kalerkantho

শুক্রবার । ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৩ ডিসেম্বর ২০২১। ২৭ রবিউস সানি ১৪৪৩

'লবণ আমদানি করা হলে প্রান্তিক চাষিরা মাঠে নামবে না'

বিশেষ প্রতিনিধি, কক্সবাজার   

২৩ নভেম্বর, ২০২১ ০২:২৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



'লবণ আমদানি করা হলে প্রান্তিক চাষিরা মাঠে নামবে না'

মৌসুমের শুরুতে লবণ আমদানি করা হলে প্রান্তিক চাষিরা মাঠে নামবে না। মাঠে চাষিরা না নামলে দেশের একমাত্র লবণ উৎপাদন এলাকা কক্সবাজার উপকূলের অন্তত ৬০ হাজার একর লবণের মাঠ খালি পড়ে থাকবে। এ ছাড়া লবণশিল্পে জড়িত ১০ লাখ মানুষ হয়ে পড়বে বেকার।

সোমবার (২২ নভেম্বর) কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে শিল্পসচিব জাকিয়া সুলতানার সঙ্গে লবণ চাষি ও মিল মালিকদের মতবিনিময়সভায় বক্তারা এ কথা বলেন। লবণচাষিদের চলমান সমস্যাদি চিহ্নিত করে উৎপাদন গতিশীল করার উদ্দেশ্যে এ সভার আয়োজন করা হয়।

সভায় মহেশখালীর প্রান্তিক লবণচাষি সাজেদুল করিম বলেন, 'কষ্ট করে লবণ উৎপাদন করে মিলছে না ন্যায্য মূল্য। এতে শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। চাষিরা লবণের ভালো দাম পেলে রপ্তানি করাও সম্ভব। তাই লবণের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করা হোক।'

টেকনাফের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শফিক মিয়া বলেন, 'এবার ডিজেল ও পলিথিনের দাম বেড়েছে। বেড়েছে শ্রমিকের মজুরি। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন লবণচাষিরা। তিনি বলেন, আগামী সপ্তাহে উৎপাদন শুরু হবে। তার মধ্যে লবণ আমদানি করা হলে চাষিরা কিভাবে উৎপাদনে যাবে?'

লবণচাষি কল্যাণ পরিষদের সভাপতি মোস্তফা কামাল চৌধুরী বলেন, 'দিন দিন চাষের জমি কমে যাচ্ছে। জমি অধিগ্রহণের কারণে মহেশখালীতে ৭ হাজার ও মাতারবাড়িতে ৩ হাজার একর জমি কমে গেছে। এই মুহূর্তে আমদানির সিদ্ধান্ত নিলে চাষিরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।'

বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নুরুল কবির বলেন, 'লবণ নিয়ে যে আইন করা হয়েছে তাতে অনেক জটিলতা আছে। আইন মানতে গিয়ে ছোট মিলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাই আইনের বিধি-বিধান বাস্তবায়নে শিথিল করা প্রয়োজন।'

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, 'সোডিয়াম সালফেড বিতর্কে গত বছর মাঠে নামেনি চাষিরা। লবণের চাহিদা ও ঘাটতি নিয়ে কমিটি গঠনের মাধ্যমে জরিপ করতে হবে। আমদানি করার সিদ্ধান্ত ছয় মাস আগে থেকে চাষিদের জানানো প্রয়োজন।

মহেশখালী উপজেলা চেয়ারম্যান শরীফ বাদশা বলেন, মহেশখালীতে প্রচুর জমি রয়েছে। লবণ উৎপাদনে কোনো ঘাটতি হবে না। ঘাটতি হলে সব লবণ তিনি দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। 

মহেশখালী পৌরসভার মেয়র মকছুদ মিয়া বলেন, ৩ বছর আগে ৪০০ একর জমিতে লবণ চাষ করেছি। কিন্তু গতবার শুধু ৫০ একর জমিতে লবণ চাষ করতে পেরেছি। তাতেও ১০ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে।

তিনি বলেন, মিল মালিকরা এক মণ লবণে ওজন হিসেবে ৪৫ থেকে ৪৮ কেজি ধরে। তবুও ন্যায্য মূল্য দেয় না। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের মিল মালিকরা শোষণ করে আসছে চাষিদের। তাই চাষিরা লবণের ভালো দাম না পেলে চাষ করবে না। চাষি ও এখানকার মিল মালিকরা যেন বাঁচতে পারে তার আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘কক্সবাজারের নুন খাই, তাই কক্সবাজারের গুণ গাই।' কক্সবাজারের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আলাদা ভালোবাসা রয়েছে। তাই তিনি কক্সবাজারের লবণচাষি-মিল মালিকদের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে লবণ বোর্ড গঠন করা হোক। আমদানির মাধ্যমে লবণশিল্প ধ্বংস করতে দেওয়া হবে না।

সংসদ আশেক উল্লাহ রফিক এমপি বলেন, 'আমদানি করা হলে মাঠে লবণ পড়ে থাকবে। সরকারের চাহিদা মোতাবেক কক্সবাজার থেকে লবণ জোগান দিতে পারলে আর আমদানির প্রয়োজন নেই। চাষিরা লবণের দামও পাবে না, আয়োডিনের জন্য চাপও দেওয়া হবে সেটা হতে পারে না। 
আয়োডিনের জন্য শুধু লবণনির্ভর না হয়ে বিকল্প পথ খুঁজতে হবে। আমদানি করে চাষি ও মিল মালিকদের নিয়ন্ত্রণের চক্রান্ত করা হচ্ছে। এতে রাজনৈতিভাবে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি শিল্পসচিব জাকিয়া সুলতানা বলেন, লবণ মাঠের নৈরাজ্য দূর করতে প্রয়োজনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। সবার মতামত নিয়ে জাতীয় লবণ নীতিমালা করা হবে। তিনি আরো বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী চান দেশের মানুষ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকুক। কারণ দেশের মানুষ না বাঁচলে অর্থনৈতিক মুক্তি মিলবে না। তাই বেশি ঘাটতি দেখা দিলেই আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। মে-জুন মাসে সেই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হবে সবাইকে। প্রধানমন্ত্রীর হাতকে শক্তিশালী করতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।'

সভায় বিসিকের চেয়ারম্যান মোসতাক হাসান বলেন, মৌসুমের শুরুতে এ রকম মতবিনিময়সভা আয়োজনের উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশের চাহিদা মাফিক উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্য চাষিদের উদ্বুদ্ধ করা। যেহেতু সরকার চলতি মৌসুমে আরো এক লাখ মেট্রিক টন বাড়িয়ে এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ২৩ লাখ মেট্রিক টনে। গেল বছর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২২ লাখ মেট্রিক টন।

সভায় সমাপনী বক্তব্য দেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাহিদ ইকবাল। লবণশিল্পের সার্বিক অবস্থা নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিসিকের (উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ) উপমহাব্যবস্থাপক মো. সরওয়ার হাসান। স্বাগত বক্তব্য দেন কক্সবাজার বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভুঁইয়া।



সাতদিনের সেরা