kalerkantho

বুধবার । ১২ মাঘ ১৪২৮। ২৬ জানুয়ারি ২০২২। ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

চান দুর্নীতিমুক্ত সোনার বাংলা

৫০ বছর পার করেছে বাংলাদেশ। বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের বড় অংশ এখন জীবনসায়াহ্নে। তাঁদের মধ্য থেকে ৮০ বছর পেরিয়ে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে লিখছেন কালের কণ্ঠের প্রতিনিধিরা

গোলাম সরোয়ার লিটন, তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ)   

৮ ডিসেম্বর, ২০২১ ০৮:৪৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চান দুর্নীতিমুক্ত সোনার বাংলা

মশ্রব আলী

গ্রামের পথে পথে ও হাটে বাউল গান গেয়ে বেড়াতেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মশ্রব আলী। সেই যুগে সুনামগঞ্জের হাওরে বর্ষায় ছয় মাস কর্মহীন থাকত গ্রামের মানুষ। তখন গ্রামে গ্রামে বসত বাউল ও পালা গানের আসর। এলাকায় এসব আসরের মধ্যমণি ছিলেন গানপাগল মশ্রব আলী।

বিজ্ঞাপন

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পরই তিনি একতারা আর বেহালা ফেলে রেখে হাতে অস্ত্র তুলে নেন। স্বাধীনতার পর প্রত্যাশা প্রাপ্তির হিসাব মেলাতে গিয়ে ৮৪ বছর বয়সী মশ্রব আলী বলেন, ‘নিজের অর্থবিত্ত ছিল না, আজও নেই। ছিলাম গানপাগল, মনে থাকত সুখ। বয়স আর শ্বাসকষ্টে অসুস্থ থাকি। তাই গান গাইতে পারি না। শেখের বেটি মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও অর্থ দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দীর্ঘজীবী হোন। এখন একটাই চাওয়া—দুর্নীতিমুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা। ’

কালের কণ্ঠের প্রতিনিধি গত সোমবার তাহিরপুর উপজেলার মধ্য তাহিরপুর গ্রামে মশ্রব আলীর বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল ৩৪ বছর। তিন বছরের মেয়ে সেনোয়ারা ও স্ত্রী আহেদা বেগমকে ঘরে রেখে যুদ্ধে যান।

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পরপরই তাহিরপুর থানার তৎকালীন ওসি শফিকুর রহমান উপজেলার সব আনসার সদস্যকে থানায় ডাকেন। আনসার সদস্য হিসেবে মশ্রব আলীও উপস্থিত হন। ওসি শফিকুর রহমান বলেন, ‘সবাইকে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে। ’ আনসার হিসেবে তিনি আগেই অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। মশ্রবসহ উপস্থিত হওয়া ১৫-১৬ জন আনসার সদস্যকে তাহিরপুর খেলার মাঠে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেন শফিকুর রহমান। তাহিরপুরে মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হলো। সংগ্রাম কমিটির নেতাদের সঙ্গে গ্রামে গ্রামে ঘুরে খাদ্য সংগ্রহ করতেন মশ্রব আলী। স্মৃতি হাতড়ে মুক্তিযোদ্ধা মশ্রব জানান, তাঁদের প্রথম যুদ্ধ ছিল সাচনা বাজারে। ৭০ জন মুক্তিযোদ্ধার দল তাতে অংশ নেয়। মুক্তিযোদ্ধারা সাচনা বাজারে আর পাকিস্তানি বাহিনী জামালগঞ্জে। অর্থাৎ সুরমা নদীর এপার-ওপার যুদ্ধ চলে। ২২ জুলাই তাঁরা ২০ জন মুক্তিযোদ্ধা জামালগঞ্জ থানা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান লক্ষ্মীপুরের লাল মিয়া তালুকদারের বাড়িতে অপারেশনে যান। ১১ ও ৯ জন করে দুই নৌকায় ওঠেন মুক্তিযোদ্ধারা। লালপুরের কাছেই কালীপুরের খালে লঞ্চ নিয়ে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা তাদের ওপর হামলা চালায়। লঞ্চ খালে আটকে গেলে পাকিস্তানি সেনারা ১১ জন মুক্তিযোদ্ধার নৌকাটিতে ব্রাশ ফায়ার করে। এতে নৌকা চালানোর দায়িত্বে থাকা আব্দুল গফুর, আব্দুল মজিদ ও আব্দুল আওয়াল পানিতে পড়ে গিয়ে শহীদ হন। পরে নৌকাটিও ডুবে যায়। বাকি আটজন সাঁতরে নদীর পাশের কাজীরগাঁও গ্রামে আশ্রয় নেন। পরে গ্রামটির প্রতিটি ঘরে তল্লাশি চালিয়ে ছয় মুক্তিযোদ্ধাকেই ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা। অকথ্য নির্যাতনে তাঁদের হত্যা করা হয়। তবে শহীদ আব্দুল গফুরের ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিছ আলী এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা আম্বর আলী (বর্তমানে প্রয়াত) লুকিয়ে থেকে বেঁচে যান।

একসময় দেশ স্বাধীন হলো। ঘরে ফিরলেন মশ্রব আলী। আবারও হাটে ও গ্রামে গান গাইতে শুরু করেন। তাতে তেমন উপার্জন হতো না। পাঁচ সন্তান আর স্ত্রীকে নিয়ে বহুদিন অনাহারে-অর্ধাহারে কেটেছে। পরে ভাতা পাওয়ায় তাতে সংসার চলে। তবে টাকার অভাবে তাঁর উন্নত চিকিৎসা হচ্ছে না। তার পরও অভিযোগ নেই কোনো। এ পর্যন্ত যে সম্মান ও অর্থ পাচ্ছেন তা-ও কোনো দিন আশা করেননি তিনি। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সব জায়গায় সম্মান পান।

একাত্তরের নভেম্বর মাসে শহীদ হন মশ্রবের বড় ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফ আলী। ইউসুফসহ সাতজন মুক্তিযোদ্ধাকে পাকিস্তানি সেনারা রাজাকারদের সহযোগিতায় তাহিরপুর উপজেলা সদরে গুলি করে হত্যা করে। মুক্তিযোদ্ধা মশ্রব আলী বললেন, ঘটনাস্থলে তাঁদের স্মৃতি রক্ষার্থে কিছু করা হলে শেষ বয়সে খুশি হতেন।



সাতদিনের সেরা