kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ মাঘ ১৪২৮। ১৮ জানুয়ারি ২০২২। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

ঈশ্বরদীতে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার নেপথ্যে চরের জমি!

ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি   

১ ডিসেম্বর, ২০২১ ২১:৪৯ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঈশ্বরদীতে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার নেপথ্যে চরের জমি!

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন পরবর্তিতে দুই গ্রুপের সহিংসতায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটপাট, বাড়িতে গিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও ব্যাপক গোলাগুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নারী পুরুষসহ অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছে। এদের মধ্যে গুলিবিদ্ধসহ ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর জখম হয়ে ঢাকা, রাজশাহী ও পাবনা মেডিক্যালে ১০ জন ভর্তি হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার রাত সাড়ে আটটার দিকে ঈশ্বরদীর লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নের কামালপুর চরাঞ্চলে শামসুল আলম স্বপন গ্রুপ ও কামাল প্রাং, আসাদুল প্রাং গণ গ্রুপের মধ্যে সহিংসতার এই ঘটনা ঘটে।

স্বপন গ্রুপের আলম বাদশা গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল, জনি ইসলাম, মামুন হোসেন, শাহ জামাল, শফি ঘোষকে প্রথমে পাবনা ও পরে রাজশাহী মেডিক্যালে ভর্তি করা হয়। এ ছাড়া ধারালো অস্ত্রের আঘাতে কটা মালিথাসহ নারী পুরুষসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়।

কামাল হোসেন, মেম্বার আসাদুল প্রামানিক ও মেম্বার তরিকুল প্রামানিক গ্রুপের  নুরুল ইসলামের ছেলে আল আমিন, সাইফুল ইসলাম এবং আলেয়া খাতুন নামের এক নারী ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হয়ে ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছে। এ ছাড়া এই গ্রুপের শফি ঘোষের স্ত্রী বিলকিস বেগমসহ ঘোষ বাড়ির ইমারত ঘোষের স্ত্রীসহ কয়েকজন ছেলে আহত হয়ে বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা নিচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে তাদের নাম জানা যায়নি। কামাল হোসেন, মেম্বার আসাদুল প্রাং ও মেম্বার তরিকুল ইসলাম প্রামানিক চেয়ারম্যান আনিস উর রহমান শরীফের সমর্থক।

নৌকার প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করে মেম্বারের পক্ষে কাজ করার অভিযোগে এই হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে এর নেপথ্যে লক্ষ্মীকুন্ডা চরের জমির দখল কেন্দ্রীক দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছে।

গত সোমবার থেকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত ঘটনাস্থল লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নের কামালপুর চর, সাহাপুর ইউনিয়নের চরগড়গড়ি আলহাজ মোড় সরেজমিন গিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, জনপ্রতিনিধি ও জনসাধারণের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নে কয়েক হাজার বিঘা সরকারি খাস জমিতে চরের মানুষ ঈশ্বরদী সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে নিয়ে চাষাবাদ করতেন। কিন্তু চলতি বছরের শুরুর দিকে পাবনা-৪ (ঈশ্বরদী-আটঘড়িয়া) আসনের বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুজ্জামান বিশ্বাস এমপি ভূমি অফিসে চাপ দিয়ে উক্ত খাসজমি মাত্র ১৭ লাখ টাকায় তাঁর ছেলে তৌহিদুল ইসলাম দোলন বিশ্বাসকে লিজ পাইয়ে দেন। এমপির নিকট আত্মিয় আওয়ামী লীগের স্থানীয় যুবলীগ নেতা শামসুল আলম স্বপন এই জমি দোলন বিশ্বাসের নিকট থেকে প্রায় কোটি টাকা দিয়ে লিজ গ্রহণ করেন। পরে স্বপন চরের অন্যান্য ব্যক্তিদের নিকট সেই জমি লিজ প্রদান করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বপনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা কামাল হোসেন প্রাং, আসাদুল প্রাং ও তরিকুল প্রামানিকের তীব্র বিরোধের সৃষ্টি হয়। সেই বিরোধই চলমান ছিল। 

সূত্রগুলো মতে, সদ্য সমাপ্ত হওয়া নির্বাচনে শামসুল আলম স্বপনের পক্ষে থাকা লোকজন লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী সাবেক ভূমিমন্ত্রী প্রয়াত শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর ছোট ভাই আনিস উর রহমান শরীফের পক্ষে কাজ না করে মেম্বারের পক্ষে কাজ করেছেন বলে প্রচার করা হয়। এরপর নির্বাচনে লক্ষ্মীকুন্ডা ইউপির ৮নং ওয়ার্ড থেকে আসাদুল প্রামানিক ও ৯নং ওয়ার্ড থেকে তরিকুল ইসলাম প্রামানিক বিজয়ী হন। এর পরের দিন সোমবার সকালে কামাল হোসেন, সদ্য নির্বাচিত মেম্বার আসাদুল প্রাং ও তরিকুল প্রামানিকের নেতৃত্বে মিছিল করে লোকজন স্বপনের সমর্থক শাহজামালসহ কয়েকজনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর, লুটপাট করে। এই ঘটনায় পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার দাবি করলেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর গত বুধবার সকালে দুই গ্রুপই সশস্ত্র মুখোমুখি অবস্থান নেয়। আতংকিত হয়ে স্থানীয়রা থানায় খবর দেয়। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে অবস্থান নেয়। এরপর পুলিশ রাত আটটার দিকে স্থান ত্যাগ করার পর কামাল প্রাং, মেম্বার আসাদুল প্রাং, মেম্বার তরিকুল প্রাং বন্দুক, টুটু পিস্তল, ধারালো অস্ত্র সজ্জিত বাহিনী নিয়ে স্বপন গ্রুপের শফি ঘোষের বাড়িতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা এই সময় কুপিয়ে ও গুলিবিদ্ধ করে নারী পুরুষসহ কয়েকজনকে গুরুতর আহত করে। এই খবর মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে দুই গ্রুপের মধ্যে ব্যাপক গুলাগুলি শুরু হয়ে যায়। ঘণ্টাখানিক ধরে কয়েক দফা হামলা ও গুলাগুলিতে দুই গ্রুপের অন্তত ২৫ জন আহত হয়। খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ঈশ্বরদী সার্কেল মো. ফিরোজ কবির ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মো. মাসুদ আলমের নেতৃত্বে পুলিশের বিশাল একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। তখন দুই গ্রুপই চরের মধ্যে অবস্থান নেই।

সূত্রগুলো অভিযোগ করে আরো জানায়, ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জনবিচ্ছিন্ন নৌকার প্রার্থীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন জায়গা থেকে ভাড়াটি অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী আনা হয়েছিল। নির্বাচনের আগে লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের অভিযান চালানো হয়নি। এই কারণে ইউনিয়ন নির্বাচনকে ঘিরে স্থানীয় ও ভাড়াটি সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের মহড়া ও প্রদর্শন ছিল চোখের পড়ার মতো। নির্বাচন ঘিরে মানুষের মাঝে ছিলো তীব্র আতংক।

এই ঘটনায় শামসুল আলম স্বপন মুঠোফোনে কালের কণ্ঠকে জানান, তারা সবাই আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান। দলের বিভিন্ন পদে দায়িত্বরত রয়েছে। ইউনিয়ন নির্বাচনে নৌকা প্রার্থী আনিস উর রহমান শরীফের পক্ষে কাজ করার পাশাপাশি মেম্বার পদে তাদের কেউ কেউ কাজ করেছে। এই ঘটনাকে রংচং মাখিয়ে আমাদের লোকজনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ঘর বাড়িতে হামলা চালিয়েছে। কুপিয়ে ও গুলিবিদ্ধ করে নারী পুরুষসহ অন্তত ১৫ জনকে গুরুতর জখম করেছে। এদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশংকাজনক বলে দাবি করেছেন স্বপন।

অপর গ্রুপের কামাল হোসেন প্রাং, মেম্বার আসাদুল প্রাং ও মেম্বার তরিকুল প্রামানিকের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ঈশ্বরদী থানার ওসি মো. আসাদুজ্জামান আসাদ মুঠোফোনে কালের কণ্ঠকে জানান, লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নের চরের জমি নিয়ে শামসুল আলম স্বপনের সঙ্গে কামাল হোসেন, আসাদুল প্রাং ও তরিকুল প্রামানিকের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। সদ্য সমাপ্ত হওয়া ইউপি নির্বাচনে আসাদুল প্রামানিক ও তরিকুল প্রামানিক মেম্বার পদে বিজয়ী হয়ে হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত নারী পুরুষসহ অন্তত ৮/১০ জন উদ্ধার করে হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। গুলাগুলি করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে অবস্থান নিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। দুই গ্রুপের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেই দুই গ্রুপের সবাই পালিয়ে দুর্গম চরে অবস্থান নেয়। দুই গ্রুপের কাউকেই আটক করা সম্ভব হয়নি বলেও জানান ওসি। 

এদিকে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত উভয় পক্ষের লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল।



সাতদিনের সেরা