kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ মাঘ ১৪২৮। ১৮ জানুয়ারি ২০২২। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

আবেগে কেঁপে উঠল অবশ শরীর

সাব্বিরুল ইসলাম সাবু, মানিকগঞ্জ   

৫ ডিসেম্বর, ২০২১ ০৯:১৫ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আবেগে কেঁপে উঠল অবশ শরীর

নিতাই চন্দ্র ঘোষ

প্রায় ১০ বছর আগে স্ট্রোক হয়েছিল মানিকগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধা নিতাই ঘোষের। প্রাণে বেঁচে গেলেও শরীরের ডান পাশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। হাঁটাচলা তো নয়ই, কথাও বলতে পারেন না। সেই নির্জীব ধরনের মানুষটিই ‘আপনি তো মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন’ কথাটি বলতেই যেন প্রাণ ফিরে পেলেন। আবেগে কেঁপে উঠল শরীর। চোখ দুটি হয়ে উঠল বড় বড় আর চঞ্চল। তবে মুখ থেকে বেরিয়ে আসা শব্দগুলো ছিল দুর্বোধ্য।

কথা বলার জন্য অন্ধকার ঘরের চৌকিতে শুয়ে থাকা নিতাই ঘোষকে কোলে তুলে উঠানের একটি চেয়ারে বসিয়ে দিলেন ছেলে তুষ্ট ঘোষ। আর নিতাই ঘোষের কথা জানাতে ডেকে আনা হলো তাঁর ভাই বলাই ঘোষকে।

সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি ইউনিয়নের ঘোষপাড়ার কান্দুরী ঘোষের চার ছেলের মধ্যে সবার ছোট নিতাই চন্দ্র ঘোষ। একাত্তরে তিনি পৈতৃক পেশা দই বিক্রির কাজই করতেন। স্বভাবে সহজ-সরল হলেও ছিলেন একরোখা। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সাটুরিয়ার অনেক হিন্দু পরিবার গ্রাম ছেড়ে গেলেও কান্দুরী ঘোষের পরিবার যায়নি। কারণ তাদের যাওয়ার মতো তেমন কোনো জায়গা ছিল না। এপ্রিল মাসের শেষ দিকে সাটুরিয়া বাজারে পাকিস্তানি সেনারা ক্যাম্প করে। স্থানীয় কিছু লোক তাদের দালাল হিসেবে কাজ করতে থাকে। জুন মাসে রাজা মিয়া নামের এক দালাল কান্দুরী ঘোষ ও তাঁর চার ছেলেকে লোক দিয়ে ডেকে নিয়ে যান এবং পাকিস্তানি সেনাদের কাছে তুলে দেওয়ার কথা বলেন। তাঁর হাতে-পায়ে ধরেও কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত কান্দুরী ঘোষের ছোটবেলার বন্ধু শমশের আলীর অনুরোধে রাজা মিয়া তাঁদের মুসলমান হওয়ার শর্তে ছেড়ে দিতে রাজি হন। বাধ্য হয়ে তা মেনে নেন কান্দুরী ঘোষ। তবে একরোখা ও স্বাধীনচেতা যুবক নিতাই এ হয়রানির কথা ভুলতে পারেননি। আগস্টের শেষ দিকে হঠাৎ তিনি বাড়ি থেকে উধাও হয়ে গেলেন। সবাই চরম উদ্বিগ্ন। দিন পনেরো পর লোকমুখে জানা গেল, নিতাই যোগ দিয়েছেন টাঙ্গাইলে কাদের সিদ্দিকীর বাহিনীতে।

নিতাই ঘোষের সহযোদ্ধা ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু একই গ্রামের দুলাল গোস্বামী জানান, আগস্ট মাসের শেষের দিকে তাঁরা দুজনে একসঙ্গে যোগ দেন কাদেরিয়া বাহিনীতে। টাঙ্গাইলের লাউহাটিতে ৩১ দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে যোগ দেন কমান্ডার কাজী আশরাফ হুমায়ুন বাঙালীর নেতৃত্বাধীন ১ নম্বর কম্পানিতে। টাঙ্গাইলের নাগরপুর, দেলদুয়ার ও মির্জাপুরে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে তিনটি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন তাঁরা। ময়মনসিংহ জেলায় আরো কয়েকটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী হাই স্কুল মাঠে আব্দুল কাদের সিদ্দিকীর (পরে বীর-উত্তম) নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র জমা দেন। সেদিন ১৮ হাজার মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে নিতাই ঘোষ আর দুলাল গোস্বামীও অস্ত্র জমা দেন।

দুলাল গোস্বামী জানান, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিতাই ছিলেন অত্যন্ত সাহসী। কোনো কিছুতে ভয় পেতেন না। রক্ষীবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর বাড়ি চলে আসেন। আবার শুরু করেন পৈতৃক ব্যবসা।

বীর মুক্তিযোদ্ধা নিতাই ঘোষ দুই ছেলে ও এক মেয়ের জনক। অর্থাভাবে সেভাবে ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া করাতে পারেননি। বড় ছেলে একটি মিষ্টির দোকানে চাকরি করেন। ছোট ছেলে ছোট্ট একটি মুদি দোকান চালান। মূলত নিতাই ঘোষের মুক্তিযোদ্ধা ভাতা দিয়েই কোনো রকমে সংসার চলছে। অর্থাভাবে তাঁর সুচিকিৎসা করা সম্ভব হচ্ছে না।

সহযোদ্ধা দুলাল গোস্বামী বললেন, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিতাই ঘোষের সুচিকিৎসার দায়িত্ব রয়েছে সরকারের। আর অন্ধকার ভাঙা কুঁড়েঘর নয়, শেষ জীবনে একটু আলো-বাতাস আসে, এমন একটি বাড়িতে থাকাও তাঁর পাওনা।



সাতদিনের সেরা