kalerkantho

শনিবার । ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৪ ডিসেম্বর ২০২১। ২৮ রবিউস সানি ১৪৪৩

হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি

অসময়ের বন্যায় বিপর্যস্ত তিস্তাঘেরা উত্তরের চার জেলা

অনলাইন ডেস্ক   

২২ অক্টোবর, ২০২১ ০৮:১৫ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অসময়ের বন্যায় বিপর্যস্ত তিস্তাঘেরা উত্তরের চার জেলা

বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে প্লাবিত হয়েছে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার চর গতিয়াশামের বহু ঘরবাড়ি। গতকাল দুপুরে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

তিস্তা ফুলেফেঁপে রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে। গত মঙ্গলবার রাত থেকে হঠাৎই ডেকেছে বান। বুধবার বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে তিস্তার ঢল, পানি উপচে ঢুকতে থাকে নদীতীরের এলাকাগুলোতে।

অসময়ের বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে তিস্তাঘেরা উত্তরের চার জেলা। ফলে রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারীর বিভিন্ন উপজেলার কয়েক হাজার মানুষ হয়ে পড়েছে পানিবন্দি। তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট, আবাদি জমিসহ ফসলের ক্ষেত। চরাঞ্চলের সবজিসহ ফসলের ব্যাপক ক্ষতির শঙ্কা করছেন চাষিরা। পানির তীব্র স্রোতে দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে কয়েকটি এলাকার পানি কিছুটা নামতে শুরু করেছে।

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানান, ভারতের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক দিন ভারি বৃষ্টি হওয়ায় তিস্তায় পানি বেড়েছে। ফলে এই নদীর বাংলাদেশ অংশে বন্যা দেখা দিয়েছে। রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, তিস্তার পানি দোয়ানি পয়েন্টে গত বুধবার দুপুর ১২টার দিকে বিপৎসীমার ৭০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। রাত ১০টার দিকে ১৪ সেন্টিমিটার কমে ৫৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। গতকাল সকাল ৯টার দিকে আরো কমে ৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বিকেল ৩টার দিকে ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে বিকেল ৪টার দিকে আরো কমে ৪৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

এদিকে নিম্নাঞ্চলের পানিবন্দি পরিবারগুলো শিশু, বৃদ্ধ এবং গবাদি পশু নিয়ে পড়েছে বিপাকে। দেখা দিয়েছে শুকনা খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। কুড়িগ্রামের উলিপুরে গত বুধবার দুপুরে তিস্তার তীব্র স্রোতে বদিউজ্জামান (৫৫) নামের এক কৃষক নিখোঁজ হয়েছেন। রংপুরের দুই সদস্যের একটি ডুবুরিদল ওই নিখোঁজ কৃষককে উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছে। লালমনিরহাটে তিস্তা ব্যারাজের ফ্লাডবাইপাস ভেঙে নীলফামারীর সঙ্গে এবং অপর একটি সড়ক ধসে যাওয়ায় রংপুরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।

লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলার তিস্তা তীরবর্তী ১৪ ইউনিয়নের সাড়ে ১৭ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাস্তাঘাট, ব্রিজ, বাড়িঘর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তরাঞ্চলীয় প্রধান প্রকৌশলী জ্যোতিপ্রসাদ ঘোষ জানান, পানির তোড়ে তিস্তা ব্যারাজের ফ্লাডবাইপাসের ১৫০ মিটার অংশ ভেঙে গেছে। হাতীবান্ধার সাধুর বাজার এলাকার ওই ফ্লাডবাইপাসের কারণে তিস্তা ব্যারাজ হয়ে লালমনিরহাটের সঙ্গে নীলফামারীর সড়ক যোগাযোগ বুধবার থেকে বন্ধ রয়েছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম নবী জানান, বন্যার পানি ঢুকে লালমনিরহাটের ৪৬টি প্রাথমিক স্কুলে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে শুধু হাতীবান্ধা উপজেলার ২২টি স্কুল বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। অপরদিকে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, বন্যায় ১৯টি মাধ্যমিক স্কুল ও দাখিল মাদরাসার পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক শামীম আশরাফ জানিয়েছেন, বন্যায় জেলার তিন হাজার ৩৮০ হেক্টর জমির ফসল ডুবে গেছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ মারকুল ইসলাম জানান, বন্যায় ৯৩৬টি পুকুর ও মাছের খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নীলফামারীর ডিমলার পূর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, খালিশা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী ও গয়াবাড়ী ইউনিয়ন এবং জলঢাকার ডাউয়াবাড়ী, শৌলমারী, কৈমারী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়ে আট সহস্রাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়েছে।

রংপুরের গঙ্গাচড়ার পাঁচটি ইউনিয়নের প্রায় আট হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এসব এলাকার অনেকেই উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। এ ছাড়া কাউনিয়া ও পীরগাছার চরাঞ্চলের আরো কমপক্ষে দুই হাজার মানুষ বন্যার কবলে পড়েছে। এদিকে তিস্তায় পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি, গাছপালাসহ বসতভিটা।

রংপুরের পীরগাছার শিবদেব চরের কৃষক মতিয়ার রহমান বলেন, তিস্তার পানি শুকিয়ে যাওয়ায় এলাকার কৃষকরা আগাম আলু রোপণে নেমেছিলেন। আবার অনেকে জমি প্রস্তুত করেছেন। এখন সব নষ্ট হয়ে গেল।

কুড়িগ্রামে তিস্তার পানি কমতে শুরু করলেও এখনো চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত রয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে  কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষ। রাজারহাটের চর হতিয়াশামে প্রবল স্রোতে ১৫টি পরিবারের ঘর ভেসে গেছে। চরের আগাম আলু, মরিচ ও ধানক্ষেত ডুবে যাওয়ায় নষ্ট হয়ে গেছে এসব ফসল। অনেকেই কাঁচা-পাকা ধান কাটছে। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, প্রাথমিক হিসাবে ৫০০ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। রাজারহাটের সরিষাবাড়ীতে পানির তোড়ে একটি কাঠের সেতু ভেসে গেছে। সেই সঙ্গে গতিয়াশাম, খিতাবখাঁ, ঠুটাপাইকর, থেতরাই ও বজরা- এই পাঁচটি পয়েন্টে দেখা দিয়েছে নদীভাঙন।

 



সাতদিনের সেরা