kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ মাঘ ১৪২৮। ১৮ জানুয়ারি ২০২২। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

নবীগঞ্জে ইউপি নির্বাচন

মনোনয়ন গলদ ও বিদ্রোহী প্রার্থী ‘ডুবিয়েছেন’ নৌকা

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি   

৪ ডিসেম্বর, ২০২১ ০৮:৫২ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মনোনয়ন গলদ ও বিদ্রোহী প্রার্থী ‘ডুবিয়েছেন’ নৌকা

হবিগঞ্জের প্রবাসী অধ্যুষিত নবীগঞ্জ উপজেলাকে বলা হয় আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে এখানে সব সময় নৌকার জয়জয়কার হয়। জেলার শীর্ষ নেতৃত্বে থাকেন এই উপজেলার নেতারা। কিন্তু এবার তৃতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে নবীগঞ্জে নৌকার ভরাডুবি হয়েছে। ১৩টি ইউপির মধ্যে ৯টিতেই পরাজিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থীরা। যোগ্য ব্যক্তিকে মনোনয়ন না দেওয়া এবং ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী এই পরাজয়ের মূল কারণ বলে মনে করছেন দলের তৃণমূলের নেতারা।

মনোনয়নকে কেন্দ্র করে উপজেলা আওয়ামী লীগে চরম বিভক্তির সৃষ্টি হয়। দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বহিষ্কৃত হন। উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান চৌধুরী সেলিম ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। পৌর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক নির্মলেন্দু রানা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেও হারিয়েছেন দলীয় পদ। সংসদ সদস্যসহ (এমপি) উপজেলার সব বড় বড় নেতার কেন্দ্রে পাস করেনি নৌকা। সব মিলিয়ে নবীগঞ্জ উপজেলায় আওয়ামী লীগ এখন লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নবীগঞ্জের দেবপাড়া গ্রামে বাড়ি স্থানীয় এমপি গাজী মোহাম্মদ শাহনওয়াজ মিলাদের। ইউপি নির্বাচনে তাঁর বাড়ির কেন্দ্রে নৌকার প্রার্থী ৪০৬ ভোট পেয়ে ফেল করেছেন। আর ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী শাহরিয়ার নাদির সুমন পান ৭২২ ভোট। বাউসা ইউনিয়নের বদরদিঘি গ্রামে বাড়ি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ সদস্য ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ডা. মুশফিক হোসেন চৌধুরীর। তাঁর বাড়ির কেন্দ্রে নৌকার প্রার্থী পেয়েছেন ১০৪ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী জুনেদ হোসেন চৌধুরী পান ৯৫৭ ভোট এবং বিএনপির শেখ সাদিকুর রহমান শিশু পেয়েছেন ১৬৩ ভোট। একই ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামে বাড়ি জেলা আওয়ামী লীগ সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল ফজলের। এই কেন্দ্রে নৌকার প্রার্থী পান ২০৮ ভোট এবং বিএনপির শেখ সাদিকুর পান এক হাজার ৮৬ ভোট। জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আলমগীর চৌধুরীর গ্রামের বাড়ি করগাঁও ইউনিয়নের করগাঁও গ্রামে। এই কেন্দ্রে নৌকার প্রার্থী ১৬২ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। ‘বিদ্রোহী’ নির্মলেন্দু দাশ রানা ৪৬৩ ভোট এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইমউদ্দিন ২৪৫ ভোট পেয়েছেন। ইনাতগঞ্জ ইউনিয়নের কাজিরগাঁও গ্রামে বাড়ি জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবুল মনসুরের। তাঁর কেন্দ্রেও নৌকার প্রার্থী ৩৩৮ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। বিদ্রোহী প্রার্থী নোমান হোসেন ৭০০ ভোট এবং আরেক বিদ্রোহী জায়েদুর রহমান ৪০০ ভোট পান। জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নুর উদ্দিন চৌধুরী বুলবুলের গ্রামের বাড়ি কালিয়ারভাঙ্গা ইউনিয়নের পুরানগাঁও গ্রামে। তাঁর কেন্দ্রে বিজয়ী হয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী এমদাদুল হক চৌধুরী। দ্বিতীয় স্থানে আছেন আরেক বিদ্রোহী নজরুল ইসলাম। নৌকার অবস্থান তৃতীয়। একই ইউনিয়নের শ্রীমতপুর গ্রামে বাড়ি আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুলতান মাহমুদের। শ্রীমতপুরে নৌকার প্রার্থী ৪৮ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থান পান। বিএনপির হাজি মেরাজ পান ৯২৩ ভোট। জেলা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আতাউর রহমানের বাড়ি পানিউমদা ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামে। এই ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী বিজয়ী হলেও তাঁর কেন্দ্রে ফেল করেন।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলা আওয়ামী লীগ প্রতিটি ইউনিয়নের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের নামের তালিকা জেলার মাধ্যমে কেন্দ্রে পাঠায়। কিন্তু কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায়ে এগিয়ে থাকা অনেক প্রার্থী মনোনয়ন পাননি, পান পিছিয়ে থাকা অনেক প্রার্থী। এ নিয়ে মাঠ পর্যায়ে নেমে আসে তীব্র অসন্তোষ। যাঁদের দস্তখতে তালিকা পাঠানো হয়েছিল তাঁদের অন্যতম উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ইমদাদুর রহমান মুকুল। তিনি বর্তমান চেয়ারম্যান হয়েও মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী হয়ে বিজয়ী হন। তবে তাঁকে পদ হারাতে হয়। সাধারণ সম্পাদক সাইফুল জাহানের ছোট ভাই উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাজু আহমেদ বর্তমান চেয়ারম্যান হয়েও মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী হলে তাঁর পক্ষ নিতে গিয়ে সাময়িক বরখাস্ত হয়ে শোকজ পান সাইফুল। একই কারণে উপজেলা চেয়ারম্যান ও যুবলীগের আহ্বায়ক ফজলুর রহমান সেলিম দলের পদ হারান।

কয়েকটি ইউপিতে জামানতও হারিয়েছেন নৌকার প্রার্থী। ইনাতগঞ্জ ইউপিতে নৌকার অবস্থান তৃতীয়। আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আছাবুর রহমান জীবন এক হাজার ৫৮২ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন। চার গুণের বেশি ভোট (ছয় হাজার ৭৭০) পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী নোমান হোসেন (প্রতীক ঘোড়া)। কুর্শি ইউপিতেও নৌকার অবস্থান তৃতীয়; প্রার্থী আলী আহমেদ মুসা পেয়েছেন তিন হাজার ২৩৮ ভোট। আর পাঁচ হাজার ৫৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ খালেদুর রহমান (প্রতীক আনারস)। মুসা নির্বাচনের প্রতীক বরাদ্দের পর লন্ডন থেকে দেশে আসেন। ফলে মাঠে তাঁর অনুপস্থিতি ছিল পরাজয়ের মূল কারণ।

করগাঁও ইউপিতে জামানত হারিয়েছেন নৌকার প্রার্থী বজলুর রহমান। তিনি পেয়েছেন এক হাজার ৬৫৬ ভোট। এখানে সাত হাজার ৭২৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন বিদ্রোহী প্রার্থী (প্রতীক ঘোড়া) নির্মলেন্দু দাশ রানা। বাউসা ইউপিতে তিন প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে নৌকার প্রার্থীর অবস্থান তৃতীয়। নৌকার প্রার্থী আবু সিদ্দীক তিন হাজার ৯১৯ ভোট পেয়েছেন। এখানে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী (প্রতীক আনারস) শেখ সাদিকুর রহমান শিশু ছয় হাজার ২০৪ ভোট পেয়ে জয়ী হন। গজনাইপুর ইউপিতে পাঁচ প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে নৌকার প্রার্থী ছাবের আহমেদ চৌধুরীর অবস্থান তৃতীয়। তিনি পেয়েছেন এক হাজার ৯৭১ ভোট। ছয় হাজার ৮৬৪ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী (আনারস প্রতীক) উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি (বরখাস্ত) ইমদাদুর রহমান মুকুল। কালিয়ারভাঙ্গা ইউপিতে পাঁচ প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে নৌকার প্রার্থীর অবস্থান চতুর্থ। নৌকার প্রার্থী ফরহাদ আহমেদ পেয়েছেন দুই হাজার ৩৫৭ ভোট। এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী (প্রতীক আনারস) ইমদাদুল হক চৌধুরী তিন হাজার ৬১৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন।

ইনাতগঞ্জ ইউপিতে আওয়ামী লীগের পরাজিত প্রার্থী আছাবুর রহমান জীবন অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের অনেক বড় বড় নেতা নৌকার বিপক্ষে কাজ করায় তাঁর এই ফল বিপর্যয় হয়েছে।

নবীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বাউসা ইউপিতে নৌকার পরাজিত প্রার্থী আবু ছিদ্দিক বলেন, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মুশফিক হোসেন চৌধুরী তাঁর নাতি জুনেদ হোসেন চৌধুরীকে প্রার্থী করে তাঁকে পরাজিত করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগে অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, নবীগঞ্জে দলের মধ্যে এখন চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছে। তাই অচিরেই উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন করে উপজেলা, সব ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে নতুন কমিটি গঠন করতে হবে। তা না হলে সংসদ নির্বাচনে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাময়িক বরখাস্তকৃত সাধারণ সম্পাদক সাইফুল জাহান বলেন, ‘আমি দলের প্রতি আন্তরিক। শোকজের জবাব দেব। তবে উপজেলা থেকে যে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা দেওয়া হয়েছিল তা জেলায় কিছু পরিবর্তন হয়েছে এবং কেন্দ্র থেকে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দেওয়ায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে।’ তিনি ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না রাখার দাবি জানান।

হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আলমগীর চৌধুরী জানান, বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণেই নবীগঞ্জে নৌকার আশানুরূপ ফল অর্জন করা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থীদের সাময়িক অব্যাহতি দিয়ে কেন্দ্রে তালিকা পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন হলেই তাঁরা চূড়ান্তভাবে বহিষ্কৃত হবেন।



সাতদিনের সেরা