kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

ঘূর্ণিঝড়ের মতোই লণ্ডভণ্ড সিডরের জীবন

এম এ মোতালেব, মোংলা   

১৫ নভেম্বর, ২০২১ ১৯:৫৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঘূর্ণিঝড়ের মতোই লণ্ডভণ্ড সিডরের জীবন

২০০৭ সালের প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় সিডর লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল পুরো দক্ষিণ উপকূলীয় এলাকা। সেই ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে উপকূলের মানুষেরা। আর ওই সকল মানুষদের থেকে বাদ পড়েনি সিডর সরকারও। সেই ঘূর্ণিঝড়ের রাতে মোংলার একটি আশ্রয় কেন্দ্রে জন্মগ্রহণ করা সিডর সকারের জীবনও এখন লণ্ডভণ্ড অবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে। বিভিন্ন সময়ে অনেক গণ্যমাধ্যমের শিরোনামও হয়েছে সিডর সরকার। তবে তাতে তার ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি মোটেও। তা নিয়েও ক্ষোভ-আক্ষেপ রয়েছে তার পরিবার এবং গ্রামবাসীর।

দরিদ্র দিনমজুর ও জেলে পিতার ঘরে জন্ম নেওয়া সিডরের মাও চলে গেছেন অন্যত্র। বাবাও কাজের সন্ধানে থাকেন ঘরের বাহিরে বাহিরে। মা নেই, আর বাবা থেকেও না থাকার মতই অবস্থা। এমতাবস্থায় সিডর থাকেন দাদীর কাছে। পরিবারের স্নেহ মমতা থেকে বঞ্চিত সিডরের ভবিষ্যৎও এখন অন্ধকারের দিকে। কষ্টের মধ্যে থেকেও লেখাপড়া শেখার আগ্রহ থাকা সিডরের নতুন বছরে নতুন স্কুলে ভর্তি হওয়াটাও এখন অনিশ্চিত। লেখাপড়া করতে না পারলে বাবার মতোই নদীতে জাল ধরতে হবে অদম্য মেধাবী সিডরকে।

সিডর সরকার (১৪)। মোংলার কানাইনগর গ্রামের জেলে ও দিনমজুর পিতা জর্জি সরকারের (৩৮) একমাত্র সন্তান। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর প্রলয়ংকারী সুপার সাইক্লোন সিডরের রাতে সেখানকার একটি আশ্রয় কেন্দ্রে জন্ম হয় তার। ঝড়ের রাতেই জন্ম হওয়ায় পরিবার তার নাম রাখেন সিডর। শত অভাব অনটনের মধ্যে পিতা জর্জি সিডরকে গ্রামের সেন্ট লুকস প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করান। সেখানে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনার পর সিডরকে দেন খুলনার দাকোপ উপজেলার বাজুয়া ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখানে গিয়ে ৪র্থ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে হোস্টেলে থেকে ৭ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করে আসছিল সিডর। কিন্তু হোস্টেলের খরচ মিটাতে না পারায় কয়েক মাস আগে সেখান থেকে বাড়িতে চলে আসে সিডর। ব্যয় বহনের সামর্থ্য না থাকায় সেখানে আর ফিরে যাওয়ার সুযোগও নেই তার। তাই গ্রামে থেকে শহরের কোনো একটি স্কুলে নতুন করে ভর্তি হতে হবে সিডরকে। নতুন স্কুলে ভর্তি করিয়ে পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থাই নেই দিনমজুর পিতার।

অভাবে পিতা জর্জি গেছেন দুবলার চরে জেলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে। সেখান থেকে এখনও কোনো খরচ পাঠাতে পারেনি পিতা জর্জি। তাই খেয়ে না খেয়ে এবং ধার দেনা ও বাকীতে সদাই কিনে কোনো রকম দিন যাচ্ছে সিডর ও তার দাদীর। তাই এ অবস্থায় তার ভর্তি হওয়াটাও অনিশ্চিত। এরমধ্যে আবার বাবা দূরে দূরে, মা নেই কাছে। চার বছর আগে মা সাথী সরকার (৩৪) ছেলে সিডরকে ফেলে চলে গেছেন অন্যত্র। অন্যত্র সংসার করা মা কোনো খোঁজখবরই নেন না সিডরের। দুঃখ ভরা সিডরের শেষ আশ্রয়স্থল দাদী। দাদী রিভা সরকার (৫৫) ও চাচা সাগর সরকার (২৮) চরম দুশ্চিন্তায় সিডরের লেখা পড়া নিয়ে। তারা অভাবের মধ্য দিয়ে কিভাবে পড়াবেন সিডরকে তা ভেবে কুলকিনারা পাচ্ছেন না। তাই সিডরের লেখাপড়া ও কোনোভাবে বেঁচে থাকার জন্য সমাজের বিত্তবানদের সাহায্য সহযোগিতা চেয়েছেন তার পরিবার।

সিডরের দাদী রিভা সরকার (৫৫) বলেন, আমাদের পরিবারের অবস্থা খুবই খারাপ। আমার নাতিকে নিয়ে খুবই কষ্টে আছি। সিডরের বাবাও অসুস্থ একটা হাত ভাঙা। তারপরও আয়ের জন্যে সাগরে গেছে। সিডরের লেখাপড়া শেখার খুব আগ্রহ আছে। কিন্তু আমি পারছি না, বাজুয়া যেখানে ছিল সেখানে খরচ দিতে না পারায় এখন বাড়ি এসে বসে আছে। এতো কষ্ট এখন ওকে খাওয়াব না পড়াবো কোনটা করব। সবাই যদি একটু সহায়তা করে তাহলে ওকে পড়ালেখা করানো সম্ভব হবে।

সিডরের চাচা সাগর সরকার (২৮) বলেন, সিডর খুবই মেধাবী, লেখাপড়ায়ও অনেক আগ্রহ রয়েছে। তার শহরের স্কুলে ভর্তি, বই-খাতা, পোশাকের পাশাপাশি প্রয়োজন বাইসাইকেল ও অ্যাসাইনমেন্টের জন্য মোবাইল ফোনেরও। এ সকল সহায়তা পেলে লেখাপড়া শিখে ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার ইচ্ছা রয়েছে সিডরের। বিভিন্ন সময়ে নানানজন সিডরকে সহায়তা প্রদাণের আশ্বাস দিলেও এ পর্যন্ত কেউ তার কিছুই করেনি। ১৫ নভেম্বর আসলে শুধু সাংবাদিকেরাই তার খোঁজখবর নিয়ে রিপোর্ট করে থাকেন। কিন্তু তাতে তো তার ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। কিভাবে লেখাপড়া চালিয়ে যাবে তারও কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই সমাজের বিত্তবানের এগিয়ে আসলে সিডরের ভর্তি ও পড়াশুনা সম্ভব হবে।

সিডর সরকার (১৪) বলেন, আগে আমি বাজুয়ায় হোস্টেলে থাকতাম। বাবা ও দাদী খরচ দিতে না পারায় সেখান থেকে ৪ মাস হলো বাড়িতে চলে এসেছি। বাবাতো ঠিক মতো খাওয়াতেই পারছে না, তা লেখাপড়া কিভাবে শিখব। পড়াশুনা শিখতে না পারলে তো আমাকে জাল টেনে ও কাজ করে খেতে হবে। আমি তা করতে চাই না আমি পড়তে চাই।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কমলেশ মজুমদার বলেন, সিডরের কথা তো এক সময়ে খুব শোনা গেছে। এখনও শোনা যাচ্ছে। তবে আমি যতটুকু জানতাম সে বাজুয়ার একটি স্কুলে পড়ত। আমি এখানে আসার পর সিডরের বিষয়ে সাহায্য সহযোগিতার জন্য সে কিংবা তার পরিবার কোনো আবেদন করেননি। তবে জানতে পেরেছি তার লেখাপড়ার বিঘ্ন ঘটেছে। সে যদি এই উপজেলার মধ্যে কোনো স্কুলে ভর্তি হতে চায় আমি তার ব্যবস্থা করে দেব। আর তার পারিবারি সমস্যার ক্ষেত্রে যদি আবেদন করে তাও সমাধানের চেষ্টা করব।

জন্মের পর থেকেই প্রায় প্রতিবছরই বিভিন্ন গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে আসছে সিডর। শিরোনাম দেখে সেই সময়ে বিভিন্নজন তার পাশে দাঁড়ানো ও সাহায্য সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও তা কেউই কখন বাস্তবায়ন করেনি। তাই এ নিয়ে ক্ষোভ-আক্ষেপ রয়েছে সিডরের পরিবারের। সমাজের বিত্তবানদের সহায়তাই বদলে দিতে পারে সিডরের ভবিষ্যৎ জীবনটাকে।



সাতদিনের সেরা