kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২ ডিসেম্বর ২০২১। ২৬ রবিউস সানি ১৪৪৩

দুর্যোগে মাছ ধরা বন্ধ, ব্যাহত ঘর-মাচা-চাতাল তৈরির কাজ

মৌসুমের শুরুতেই বাধার মুখে দুবলার শুঁটকি উৎপাদন

মহিদুল ইসলাম, শরণখোলা (বাগেরহাট)   

২৮ অক্টোবর, ২০২১ ১৫:২৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মৌসুমের শুরুতেই বাধার মুখে দুবলার শুঁটকি উৎপাদন

মৌসুমের শুরুতেই দুর্যোগের মুখে পড়েছে শুঁটকি উৎপাদন। গত মঙ্গলবার (২৬ অক্টোবর) থেকে বঙ্গোপসাগরে হঠাৎ হালকা মৌসুমী লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়ায় সাগর উত্তাল হয়ে ওঠে। এর ফলে তিন দিন ধরে সাগর দ্বিপগুলোতে ঝড়ো বাতাস এবং বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এ অবস্থায় পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলার রেঞ্জের দুবলার জেলে পল্লীর আওতাধীন চারটি চরে অবস্থানরত শুঁটকি উৎপাদনকারী আট সহস্রাধিক জেলে-বহদ্দার চরম বিপাকে পড়েছেন। বনবিভাগ, দুবলা ফিশারমেন গ্রুপ ও বহদ্দারদের মাধ্য এই তথ্য জানা গেছে।

বনবিভাগ জানিয়েছে, এবছর দুবলার জেলে পল্লীর আওতায় আলোর কোল, মাঝের কিল্লা, নারকেলবাড়িয়া এবং শ্যালা এই চারটি চরে শুঁটকি উৎপাদনের কাজ শুরু হয়েছে। এই চারটি চরে জেলেদের থাকা ও শুঁটকি সংরক্ষণের জন্য ৮৯৫টি ঘর, ৬৬ টি ডিপো ঘর এবং ৯৬টি দোকানঘর তৈরির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বরবিভাগ থেকে। গত মঙ্গলবার থেকে জেলে-মহাজন-বহদ্দাররা চরে আসতে শুরু করেছে। এসব চরে অবস্থানকারী জেলে-বহদ্দারদের নিরাপত্তার জন্য র‌্যাব ও কোস্টগার্ড নিয়োজিত রয়েছে।

তবে, শুঁটকিসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বঙ্গোপসগর ঘেঁষা এই চরগুলোতে দুর্যোগে আশ্রয় নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার এবং নিরাপদ খাবার পানির ব্যবস্থা নেই। সরকারিভাবে কোনো চিকিৎসা কেন্দ্রও স্থাপন করা হয়নি। যার ফলে, চরম ঝুঁকির মধ্যে শুঁটকি উৎপাদন করতে হয় জেলেদের।

দুবলা জেলে পল্লী টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রহ্লাদ চন্দ্র রায় বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে মুঠোফোনে জানান, চারটি চরে এ পর্যন্ত ৮-৯ হাজার জেলে-বহদ্দার চলে এসেছেন। তারা সবেমাত্র ঘর ও শুঁটকির মাচা তৈরির কাজ শুরু করেন। কিন্তু এরই মধ্যে হঠাৎ আবহাওয়া খাপার হওয়ায় সবকিছুই থমকে গেছে। সাগর উত্তাল হয়ে উঠেছে। ঝড়-বৃষ্টি চলছে। সাগর থেকে সমস্ত মাছ ধরা নৌকা কূলে ফিরে এসেছে। ঘর তুলতে না পারায় জেলেরা তাবু টাঙিয়ে বসবাস করছেন। মহাজন ও বহদ্দাররা থাকছেন আশ্রয় কেন্দ্রে। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত মাছ ধরাসহ কোনো কিছু করা সম্ভব হবে না।

মাঝের কিল্লা শুঁটকি পল্লীর ব্যবসায়ী চট্টগ্রামের জাহিদ বহদ্দার জানান, প্রথম দিন সাগরে নেমেই জেলেরা দুর্যোগে পড়েছে। ঝড়-বৃষ্টিতে এখনো ঘর, মাচা ও চাতাল তৈরি করা সম্ভব হয়নি। প্রথম দিনে যে মাছ পাওয়া গেছে তা শুকাতে না পারায় পচে গেছে। এই চরে প্রায় তিন শতাধিক জেলে-বহদ্দার রয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে কেউ কোনো কাজ করতে পারছে না। এ অবস্থায় শুরুতেই লোকসানে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

জাহিদ বহদ্দার বলেন, ঘর তুলতে না পারায় আমরা কয়েকজন বহদ্দার তিন দিন ধরে আশ্রয় কেন্দ্রে রয়েছি। জেলেরা খোলা মাঠে তাবু তৈরি করে এবং মাঝের খালে আশ্রয় নেওয়া নৌকা, ট্রলারে অবস্থান করছে। আবহাওয়ার কারণে আমরা খুব দুর্ভোগে পড়েছি।

দুবলা ফিশারমেন গ্রুপের সভাপতি মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ মুঠোফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ঝুঁকির মুখে পড়েছে শুঁটকি উৎপাদন। দমকা বাতাস এবং বৃষ্টির কারণে ঘর, মাচা ও চাতাল তৈরির কাজও ব্যাহত হচ্ছে। প্রথম গোনের মাছ পচে নষ্ট হয়েছে।

ফিশারমেন গ্রুপের সভাপতি কামাল আহমেদ আরো জানান, চারটি শুঁটকির চরে পাঁচটি সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে। এর মধ্যে তিনটিই ব্যবহার অনুপযোগী। বাকি দুটির মধ্যে একটি বনবিভাগ অফিস। মাঝের খালের শেল্টারটি অবকাঠামো ভালো থাকলেও ভাঙনের মুখে। বড় ধরণের দুর্যোগ হলে ১০ সহস্রাধিক জেলে-মহাজন ও ব্যবসায়ীর আশ্রয়ের কোনো জায়গা নেই।

কামাল আহমেদ জানান, এসব চরে খাবার পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। মেহের আলীর চরের মিষ্টি পানির পুকুরটি সম্পূর্ণ ভেঙে সাগরে মিশে গেছে। মাঝের খালের পুকুরটিও ভাঙনের মুখে। বালুর চরে কুপ খনন করে পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। তাছাড়া, অক্টোবরের শেষ দিক থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত পাঁচ মাস এত বিশাল জনগোষ্ঠী দুর্গম চরে অবস্থান করে। মাছ ধরা এবং শুঁটকি উৎপাদন করতে গিয়ে জেলে শ্রমিকরা নানা ধরণের দুর্ঘটনায় আহত ও অসুস্থ হয়। কিন্তু, এদের চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই। চিকিৎসার অভাবে প্রতিবছর অনেক জেলে মারা যায়। তাই এখানে অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন ও সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণের দাবি জানান তিনি।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, শুরুতেই আবহাওয়া খারাপ হওয়ায় শুঁটকি প্রক্রিয়া কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। এবছর শুঁটকি খাত থেকে ৩ কোটি ২২ লাখ টাকা লাখ টাকা রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বড় ধরণের কোনো দুর্যোগ না হলে লক্ষ্য পূরণ হবে।

চরের সাইক্লোন শেল্টারের সবগুলোই ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে ডিএফও বেলায়েত হোসেন বলেন, বিচ্ছিন্ন চরগুলোতে পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণের জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের মাধ্যমে ইতোমধ্যে বেশ কিছু পুকুর খনন করা হয়েছে। পানির তেমন সমস্যা নেই। অস্থায়ী চিকিৎসা ক্যাম্প স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। নিরাপত্তার জন্য র‌্যাব ও কোস্টগার্ড নিয়োজিত রয়েছে।



সাতদিনের সেরা