kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৩০ নভেম্বর ২০২১। ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৩

‘বাবারে বাঁচাতে মোটরসাইকেল দিলাম, সেই মোটরসাইকেলেই খাইল’

ঘাটাইল (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি   

৯ নভেম্বর, ২০২১ ১৬:০৬ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



‘বাবারে বাঁচাতে মোটরসাইকেল দিলাম, সেই মোটরসাইকেলেই খাইল’

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার বড়মেধার ঝাইপাটা গ্রামের বাসিন্দা শাহ জালাল মিয়া। প্রবাস থেকে এসেছেন কিছুদিন আগে। তার একমাত্র ছেলে আবু বকর (১৪) সম্প্রতি মোটরসাইকেল কেনার জন্য বায়না ধরে। মোটরসাইকেল কিনে না দিলে সে ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করার হুমকিও দেয়। সৌদি আরব থেকে সদ্য শূন্য হাতে ফেরা শাহ জালাল চিন্তায় পড়ে যান। একদিকে হাতে টাকা নেই, অন্যদিকে ছেলে মাত্র নবম শ্রেণিতে পড়ছে। তাই রাজি হচ্ছিলেন না। 

অবশেষে একমাত্র ছেলের জিদের কাছে তিনি শেষ পর্যন্ত হার মানেন। বাধ্য হয়ে ধার-দেনা করে গত অক্টোবর মাসে তিনি এক লাখ দশ হাজার টাকা দিয়ে একটি মোটরসাইকেল কিনে দেন। গতকাল সোমবার সেই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দুই বন্ধুসহ একমাত্র ছেলে আবু বকরের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। শোকে বাবা শাহ জালাল নির্বাক হয়ে গেছেন। গতকাল তার বাড়িতে গেলে তিনি বলেন, ‘বাবারে বাঁচাতে মোটরসাইকেল কিনে দিলাম। সেই মোটরসাইকেলেই বাবারে খাইল।’ 

প্রত্যক্ষদর্শী আল আমিন জানান, আবু বকর তিন বন্ধু নিয়ে বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালাচ্ছিল। ঘাটাইল-সাগরদীঘি সড়কের ধলাপাড়ায় ভূইয়াবাড়ি মোড়ে পৌঁছলে মোটরসাইকেলটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের একটি মেহগনি গাছের সঙ্গে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা খায়। এতে মোটরসাইকেল আরোহী তিন বন্ধু ঘটনাস্থলেই মারা যান। মোটরসাইকেলটি দুমড়ে-মুচড়ে সড়কের পাশে পড়ে যায়। নিহতরা হলেন- উপজেলার ধলাপাড়া ইউনিয়নের বড়মেধার ঝাইপাটা গ্রামের শাহ জালালের ছেলে আবু বকর (১৪), ছমির উদ্দিনের ছেলে মো. শরিফ (১৪) ও রমজান আলীর ছেলে সাইম (১৪)।

ধলাপাড়া এসইউপি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শামসুল হক জানান, নিহত তিনজনই তার বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির মানবিক শাখার ছাত্র। আজ তাদের ক্লাস ছিল না। শুনেছি তারা তিনজনই জন্মনিবন্ধন সনদ তোলার জন্য মোটরসাইকেলে ধলাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় শহরগোপীনপুর যাচ্ছিল।

দুর্ঘটনায় নিহত মো. শরিফের বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। তার বাবা গত বছর ট্রাকের চাপায় মারা যান। তিন বছর আগে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মা শরিফা বেগম মারা যান। চাচা জসিম উদ্দিন তাকে লালন-পালন করতেন। শরিফের মৃত্যুর সংবাদ শুনে জসিম বলেন, আশা ছিল শরিফ লেখাপড়া করে চাকরি করবে। কিন্তু সে স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। সে তার বাবার মতো সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেল। নিজের ছেলে মারা গেলেও আমি এত কষ্ট পাইতাম না। 

বাবাহারা সাইমের লাশের পাশে বিলাপ করছিলেন তার মা ছাবিনা আক্তার। ছাবিনার স্বামী রমজান আলী এক বছর আগে মারা গেছেন। তার বড় ছেলে সুমন সৌদি আরবপ্রবাসী। এই ছেলের টাকায় কষ্টে সংসার চলছে। আশা ছিল সাইম এসএসসি পাস করলে তাকেও বিদেশে পাঠাবেন। সাইমের মৃত্যুতে মা ছাবিনার সে স্বপ্ন ভেঙে গেল।

ধলাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এজহারুল ইসলাম মিঠু ভূইয়া বলেন, বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। কম বয়সী ছেলেদের হাতে মোটরসাইকেল দেওয়া কোনোভাবেই উচিত না।

ঘাটাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজহারুল ইসলাম সরকার বলেন, বেপরোয়া গতির কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।



সাতদিনের সেরা