kalerkantho

শনিবার । ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৪ ডিসেম্বর ২০২১। ২৮ রবিউস সানি ১৪৪৩

ময়মনসিংহ রেল স্টেশন

এক পথশিশু সৌরভ সব পথশিশুর বিপদের বন্ধু

►এনজিও’র বেতনের টাকায় কিছু সঞ্চয়, কিছু বোনকে দেয় সে ►কিছু টাকায় স্টেশনেরই পথশিশুদের খাবার কিনে দেওয়া

নিয়ামুল কবীর সজল, ময়মনসিংহ    

১৭ অক্টোবর, ২০২১ ১২:৪২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এক পথশিশু সৌরভ সব পথশিশুর বিপদের বন্ধু

১৬ বছরের জীবনে গত ৮ বছর ধরেই ময়মনসিংহ রেলস্টেশনের প্ল্যাটফরমের বাসিন্দা সৌরভ। এখন তার সঙ্গী স্টেশনেরই আরো ১২ শিশু। ভালো আচরণের জন্য প্রায় তিন বছর আগে এক এনজিওর দৃষ্টিতে পড়ে সৌরভ। পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা সেই এনজিও থেকে সৌরভ কাজের বিনিময়ে এখন প্রতি মাসে কিছু টাকাও পায়। সেই টাকার কিছু অংশ সে সঞ্চয় করে পরিচিত এক দিদির কাছে। কিছু টাকা গৃহকর্মী হিসেবে থাকা তার প্রতিবন্ধী বোনের হাতে তুলে দেয়। আর কিছু টাকায় সে মাঝে মাঝে কলা, বিস্কুটসহ টুকটাক খাবার কিনে দেয় রেলস্টেশনেরই অন্য শিশুদের। নিজের আচরণ, মানবিকতা আর বন্ধুত্ব দিয়ে সৌরভ রেলস্টেশনের অন্য পথশিশুদের বড় ভাই হয়ে উঠেছে। হয়ে উঠেছে সেসব অসহায় শিশুর বিপদের বন্ধু। 

এনজিওর কাজের বাইরেও সৌরভ স্টেশনে পানি বিক্রি করে। এখনো তার ঠিকানা রেলস্টেশনের প্ল্যাটফরম। তবে সৌরভের স্বপ্ন কোনো এক দিন টাকা-পয়সা জমে গেলে সে দোকান দেবে। মানুষের বাড়িতে রাখা তার বোনকে নিয়ে একটা ছোট্ট ঠিকানা খুঁজে নেবে।

সৌরভ এবং কারিতাসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে আলাপে জানা যায়, ছোট বেলায়ই মা-বাবার স্নেহ ও সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হয় সৌরভ। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে চলে যান। আর মানসিক আঘাতে মা হন নিরুদ্দেশ। এরপর তার আশ্রয় মেলে নানির কাছে। ময়মনসিংহ শহরের ব্রাহ্মপল্লী এলাকায় থাকাকালে সেই নানিও মারা যান। তখন সৌরভের বয়স আট বছর। আর তার বোনের বয়স ছিল ১০। তখন থেকেই সৌরভের ঠিকানা হয় রেলস্টেশনে। আর বোনকে গৃহকর্মী হিসেবে অনুরোধ করে এক বাসায় রেখে আসে সৌরভ। 
    
পথশিশু হিসেবে সৌরভের জীবন শুরু হয় সারা দিন ভিক্ষাবৃত্তি আর ঘোরাঘুরি করে। অনেক সময় কপালে জুটত মানুষের মারধর কিংবা বকাঝকা। আর দিন শেষে রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ঘুমানো। একসময় সে পানি বিক্রির কাজ শুরু করে। কিন্তু শরীর নোংরা থাকায় কেউ তার কাছ থেকে পানিও কিনতে চাইত না। 
     
কারিতাস ড্রিম প্রকল্প ময়মনসিংহ এলাকায় ২০১৮ সাল থেকে পথশিশুদের জীবনমান উন্নয়ন, তাদের অধিকার ও সুরক্ষায় কাজ শুরু করে। কাজের অংশ হিসেবে রেলস্টেশনে যান কর্মকর্তারা। পথশিশুদের শনাক্ত করে তাদের জীবনমান উন্নয়নে চলে বেশ কিছু কাজ। সেখানে যুক্ত হয় সৌরভ। কারিতাস কর্মকর্তারা দেখেন, মা-বাবা হারা শিশুদের প্রতি সৌরভ অন্য রকম ভালোবাসা দেখায়। সে অন্য শিশুদের নিজের ভাইয়ের মতো করে আদর-স্নেহ করে। শিশুদের প্রতি তার এই ভালোবাসার কারণেই ২০১৯ সালের শুরুর দিকে কারিতাস ড্রিম প্রকল্পে সৌরভকে পিয়ার এডুকেটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং মাসে ৬ হাজার টাকা বেতনও দেওয়া হয়। 

কারিতাস ড্রিম প্রকল্পটি গত বছর শেষ হয়ে বর্তমান বছরে আলোকিত শিশু প্রকল্প নাম নিয়ে কাজ করছে। সৌরভ এ প্রকল্পেও যুক্ত আছে। এ প্রকল্পের মাঠ কর্মকর্তা বিপাশা মানকিন বলেন সৌরভ কিছু টাকা সঞ্চয় করে। কিছু টাকা তার বোনকে দেয়। আর কিছু টাকা দিয়ে সে স্টেশনের অন্য শিশুদের মাঝে মাঝে খাবার কিনে দেয়। কোনো শিশু অসুস্থ হলে সৌরভই হাসপাতালে নিয়ে যায়। শিশুদের খোঁজখবর রাখে, কোনো শিশু সমস্যায় পড়লে সবার আগে সে এগিয়ে আসে। বিপাশা মানকিন বলেন, সৌরভের আচার-আচরণ ও মানবিকতা অন্যদের চেয়ে বেশ আলাদা। সৌরভের সঙ্গে স্টেশনে রাত কাটায় ৭ বছরের আব্দুল্লাহ। 

আব্দুল্লাহ জানায়, সৌরভ ভাই খাবার দেয়, অনেক সময় শাসনও করে। দুই বছর ধরে সৌরভের সঙ্গী আরেক পথশিশু রনি। রনি আগে ঢাকা রেলস্টেশনে রাত কাটাত। সৌরভকে দেখিয়ে রনিও জানায়, সৌরভ ভাই সব সময় দেখেশুনে রাখে।
  
সৌরভ জানায়, সে এখনো স্টেশনেই রাত কাটায়। সময় পেলে পানি বিক্রি করে। আর তার সঙ্গে স্টেশনে রাতে ঘুমায় আরও ১২ শিশু। ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে সৌরভ জানায়, তার কোনো দিন টাকা হলে সে দোকান দেবে। বোনকে নিয়ে আসবে নিজের কাছে। স্টেশনের শিশুদেরও সে দেখে রাখবে। 



সাতদিনের সেরা