kalerkantho

শনিবার । ১৫ মাঘ ১৪২৮। ২৯ জানুয়ারি ২০২২। ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

‘বীর মুক্তিযোদ্ধার চেয়ে পৃথিবীতে বড় সম্মান আর নেই’

৫০ বছর পার করেছে বাংলাদেশ। বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের বড় অংশ এখন জীবনসায়াহ্নে। তাঁদের মধ্য থেকে ৮০ বছর পেরিয়ে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে লিখছেন কালের কণ্ঠের প্রতিনিধিরা

মো. আব্দুল হালিম, ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ)    

২ ডিসেম্বর, ২০২১ ০৮:৩৩ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘বীর মুক্তিযোদ্ধার চেয়ে পৃথিবীতে বড় সম্মান আর নেই’

‘যাঁরা সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা, তাঁরা তো কোনো কিছু পাওয়ার আশায় যুদ্ধে যাননি। তাঁরা যুদ্ধে গেছেন নিজের মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষা করতে, স্বাধীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রের জন্য। তাঁদের কোনো কিছুর বিনিময়ে মূল্যায়ন করতে পারবে? পারবে না। ’

মহান বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তীতে স্বাধীনতা নিয়ে অনুভূতি জানাতে বললে এভাবেই শুরু করেন ফুলবাড়িয়ার যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা সমসের আলী।

বিজ্ঞাপন

কালের কণ্ঠের প্রতিনিধি গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সোয়াইতপুর গ্রামে গিয়ে কথা বলেন তাঁর সঙ্গে।

ফুলবাড়িয়া উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নের সোয়াইতপুর পশ্চিমপাড়া গ্রামের মৃত সাহেব আলী আকন্দের দুই ছেলের মধ্যে বড় সমসের আলী। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৩৫। ১৯৫৮ সালে বিয়ে করেন। মা, বাবা, স্ত্রী ও শিশু তিন পুত্রসন্তান ঘরে রেখে যুদ্ধে অংশ নেন সমসের আলী।

২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে বাঙালি জাতি ধীরে ধীরে রুখে দাঁড়ায় পাকিস্তানি হানাদার সেনাদের বিরুদ্ধে। জুলাই নাগাদ মুক্তিযোদ্ধা-জনতা নানা জায়গায় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে থাকে। এমন প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য বাড়ির পাশেই সোয়াইতপুর গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের কম্পানি কমান্ডার ইদ্রিস আলীর কাছে যান সমসের। ১৫ জুলাই ভোররাতে প্রশিক্ষণের জন্য টাঙ্গাইলের সখীপুর বহেড়াতলী ক্যাম্পে পাঠানো হয়। সেখানে ১৫ দিন রাইফেল চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়ে সোয়াইতপুর ক্যাম্পে ফেরেন। কম্পানি কমান্ডার ইদ্রিছ আলী ও গ্রুপ কমান্ডার আব্দুল হামিদের নেতৃত্বে তখন থেকে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিতে থাকেন। ১৫ নভেম্বর আছিম বাঁশদি গ্রামে মুখোমুখি যুদ্ধে সমসের আলীর বাঁ ঊরুতে রাইফেলের গুলি লাগে। সহযোদ্ধারা উদ্ধার করে তাঁকে সোয়াইতপুর বাজারে নিয়ে যান। সেখানে ডা. মো. আব্দুল আজিজ তাঁর চিকিৎসা করেন। কিছুটা সুস্থ হয়ে আবারও যুদ্ধে চলে যান সমসের আলী। ফুলবাড়িয়া, ভালুকা ও মুক্তাগাছা থানায় একাধিক সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন তিনি। পরে বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মো. আশিকুর রহমানের কাছেও চিকিৎসা নেন।

এখন সোয়াইতপুর গ্রামে নিতান্ত ছোট্ট একটি টিনশেড ঘরে স্ত্রী জুবেদা আক্তারকে নিয়ে বাস করেন সমসের আলী। তিন ছেলেই বিয়ে করে আলাদা। স্বাধীনতার আগে ও পরে অন্যের জমি বর্গা নিয়ে কৃষিকাজ করতেন। পাকিস্তানি সেনার বুলেট তাঁর প্রাণ কেড়ে নিতে না পারলেও অনেকটাই পঙ্গু করে গেছে। যুদ্ধাহত এই বীর মুক্তিযোদ্ধা এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। লাঠিতে ভর করে দাঁড়াতে হয়। একা চলাফেরা করতে পারেন না। ছেলে বা নাতিদের সহায়তা নিয়ে মাঝেমধ্যে বাজারে যান। এ ছাড়া বাড়ির পাশের মসজিদ পর্যন্তই তাঁর চলাফেরা সীমাবদ্ধ। প্রায়ই নানা অসুস্থতায় ভোগেন একাত্তরের সাহসী এই বীর সেনা।

যুদ্ধদিনের স্মৃতি : মুক্তিযুদ্ধের সময় যে ভয়ানক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন, সে কথা ভাবলে এখনো শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়, জানালেন সমসের আলী। পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকাররা গ্রাম থেকে পুরুষদের ধরে নিয়ে হত্যা করত। নারীদের করত ধর্ষণ। আশপাশের গ্রামে তারা বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করত। একের পর এক এসব কথা শোনার পর নিজেকে ঠিক রাখতে পারেননি। নিজেকে প্রশ্ন করতেন—মা-বোনদের সম্মান রক্ষা করতে না পারলে বেঁচে থেকে কী হবে! যুদ্ধ চলাকালে একদিন জমিতে কাজ করছিলেন। হঠাৎ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের কথা মনে এলো। কাজ রেখে জমি থেকে উঠে সরাসরি চলে গেলেন সোয়াইতপুর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে। বললেন, ‘আমি যুদ্ধে যাব। ’ লুঙ্গি ও গামছা পরনে সেই যে বাড়ি থেকে বের হলেন, আর ঘরে ফেরেননি।

‘যুদ্ধ চলাকালে অনেক সময় তিন দিনেও এক দিন ভাতের দেখা পাইনি। গাছের লতাপাতা খেয়েছি। ক্ষুধার যন্ত্রণায় ভাত দেখলে মনে হয় পাগল হয়ে যেতাম,’ মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রামের কথা স্মরণ করে বলেন সমসের আলী। ফুলবাড়িয়ার রাঙ্গামাটিয়া গ্রামে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে একটানা প্রায় তিন দিন সম্মুখযুদ্ধ করেন। ২০ থেকে ২৫ জন পাকিস্তানি হানাদার নিহত হয়। অনেক মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। এক পর্যায়ে হানাদার বাহিনী পিছু হটে।

সমসের আলীর মনে আছে, মা, বাবা, স্ত্রী ও শিশুসন্তানরা রাজাকারদের ভয়ে পালিয়ে থাকত। মাঝেমধ্যে গোপনে পরিবারের খোঁজখবর নিতেন। স্ত্রী-সন্তানদের মায়া ছেড়ে মৃত্যু নিশ্চিত জেনে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর টাঙ্গাইল শহরের বিন্দুবাসিনী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নিজের রাইফেল জমা দেন। এরপর ফিরে যান পরিবারের কাছে। বাড়িতে এসে দেখেন, সব চুরি হয়ে গেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। প্রায় সবার ঘরে অভাব। আবারও চাষের কাজ শুরু করেন। কষ্টেসৃষ্টে জীবন চলতে থাকে। ১৯৭২ সালে রক্ষী বাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৭৪ সালে বাড়ি চলে আসেন। এক পর্যায়ে বাবার যক্ষ্মা হলে চাষের প্রায় সব জমি বিক্রি করে তাঁর চিকিৎসা করান। নিঃস্ব হয়ে যান সমসের আলী। আবার শুরু হয়ে অন্যের জমিতে শ্রম দেওয়া।

স্বাধীন দেশে জীবন : মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সরকার ভাতা চালু করার পর প্রথমে ৩০০ টাকা ভাতা পেতেন সমসের আলী। স্মৃতি থেকে বললেন, সম্ভবত ১৯৯৮ সালে সরকারিভাবে এককালীন ৪০ হাজার টাকা পান। ওই অর্থে কিছু জমি কেনেন। এখন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মাসিক ২৫ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছেন। এর ওপর ভরসা করেই চলেন। তার ওপর মেয়ের জামাই, নাতি, ছেলেদের কাউকে কাউকে সাহায্য করতে হয়। ভাতার টাকা যা পান, তা দিয়ে এখন আর তেমন চলে না। তবে নিজেকে বোঝান, কোনো কিছু পাওয়ার আশায় তো যুদ্ধে যাননি। স্বাধীন একটি দেশ চেয়েছিলেন। তা পেয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেরিতে হলেও সম্মান পেয়েছেন। তবে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের দৌরাত্ম্য আর সত্যিকারের অনেক মুক্তিযোদ্ধার দুর্গতিতে ক্ষুব্ধ সমসের আলী। আক্ষেপ করে বলেন, ‘যুদ্ধের সময় মুক্তিযুদ্ধে নেওয়ার জন্য বাড়ি বাড়ি যুবকদের খুঁজেছি। আমাদের দেখে অনেকে পালিয়ে গেছে। জোর করেও যুদ্ধে নিতে পারিনি। আর এখন মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার জন্য কত কিছু করছে! ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা কাগজপত্র তৈরি করে প্রমাণ করতে চাইছে তারা মুক্তিযোদ্ধা! এসবের কারণে অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ের নামে শেষ বয়সে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ’

মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের গর্ব : ‘বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র আমাদের সম্মান দিচ্ছে। প্রত্যাশার চেয়েও প্রাপ্তি অনেক বেশি। রাজাকারদের ভয়ে একসময় মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিতে পারতাম না। তাদের ফাঁসি দেখে যেতে পারলাম। বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিলে সবাই সম্মান করে। আমি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, পৃথিবীতে এর চেয়ে বড় সম্মান আমার কাছে আর কিছুই না,’ পরম আত্মতৃপ্তি ঝরে পড়ে এই বীর মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠে।

সমসের আলীর ছেলেমেয়েদের দাবি, সোয়াইতপুর তমালতলা সড়ক থেকে নবারবাইদ সড়কটির নাম যেন তাঁদের বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবার নামে রাখা হয়। আর সরকারিভাবে একটি পাকা ঘর তৈরি করে দিলে শেষ বয়সে একটু স্বস্তিতে কাটাতে পারতেন।



সাতদিনের সেরা