kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর

রাস্তা বন্ধ করে দেয়াল নির্মাণ, অবরুদ্ধ পরিবার

সিঙ্গাইর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি   

২৫ অক্টোবর, ২০২১ ০২:১৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রাস্তা বন্ধ করে দেয়াল নির্মাণ, অবরুদ্ধ পরিবার

মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার জামশা ইউনিয়নের দক্ষিণ জামশা গ্রামের রতন বিশ্বাস নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবেশীদের চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দেয়াল নির্মাণের অভিযোগ ওঠেছে। এতে চলাচলে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন প্রতিবেশী জহুরা বেগমের পরিবারসহ গ্রামের অনেক মানুষ। স্থানীয় প্রশাসনের কাছে বিচার চেয়েও প্রতিকার পায়নি বলে তাদের অভিযোগ। সম্প্রতি গ্রামবাসী ওই দেয়ালের রাস্তার অংশটুকু ভেঙে দিলেও রতন বিশ্বাসের ভয়ে ওই রাস্তা দিয়ে কেউ চলাচল করতে সাহস পাচ্ছে না। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি হামলা-মামলার ঘটনাও ঘটেছে। বিষয়টি সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন স্থানীয়রা।

মামলার অভিযোগ ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার সারারিয়া মৌজায় ৪৫ শতাংশ জমির মালিক দক্ষিণ জামশা গ্রামের মৃত নাজার আহাম্মদের স্ত্রী জহুরা বেগম ও তার সন্তানরা। ওই জমিতে বাড়ি-ঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে প্রায় ৩০ বছর ধরে বসবাস করছেন তারা। চলাচলের জন্য ৬ ফুট চওড়া একটি রাস্তা ব্যবহার করতেন ভুক্তভোগী পরিবারসহ অন্যরা। কিন্তু তাদের তিন শতাংশ জমিসহ ৫-৬ মাস আগে বাড়ির সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করে রাস্তাটি বন্ধ করে দেন প্রতিবেশী রতন বিশ্বাস। এতে যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন জহুরা বেগমের পরিবারসহ গ্রামের অনেক মানুষ।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, গ্রামের প্রধান সড়ক থেকে রতন বিশ্বাসের বাড়ির পাশ দিয়ে সরু একটি মাটির রাস্তা। ওই রাস্তার উত্তর প্রান্তে জহুরা বেগমের বাড়ি। তাদের বাড়ির চারপাশে প্রতিবেশী রতন বিশ্বাসসহ অন্যদের জমি। চলাচলের একমাত্র রাস্তাটি বন্ধ করে জহুরা বেগমের বাড়ির উত্তর ও পূর্বপাশ ঘেষে উঁচু দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। সম্প্রতি ওই দেয়ালের রাস্তার অংশটুকু ভেঙে দেন স্থানীয়রা। কিন্তু নতুন করে হামলা-মামলা ও হয়রানির আশঙ্কায় ওই রাস্তা দিয়ে কেউ চলাচল করতে সাহস পাচ্ছে না। 

জহুরা বেগমের মেয়ে সায়মা পারভীন বলেন, ‘আমাদের তিন শতাংশ জমি দখল করে দেয়াল তুলে চলাচলের রাস্তাটি বন্ধ করে দেন রতন বিশ্বাস। এখন জঙ্গল ও অন্যের জমির উপর দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। কোনো মালামাল আনা-নেওয়া করতে পারছি না। একমাত্র আয়ের উৎস মুরগির খামারটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের কাছে বিচার চেয়েও কোনো প্রতিকার পায়নি। রাস্তা ‍নিয়ে কথা বললে হয়রানি করেন তিনি। কখন কোন ঘটনা ঘটিয়ে রতন বিশ্বাস আমাদের ফাঁসিয়ে দেন, সেই চিন্তায় পুরো পরিবারে অশান্তি বিরাজ করছে।’

অভিযুক্ত রতন বিশ্বাস বলেন, ‘রাস্তার জায়গাটি আমার। এতদিন মানবিক দিক বিবেচনা করে প্রতিবেশীদের চলাচল করতে দেওয়া হয়। নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে বাড়ির বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ করে রাস্তাটি বন্ধ করা হয়। এতে কার কি সমস্যা হলো, সেটা আমার দেখার বিষয় না। সালিসি বৈঠক বসলে সবাই রাস্তার জায়গা ছেড়ে দেওয়ার জন্য বলেন। রাস্তার জায়গা না ছাড়ার কারণে বাউন্ডারি ওয়াল, ঘর-বাড়ি ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করেছে প্রতিপক্ষের লোকজন। এসময় আমাদের মারধর করে দুই লাখ টাকার ক্ষতি সাধনসহ সাড়ে পাঁচ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার নিয়ে যায় তারা।’

ঘটনার প্রতেক্ষদর্শী রতন বিশ্বাসের চাচা জগদীশ বিশ্বাস, প্রতিবেশী ইজ্জত আলীর স্ত্রী হাবিয়া বেগম ও ফরজ আলীর স্ত্রী মালেকা বেগম বলেন, ঝগড়াঝাটির আওয়াজ শুনে গিয়ে দেখি এলাকার কিছু লোক দেয়ালের রাস্তার মুখের অংশ ভাঙছেন। কিছুক্ষণ পর তারা চলে যায়। কাউকে রতন বিশ্বাসের ঘর-বাড়ি ভাঙচুর ও মালামাল লুটপাট করতে দেখিনি। 

স্থানীয় ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম ও প্রতিবেশী মুক্তিযোদ্ধা জলিল খানসহ একাধিক ব্যক্তি বলেন, রাস্তাটি দিয়ে শুধু জহুরা বেগমের পরিবার নয়, এলাকার অনেক মানুষ চলাচল করে থাকে। কাউকে কিছু না জানিয়ে হঠাৎ দেয়াল নির্মাণ করে রাস্তাটি বন্ধ করে দেন তিনি। এর ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েন জহুরা বেগমের পরিবারসহ গ্রামের অনেক মানুষ। বিষয়টি সমাধানের লক্ষ্যে সালিসি বৈঠকে বসা হয়েছিল। প্রথমে রতন বিশ্বাস রাস্তার জায়গা ছেড়ে দেওয়ার জন্য বললেও পরে ছাড়েননি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জহিরুল হক বলেন, চলাচলের রাস্তা নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ। এই বিরোধকে কেন্দ্র করেই মারামারি ও দেয়াল ভাঙার ঘটনা ঘটেছে। প্রাথমিক তদন্তে রতন বিশ্বাসের বাড়ি-ঘর ভাঙচুর, টাকা পয়সা ও স্বর্ণালংকার লুটপাটের সত্যতা মিলেনি। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।

সহকারি পুলিশ সুপার (সিঙ্গাইর সার্কেল) রেজাউল হক বলেন, লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে জহুরা বেগম ও রতন বিশ্বাসের মধ্যকার বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সরেজমিনে গিয়ে উভয় পক্ষের লোকজনের সাথে কথা বলা হয়। মানবিক কারণ ও বাস্তবতার নিরিখে রতন বিশ্বাসকে রাস্তার জায়গাটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য বলা হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তিনি তা ছাড়েননি। মূলত রাস্তার জায়গা নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে হামলা-মামলার ঘটনা ঘটেছে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার রুনা লায়লা বলেন, মানুষের চলাচলের রাস্তার জায়গায় কারো মালিকানা হলেও কেউ বন্ধ করতে পারে না। জনগণের চলাচলের রাস্তা বন্ধ করা কারো অধিকার নাই। এটি আইনসিদ্ধ নয়। ভুক্তভোগী পরিবারের লিখিত অভিযোগ পেয়ে বিষয়টি সমাধান করার জন্য স্থানীয় চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মিঠুকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে বিষয়টি নিয়ে আমার সাথে কেউ যোগাযোগ করেনি। 

স্থানীয় চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মিঠু বলেন, আমি চেষ্টা করেছি সমস্যাটি সমাধান করার। রতন বিশ্বাসও রাস্তার জায়গা ছেড়ে দেওয়ার জন্য রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু তার প্রতিপক্ষের লোকজনের অসহযোগিতার কারণে সমস্যাটি সমাধান করা সম্ভব হয়নি। তারা সহযোগিতা করলে রতন বিশ্বাসের সাথে কথা বলে তাদের রাস্তার ব্যবস্থা করে দেব।



সাতদিনের সেরা