মেসি, ইসমাইল ফার্মেসি, ইউসুফ ফার্মেসির মালিকদের কাছ থেকে ও সিঁড়ির ওপর দোকানদারদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় চল্লিশ লাখ টাকা। সওজের জাগায় দোকান বসিয়ে বিক্রি করার বিষয় জানতে চাইলে মজিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, আমি দোকান বিক্রির সঙ্গে জড়িত নই। মার্কেট পরিচালনা করার সময় এ সকল দোকানগুলো বিক্রি করা হয়েছে। সওজ থেকে আমরা জমিগুলো লিজ নিয়েছিলাম। পরবর্তীকালে আমরা লিজের জন্য আবেদন করলেও পুনরায় আর লিজ পাইনি।

এছাড়া বদর উদ্দিন শপিং কমপ্লেক্সের মালিক নূর উদ্দিন সামনে ভূইয়া ফার্মেসি, আমুলিয়া ফার্মেসি, আলামিন ফার্মেসিসহ বেশ কয়েকটি ওষুদের দোকান ও সিঁড়ির ওপরের কাপড়ের ও জুতার দোকান থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে।

কাসসাফ শফিং কমপ্লেক্সের মালিক সাবেক বিএনপির সংসদ সদস্য আলহাজ্ব গিয়াস উদ্দিন সরকারি  জায়গায় ফারিহা ইলেকট্রনিক্স, শরিফ রেক্সিন, সবুজ ক্রোকারিজসহ বেশ কয়টি দোকান নির্মাণ করে ও সিঁড়ির ওপর কাপড়-জুতাসহ ৩০টি দোকান নির্মাণ করে হাতিয়ে নিয়েছেন চল্লিশ লাখ টাকা।  

সরকারি জাগায় কীভাবে দোকান নির্মাণ করে বিক্রি করেছেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে কাসসাফ শফিং কমপ্লেক্সের পরিচালক রিফাত হোসেন কালের কণ্ঠকে জানান, আমরা এখানে দোকান দিয়েছিলাম। কিন্তু এর আগেও সেগুলো ভেঙে দেওয়া হয়। তারপর আমরা আর দোকান তুলিনি। এখানে আওয়ামী লীগ সমর্থিত স্থানীয় কাউন্সিলর ওমর ফারুকের লোকজন আমাদের মার্কেটের সামনের সিঁড়ির ওপর দোকান বসিয়ে সেখান থেকে চাঁদা উত্তোলন করছেন। আমরা তাদের বাধা দিলেও তারা শুনছেন না।  

নেকবর আলী সুপার মার্কেটের সামনে সওজের জায়গা দখল দখল ও বিক্রি করে দেলোয়ার হোসেনের মালিকানাধীন চাউলের আড়ত ও বি-বাড়িয়া স্টোর মালিকের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন বিশ লাখ টাকা। এছাড়া ওই মার্কেটের মালিক দেলোয়ার হোসেন সিঁড়ির ওপর দোকান বসিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ১৫ লাখ টাকা। সরকারি জায়গায় বসানো দোকান থেকে কীভাবে টাকা উঠাচ্ছেন জানতে চাইলে দেলোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে জানান, আমরা এখানকার অসহায়, গরিব, বেকার লোকদের জীবিকা নির্বাহের জন্য কিছু দোকান নির্মাণ করে দিয়েছি। এখানে তাদের ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব দোকানের কিছু খরচ হিসেবে টাকা তোলা হয়।

দোকানিরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে রিপন ওরফে মুরগি রিপন ও তার সহযোগী জামাল হোসেন দোকান বসানোর কথা বলে আমাদের কাছ থেকে গত একমাস আগে ১৫ লাখ হাতিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া প্রতিদিন ওই সকল দোকান থেকে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা উত্তোলন করছেন। বিভিন্ন দোকান থেকে মাসে প্রায় কোটি টাকা চাঁদাবাজি করছে।   

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাঁচপুর হাইওয়ে পুলিশের শিমড়াইল মোড়ে দায়িত্বে থাকা ট্টাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) মশিউর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, জনগণের চলার পথে এসব অবৈধ স্থাপনা বসানো হয়েছে। সাধারণ জনগণের চলাচলের পথ সুগম ও যানবাহন যানজট মুক্ত করে আমাদের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী মহাসড়কের পাশ থেকে সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এতে জনগণ ও যানবাহন চলাচলে কোনো বিঘ্ন হচ্ছে না।  

নারায়ণগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ মেহেদী ইকবাল কালের কণ্ঠকে জনান, আমাদের সওজের জায়গা দখল করে যেসকল অবৈধ মালিকপক্ষ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ইতিমধ্যেই তাদের ওই সকল অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এসকল দোকান যাতে করে বসতে না পারে সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মুস্তাইন বিল্লাহ কালের কণ্ঠকে জানান, যেসকল মার্কেট মালিক সওজের জায়গা দখল করে ও সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করে অবৈধভাবে দোকান বিক্রি করেছে, তাদের তালিকা তৈরি করে ওই সকল মালিকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।  



সাতদিনের সেরা