kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২ ডিসেম্বর ২০২১। ২৬ রবিউস সানি ১৪৪৩

‘বালা ফেলেয়া হামার সউগ শ্যাষ’, কার্তিকে তিস্তার অকাল বন্যায় দিশেহারা কৃষক

►সর্বশেষ বন্যায় প্রায় ৫০০ হেক্টর জমির ফসল নিমজ্জিত হয় ►প্রায় ২০০ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে ►প্রায় ৩ কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে ►আড়াই হাজার কৃষক পরিবারের মাথায় হাত

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি   

২৮ অক্টোবর, ২০২১ ১৫:৫৫ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘বালা ফেলেয়া হামার সউগ শ্যাষ’, কার্তিকে তিস্তার অকাল বন্যায় দিশেহারা কৃষক

‘আলু, মরুচ আবাদ করচি ঋণ করি। বন্যা একবারে তল করচে। বালা ফেলেয়া হামার সউগ শ্যাষ। কী কইরা খাবো, চলার মতোন আর বুদ্ধি নাই’- চরম অনিশ্চয়তায় পড়া তিস্তার চর গতিয়াশামের কৃষক হবিজুল মিয়া হতাশ কণ্ঠে এসব কথা বলেন। তিস্তার অকাল বন্যায় কুড়িগ্রামে চরাঞ্চলে আলু, মরিচ, ধানসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষেতের ওপর বালু জমে অনাবাদী হয়ে গেছে শত শত একর জমি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়ে নতুন করে ফসল চাষে অক্ষম। এ অবস্থায় তারা তাকিয়ে আছেন সরকারি সহায়তার দিকে। 

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, সর্বশেষ বন্যায় প্রায় ৫০০ হেক্টর জমির ফসল নিমজ্জিত হয়। এর মধ্যে প্রায় ২০০ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। এতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকা মূল্যের ফসল। আর ক্ষতির শিকার হয়েছে আড়াই হাজার কৃষক পরিবার। 

সরেজমিন রাজারহাট উপজেলার চর গতিয়াশামে গিয়ে দেখা গেছে, সর্বত্র তিস্তার তাণ্ডবের চিহ্ন। ধারদেনা ও ঋণ করে আগাম আলু, মরিচ, বাদাম ও ধানসহ নানা ফসলের চাষ করেছিলেন চরের চাষিরা। কিন্তু কার্তিকের নজীরবিহীন বন্যা কেড়ে নিয়েছে সব ফসল। ক্ষেতের ওপর ২-৩ ফুট উচ্চতায় জমেছে বালু। অনাবাদী এসব জমিতে নতুন করে ফসল বোনার উপায় নেই বলে হাহাকার চাষিদের ঘরে ঘরে। আবাদের জন্য শ্যালো মেশিন ও পাওয়ার টিলারও তলিয়ে গেছে পানির নিচে। ঘরে  ছিল আলু বীজ ও সার, সব ভেসে গেছে। বালু খুঁড়ে অনেকেই চাপা পড়া শ্যালো মেশির উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছেন। 

স্রোতের তোড়ে ভেসে যাওয়া মরিচক্ষেতে বিষণ্ন মনে বসে ভবিষ্যতে দুর্দশার কথা ভেবে কাঁদছিলেন কৃষক আব্দুল ছমির। বালুতে খুঁদে খুঁড়ে দেখছেন কোনো চারা বেঁচে আছে কিনা। প্রতি একর জমি ৩৩ হাজার টাকায় লিজ নিয়ে আবাদ বুনেছিলেন অনেক স্বপ্ন নিয়ে। কিস্তু সর্বশান্ত হয়ে এখন তাকিয়ে আছেন অদৃষ্টের দিকে। বলেন, ছোট থাকি বড় হইলাম। আইজো দেখিনাই কাতি মাসে বন্যা হয়। আমার দুই একর জমির আলু আর এক একর জমির মরিচ খ্যাত নষ্ট হয়া গ্যাছে। এখন আল্লায় যা করে এটি, তাছাড়া আর কী করমো।
  
চরের আরেক কৃষক শাহিদুল ইসলাম জানান, ছয়জন মিলে আলু আর বাদাম চাষের জন্য লিজ নিয়ে ১১ একর জমিতে আলুর চাষ করেছিলেন। জমিতে একদফা সারও প্রয়োগ করেছেন। আই ফার্মা নামে একটি এনজিও ও মহাজনের কাছে চড়া সুদে দাদন নিয়ে আবাদে জন্য ৬ লাখ খরচ করেছিলেন। এখন সব শেষ। 
চরের বেশিরভাগ বর্গাচাষি প্রতি একর জমি গড়ে ৩০ হাজার টাকায় লিজ নিয়ে আবাদ করেছিলেন। এনজিও, মহাজন ও ব্যাংকের কাছ থেকে আবাদের জন্য নিয়েছেন ঋণ। ঋণগ্রস্ত অসহায় কৃষকরা পরবর্তী আবাদের জন্য তাই তাকিয়ে আছেন সরকারি সহায়তার দিকে। চরের কৃষক সাদেকুল, তাইজুল, সফিকুল নামে তিন ভাই ৭৫ শতক করে জমিতে মরিচের চাষ করেছিলেন। কেবল ফুল এসেছিল মরিচক্ষেতে। এখন সব বালুর নিচে। সাদেকুল জানান, ছয় মাস ফসল ফলিয়ে বাকি সময়টা পার করতে হয়। এবার চরে আর কোনো আবাদের সম্ভাবনা নেই। হাতে কারো টাকাও নেই। সরকার এগিয়ে আসলে কোনো কোনো জমিতে ভুট্টা জাতীয় কিছু ফসল করা যেতো।   

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক মো. মঞ্জুরুল হক জানান, ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ক্ষতিগ্রস্ত সকল কৃষককে বীজ ও সারসহ বিভিন্ন উপরকরণ দিয়ে সহায়তা করা হবে। সে লক্ষ্যে তালিকা প্রনয়ণের কাজ চলছে। 



সাতদিনের সেরা