kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২ ডিসেম্বর ২০২১। ২৬ রবিউস সানি ১৪৪৩

‘আলবদর বাহিনীর কমান্ডার’ পান ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা’র সংবর্ধনা, এবার গ্রেপ্তার

আলম ফরাজী, ময়মনসিংহ (আঞ্চলিক)    

২৩ অক্টোবর, ২০২১ ১০:০৬ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘আলবদর বাহিনীর কমান্ডার’ পান ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা’র সংবর্ধনা, এবার গ্রেপ্তার

তিনি বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের অধীনে থেকে প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা ভাতা পান। ঢাকায় পেয়েছেন সরকারের দেওয়া ফ্ল্যাট। এমনকি এলাকায় পেয়েছেন প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের খাসজমি, যেখানে নির্মাণ করছেন পাঁচতলা ভবন। বঙ্গভবনে ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে পেয়েছেন সংবর্ধনাও। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ থানা পুলিশ। তাঁর নামে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধী মামলার পর পরোয়ানা থাকায় গত বৃহস্পতিবার তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তিনি হলেন মো. তারা মিয়া (৭০)। ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারবাড়ী ইউনিয়নের ইঠাউলিয়া গ্রামের মৃত শাহনেওয়াজের ছেলে তিনি। স্থানীয় সূত্র জানায়, এই তারা মিয়া একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মিলে এলাকায় বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, হত্যা ও নারী নির্যাতন করেছেন। এ নিয়ে এলাকাবাসী মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অনেকবার অভিযোগ দিলেও তাঁর বিরুদ্ধে এত দিন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তারা মিয়ার বাবাও একাত্তরে ‘শান্তি কমিটির’ সদস্য ছিলেন।

সূত্র মতে, মো. তারা মিয়া স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় একজন চিহ্নিত রাজাকার হিসেবে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় হিন্দুদের মূল্যবান জমি দখলে নিয়ে স্বাধীনতার পরে বিক্রি করে দেন। এরপর তিনি চলে যান ঢাকায়। কিছুদিন পর তিনি এলাকায় এলে একাত্তরে তাঁর হত্যা-নির্যাতনের জের ধরে জনতার রোষানলে পড়ে বেধড়ক মারধরের শিকার হন। তাঁর কোমর ভেঙে যায়। পরে ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা করালেও স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারেন না। তবে এরপর আর তাঁকে পেছনে তাকাতে হয়নি।

আঠারবাড়ী এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা রঞ্জন ঘোষ রানা জানান, পাশের গৌরীপুর উপজেলার সহনাটি ইউনিয়নের জাঙ্গালিয়া গ্রামের মৃত শমছের আলীর ছেলে মো. তারা মিয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর ও তাঁর বাবার নাম (শমছের আলী) ব্যবহার করে নিজেকে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে তালিকাভুক্ত হয়ে যান ওই আঠারবাড়ীর ইঠাউলিয়া গ্রামের মো. তারা মিয়া (৭০)। এ অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার ভাতা ছাড়াও ভিআইপি হিসেবে অবাধে বিচরণ করে আসছিলেন। পেয়েছেন মোহাম্মদপুরে সরকারের দেওয়া ফ্ল্যাট ও আঠারবাড়ীর সদরঘাট এলাকায় ১০ শতক জমি। মুক্তিযুদ্ধে গৌরীপুরের মো. তারা মিয়ার ভারতীয় প্রামাণ্য দলিল নম্বর ৯৭৯৩ (ঈশ্বরগঞ্জ খণ্ড নং-২); গেজেট নং-৭৩৬; লাল মুক্তিবার্তা নং-০১১৫১১০২৪৩। এটিই ব্যবহার করেছেন ইঠাউলিয়ার তারা মিয়া।

আঠারবাড়ী এলাকার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার রঞ্জন ঘোষ আরো জানান, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্থানীয় কাশিপুরের স্কুলশিক্ষক আব্দুল লতিফকে (লতিফ মাস্টার) প্রকাশ্যে হত্যা করেন ইঠাউলিয়ার তারা মিয়া। পরে তারা মিয়ার প্রভাব-প্রতিপত্তির ভয়ে বিচারের জন্য এগিয়ে যায়নি আব্দুল লতিফের পরিবার। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের (যুদ্ধাপরাধী) বিচারকাজ শুরু করলে লতিফ মাস্টারের পরিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করে। এরপর তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে গত সপ্তাহে তারা মিয়ার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। এ অবস্থায় স্ত্রী রাবিয়া আক্তারসহ নিজ এলাকা আঠারবাড়ীতে এসে গাঢাকা দেন তারা মিয়া। খবর পেয়ে পুলিশ তাঁকে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে।

ঈশ্বরগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার আব্দুছ ছাত্তার বলেন, তারা মিয়া ১৯৭১ সালে আলবদর বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। তিনি শুধু একজন যুদ্ধাপরাধীই নন, প্রতারকও। অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হয়ে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাওয়া ছাড়াও দাপিয়ে বেড়িয়েছেন সর্বত্র। পরিবারের অনেকের চাকরি বাগিয়ে নিয়েছেন। একাত্তরে তিনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মিলে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছেন। তাঁর মূল কাজই ছিল হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও নারী নির্যাতন। এর মধ্যে কাশিপুরের লতিফ মাস্টারের বাড়িও ছিল।

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার ও রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদের বেয়াই মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, বেশ কয়েকটা স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে তিনি তারা মিয়াকে বঙ্গভবনে হুইলচেয়ারে বসা দেখেছেন। সেখানে তিনি অন্য যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সংবর্ধনা নিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কো-অর্ডিনেটর মো. আব্দুর রহিম কালের কণ্ঠকে জানান, মামলার পর তদন্ত সংস্থা তারা মিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘ তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পায়। ট্রাইব্যুনালে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চলে যায় সংশ্লিষ্ট থানায়। পর্যায়ক্রমে তাঁর সব সুযোগ-সুবিধা বাতিল করা হবে।

ঈশ্বরগঞ্জ থানার ওসি আব্দুল কাদের মিয়া বলেন, তারা মিয়ার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। তাঁকে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।



সাতদিনের সেরা