kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২ ডিসেম্বর ২০২১। ২৬ রবিউস সানি ১৪৪৩

প্রতিবন্ধী শাহিদার স্বপ্নের প্রতিবন্ধী স্কুলের যাত্রা শুরু

জামাল হোসেন, বেনাপোল প্রতিনিধি    

১৭ নভেম্বর, ২০২১ ১৩:০৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রতিবন্ধী শাহিদার স্বপ্নের প্রতিবন্ধী স্কুলের যাত্রা শুরু

দুটি পা ও একটি হাত বাদেই জন্ম নেওয়া প্রতিবন্ধী শাহিদা খাতুন (৩০) বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি (অনার্স-মাস্টার্স) অর্জন করার পরও জোটেনি বিশেষ কোটায় কোনো সরকারি বা বেসরকারি চাকরি। তবে থেমে থাকেননি তিনি। নানা প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে সমাজ উন্নয়নে বিভিন্ন সেবামূলক কাজকর্মের জন্য একাধিকবার ‘জয়িতা’ সম্মাননা পেলেও আজও তিনি আলোর দিশা পাননি। শাহিদার স্বপ্ন ছিল একটি প্রতিবন্ধী স্কুল গড়ে তোলা। যেখানে হতাশাগ্রস্ত সমাজের বিশেষ প্রতিবন্ধী নারী-পুরুষের পাশাপাশি বয়স্কদের বিনা মূল্যে লেখাপড়া ও হস্তশিল্পের কাজের প্রশিক্ষণ দেবেন তিনি। কেউ এগিয়ে না এলেও দেশসেরা উদ্ভাবক শার্শার কৃতী সন্তান মিজানুর রহমান স্কুল নির্মাণে এগিয়ে আসেন। প্রতিবন্ধী স্কুলের কাজ শেষ হওয়ায় চোখে রঙিন স্বপ্ন আর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটেছে তার।

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামের মুদি দোকানি রফিউদ্দিনের ছয় সন্তানের মধ্যে চতুর্থজন শাহিদা। ১৯৯১ সালে শাহিদার জন্ম হলে গোটা পরিবারে যেন আঁধার নেমে আসে। কারণ, মেয়েটির একটি হাত ও দুটি পা নেই। একটি মাত্র হাত (বাঁ হাত) দিয়েই করতে হয় তার সব কাজ। শাহিদার মা শিমুলিয়ার খ্রিস্টান মিশনে হাতের কাজ করতে যেতেন, সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন শাহিদাকে। সেখানেই মিশনের সিস্টার জোসেফ মেরি তাকে হাতেখড়ি দেন। শাহিদার বয়স পাঁচ বছর হলে সেন্ট লুইস প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে নিয়ে যান। কিন্তু প্রতিবন্ধী হওয়ায় স্কুলের শিক্ষকরা তাকে ভর্তি করতে অস্বীকৃতি জানান। পরবর্তী সময়ে জোসেফ মেরির বদৌলতেই সুযোগ হয় স্কুলে পড়ার। কখনো মা-বাবা, কখনো ভাই-বোনের কোলে চড়ে স্কুলে যাতায়াত শুরু হয় শাহিদার। রোদ, বৃষ্টি, ঝড়- কোনো কিছুই তাকে স্কুল থেকে দূরে রাখতে পারেনি। এভাবেই ২০০৭ সালে সেন্ট লুইস হাই স্কুল থেকে এসএসসি ও ২০০৯ সালে শিমুলিয়া ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। যশোর সরকারি এম এম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ২০১৫ সালে এমএ পাস করেন শাহিদা। অসম্ভবকে সম্ভব করেই তিনি প্রমাণ করেছেন অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে অসম্ভব বলে কোনো কিছু নেই। কারো দয়া ও অনুগ্রহ নয়, আত্মনির্ভরশীল হয়েই এগিয়ে যেতে চান শাহিদা। প্রতিবন্ধী শিশু ও নারীদের উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চান।

শাহিদার বাবা রফিউদ্দিন বলেন, শাহিদা ছোটবেলায় সব সময় হতাশ থাকত। তার কোনো খেলার সঙ্গী ছিল না। শুধু  বিকলাঙ্গ (প্রতিবন্ধী) হওয়ায় অন্য বাচ্চারা তার কাছ থেকে দূরে থাকতেন। তিনি এক নিঃসঙ্গ জীবন অতিবাহিত করতেন। তার সহপাঠী ও সমবয়সীরা পায়ে ভর দিয়ে দৌড়াত, খেলত, নাচত, ছুটত, সাঁতার কাটত। কিন্তু এর কোনো কিছুই যখন সে করতে পারত না, তখন সে মনস্থির করল, এই জীবন যখন অন্য জীবনের মতো চলবে না, তখন এই জীবনকে অন্যভাবে গড়তে হবে। তখন সে পড়ালেখা শুরু করল। যেহেতু সে নিজে চলাফেরা করতে পারে না, তাই উদ্ভাবক মিজানুর রহমান তাকে একটা হুইলচেয়ার দেওয়ায় এখন সে মোটামুটি চলাফেরা করতে পারে।

শাহিদা খাতুন বলেন, আমরা ছয় ভাই-বোন। আমি ভাই-বোনের মধ্যে চার নম্বর। আমার আব্বু মুদির ব্যবসা করেন। প্রতিবন্ধী হিসেবে নিজেকে সমাজের বোঝা হিসেবে বাঁচতে চাইনি। তাই পড়ালেখা শুরু করি। ‘প্রতিবন্ধী ভাতা’ ছাড়া সরকারি বেসরকারি কোনো সহায়তা পাইনি। তার পরও কঠিন প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে দেখিয়ে দিয়েছি ‘আমরাও পারি’। 

শাহিদা বলেন, ২০১৫ সালে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে বেকার জীবনের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে শিখেছি হস্তশিল্প ও কুঠির শিল্পের নানা কাজ। কিন্তু ভাগ্যের নির্মমতায় হয়নি কোনো সুযোগ-সুবিধা। এমনকি সরকারি কোটায় চাকরির আশা থাকলেও তা ভাগ্যে জোটেনি। বয়সসীমাও পার হতে আর মাত্র একটি বছর বাকি। তাই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। দিনের পর দিন যখন সব আশা-ভরসা ব্যর্থ হতে চলেছে, ঠিক তখনই নিজ গ্রামে একটি প্রতিবন্ধী স্কুল গড়ে তুলতে সহযোগিতা চেয়েছিলাম সমাজের বিত্তশালী ও বিবেকবান মানুষের কাছে। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। সর্বশেষ শার্শার দেশসেরা উদ্ভাবক মিজানুর রহমান প্রতিবন্ধী স্কুল গড়ার উদ্যোগ নিয়ে প্রাথমিক কাজটি শেষ করেছেন। মাটিতে বসে শিশুদের ক্লাস শুরু করেছি। এখনো অনেক কিছু বাকি। প্রতিবন্ধী স্কুলের জন্য চেয়ার, বেঞ্চ, ফ্যান, বিদ্যুৎ, টয়লেট, পানির ব্যবস্থাসহ প্রতিবন্ধী শিশু  ও বয়স্কদের জন্য চাই পরিবহনের সুবিধা।

উদ্ভাবক মিজানুর রহমান বলেন, শাহিদা একজন প্রতিবন্ধী হলেও একটিমাত্র হাতে ভর করে লেখাপড়ার সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেছেন। চাকরি না পেয়ে যখন তিনি হতাশ হয়ে পড়েন, তখন এটা আমার নজরে আসে। তার স্কুল তৈরির কথা আমি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করলে অনেকেই সহায়তা দিতে চান। সবার সহায়তায় কাজটি আমি এগিয়ে নিয়েছি। শাহিদার স্কুল তৈরির স্বপ্নকে যারা বাস্তবায়ন করতে অর্থায়ন করেছেন তাদের প্রতি আমি চিরকৃতজ্ঞ। বাঁশ-খুঁটি টিন দিয়ে ঘরটি তৈরি করা হয়েছে। ছোট ছোট শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম চলছে।

শাহিদার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই স্কুলে শুধু প্রতিবন্ধী শিশুরাই নয়, বয়স্ক ও বিধবা নারীদের শিক্ষার ব্যবস্থা করব। শিক্ষিত প্রতিবন্ধী নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানের শতভাগ সুযোগ থাকবে। লেখাপড়ার পাশাপাশি এখানে প্রতিবন্ধীরা হস্তশিল্প ও কুঠির শিল্পের নানা কাজ শিখে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখবে।

তিনি আরো বলেন, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে সারা দেশে প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় চালু হয়েছে। সরকার যাচাই-বাছাই করে স্কুলগুলোর অনুমোদন দিলে প্রতিবন্ধীদের উপকার হতো। সেখানে যেমন শিক্ষিত প্রতিবন্ধীদের চাকরি হতো, তেমনই কর্মসংস্থানও হতো। আবার প্রতিবন্ধী শিশুরা শিক্ষিতও হতো। এ বিষয়ে সরকারের আন্তরিক হওয়া দরকার। প্রতিবন্ধী দেখলেই মানুষ মনে করে তাকে দিয়ে কাজ হবে না। কিন্তু মানুষ তাকে কাজ দিয়ে বলে না তুমি করে দেখাও। সেই সুযোগ দিলে কিন্তু সে পারবে। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার।

অদম্য মেধাবী মাস্টার্স ডিগ্রিধারী শাহিদার শেষ স্বপ্ন প্রতিবন্ধী স্কুল সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন শাহিদা খাতুন। 

শাহিদা খাতুনের বিকাশ নম্বর- ০১৭৪৭১৫৪১৬০।



সাতদিনের সেরা